চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। প্রথমবারের মতো এক জোড়া হিউম্যানয়েড বা মানবাকৃতির রোবটের সাহায্যে জীবিত প্রাণীর সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান ডিয়েগোর একদল প্রকৌশলী ও শল্যচিকিৎসকের যৌথ প্রচেষ্টায় এই অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে, যার বিস্তারিত গবেষণাপত্র বিজ্ঞান সাময়িকী 'নেচারে' প্রকাশিত হয়েছে। সার্জনদের সরাসরি দূরনিয়ন্ত্রিত নির্দেশনায় ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতে একটি জীবিত শূকরের পিত্তথলি সফলভাবে অপসারণ করেছে এই দুটি হিউম্যানয়েড রোবট।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে ইতিপূর্বে 'দা ভিঞ্চি'র মতো বিভিন্ন রোবোটিক বাহুর ব্যবহার থাকলেও, দুই পা ও মানবাকৃতির দেহবিশিষ্ট রোবটের মাধ্যমে এমন অস্ত্রোপচার এবারই প্রথম। এই গবেষণায় 'সার্জি' ডাকনামের রোবট ব্যবহার করা হয়েছে, যা চীনা প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রির জি১ রোবট মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। প্রায় ৫ ফুট লম্বা এবং ২৭ কেজি ওজনের এই রোবটগুলোকে সার্জনরা বিশেষ কনসোলের মাধ্যমে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন। প্রথম অস্ত্রোপচারটিতে একজন মানব সার্জন ও একটি হিউম্যানয়েড রোবট যৌথভাবে সহকারী হিসেবে কাজ করেন। আর দ্বিতীয় পর্যায়ে দুটি রোবট পাশাপাশি থেকে একে অপরকে সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পূর্ণ অপারেশনটি পরিচালনা করে। পরীক্ষার সময় সামান্য রক্তক্ষরণ হলেও সার্জনদের নির্দেশনায় রোবটগুলো দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণ করে সফলভাবে পিত্তথলিটি বের করে আনে।
বর্তমানে হাসপাতালে ব্যবহৃত সার্জিক্যাল রোবোটিক সিস্টেমগুলোর ওজন প্রায় ৮০০ কেজি এবং এর মূল্য কোটি টাকার ওপর, যা পরিচালনা করতে বিশাল জায়গার প্রয়োজন হয়। বিপরীতে, এই হিউম্যানয়েড রোবটগুলো অনেক হালকা, সাশ্রয়ী এবং সাধারণ চলাচলের উপযোগী যেকোনো স্থানে কাজ করতে সক্ষম। সাধারণ অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি সামান্য পরিবর্তন করে এই রোবটগুলোর হাতে স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে।
সার্জারি বিশেষজ্ঞ ড. শ্যাংলেই লিউ জানান, "এমন প্রযুক্তির প্রধান সুবিধা হলো এর বহনযোগ্যতা। রোবট ব্যবহার প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় খরচের দিক থেকে খুবই কম এবং কাজের জন্য খুবই কম জায়গা নেয়। ফলে দূরবর্তী কোনো গ্রাম, যুদ্ধক্ষেত্র কিংবা মহাকাশেও যেখানে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের অভাব রয়েছে, সেখানে এই রোবট পাঠিয়ে দূর থেকে অস্ত্রোপচার চালানো সম্ভব হবে।"
গবেষক রায়ান ব্রোডেরিক জানান, "প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে চিকিৎসার সরঞ্জাম বা পর্যাপ্ত কর্মী নেই, সেখানে একজন সার্জন দূর থেকেই একা বা কম সহকারী নিয়ে জটিল কাজ পরিচালনা করতে পারবেন।"
সফল পরীক্ষা সত্ত্বেও মানুষের চিকিৎসায় এই প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, রিমোট সংকেতের সামান্য বিলম্ব এবং মাঝেমধ্যে রোবটগুলোকে নতুনভাবে রিক্যালিব্রেট করার প্রয়োজন পড়ছে। তবে গবেষকদের প্রত্যাশা, প্রথাগত সার্জিক্যাল রোবট উন্নত হতে যেখানে কয়েক দশক সময় লেগেছিল, আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় এই হিউম্যানয়েড রোবটগুলোকে আরও দ্রুত নিখুঁত পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হবে।