কম্বোডিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এক নারীকে পাচার, অর্থ আত্মসাৎ এবং শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে একটি মানবপাচার চক্রের মূলহোতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির মানবপাচার শাখা (টিএইচবি) ইউনিট গত ২১ জুলাই ফরিদপুরের চরভদ্রাসন থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম মো. রুবেল (২৯)। তিনি রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার খাগজানা এলাকার বাসিন্দা।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সিআইডি জানায়, আর্থিক সংকটে থাকা এক নারীকে কম্বোডিয়ায় কাস্টমার কেয়ার সার্ভিসে উচ্চ বেতনের চাকরির আশ্বাস দেন রুবেল। ভুক্তভোগীর সঙ্গে তার পরিচয় হয় একটি এনজিওর মাধ্যমে। বিদেশে পাঠানোর কথা বলে প্রথমে তাকে ঋণ গ্রহণে উৎসাহিত করা হয় এবং পরে সেই ঋণের টাকা ও পাসপোর্ট সংগ্রহ করা হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিদেশে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার নামে পর্যায়ক্রমে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে মোট প্রায় চার লাখ টাকা নেওয়া হয়। বিভিন্ন উৎস থেকে ধারদেনা করে তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তির দেওয়া ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা দেন।

পরে ২০২৫ সালের আগস্টে ভিসা ও বিমান টিকিটের মাধ্যমে তাকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর চক্রের সদস্যরা তার পাসপোর্ট ও সঙ্গে থাকা অর্থ জোর করে নিয়ে নেয়। এরপর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করে তাকে অনিচ্ছাকৃত কাজে বাধ্য করা হয় এবং উপার্জিত অর্থ আত্মসাৎ করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীকে বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে চাপ দেওয়া হয়। এতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি প্রাণনাশ এবং অন্য দালালের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

নির্যাতনের শিকার ওই নারী একপর্যায়ে দেশে ফেরার চেষ্টা করেন। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারসহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও মানবিক সংস্থার সহায়তায় গত ১ জুলাই বাংলাদেশে ফিরে আসেন তিনি। দেশে ফিরে আইনি সহায়তা নিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

মামলার তদন্তে ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথিপত্র ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে সিআইডি। এর ধারাবাহিকতায় প্রধান অভিযুক্ত রুবেলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সিআইডি জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের পর তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে তার জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। জবানবন্দি ও তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মানবপাচার চক্রের অন্যান্য সদস্য, আর্থিক লেনদেনের উৎস, বিদেশে অবস্থানরত সম্ভাব্য ভুক্তভোগী এবং দেশি-বিদেশি সহযোগীদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

সিআইডির মানবপাচার শাখা জানিয়েছে, এটি একটি সংঘবদ্ধ আন্তঃদেশীয় মানবপাচার চক্রের কর্মকাণ্ড কি না এবং আরও কোনো বাংলাদেশি নাগরিক একই কৌশলে পাচার বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে দেশি-বিদেশি সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্ত চালানো হচ্ছে।

সিআইডি বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে চাকরির প্রলোভনে প্রতারিত না হয়ে সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশ যাওয়ার জন্য নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

পাশাপাশি বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণা, মানবপাচার, জিম্মি বা নির্যাতনের কোনো তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে অনুরোধ করেছে সংস্থাটি।