ক্লাস নেওয়ার কথা যাদের, তারাই হাতে তুলে নিচ্ছেন ঝাড়ু-বেলচা। দেশের ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কোনো পদ নেই। ফলে শ্রেণিকক্ষ ঝাড়ু দেওয়া থেকে শৌচাগার পরিষ্কার করা, সবই করতে হয় শিক্ষকদের।

মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকরা জানিয়েছেন, বিষয়টি চরম বিব্রতকর হলেও তাদের সামনে কোনো উপায় নেই। মূল দায়িত্বের বাইরে গিয়ে প্রতিদিন এই কাজ করতে গিয়ে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান।

ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২২ সালের এক যৌথ জরিপ বলছে, বাংলাদেশের ৪৩ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লিঙ্গভিত্তিক পৃথক ও মানসম্মত স্যানিটেশন সুবিধা নেই। সাত শতাংশ বিদ্যালয়ে কোনো টয়লেটই নেই। যেগুলোতে ওয়াশ ব্লক তৈরি হয়েছে, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কারের জন্য নির্দিষ্ট জনবল নেই। দিনের পর দিন মলমূত্র ও ময়লা জমে টয়লেটগুলো দুর্গন্ধময় হয়ে ওঠে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

অপরিচ্ছন্ন আঙিনা, জলাবদ্ধতায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি

রাজধানীর লালবাগের হাজী ইবরাহীম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ক্লিনার না থাকলে আমাদের নানা সমস্যা হয়। প্রথমত, স্যানিটেশন ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। দ্বিতীয়ত, আমাদের যে সুয়ারেজ লাইন থাকে সেগুলোও অপরিচ্ছন্ন থাকে। বেঞ্চগুলো যখন বন্ধ বেশি থাকে তখন ধুলাবালি জমে, ময়লা হয়ে থাকে। বাচ্চাদের শার্ট-প্যান্ট নষ্ট হয়ে যায়। খেলার জায়গা নোংরা হয়ে যায়। বিদ্যালয়ের আঙিনা অপরিচ্ছন্ন থাকলে, বৃষ্টির পানিতে স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে যায়। সেখানে ডেঙ্গু মশা জন্ম নেয়।’

স্কুল চালাতে গিয়ে ঝাড়ু-বেলচা হাতে নিতে হয় প্রধান শিক্ষকদের। মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা এখন যারা প্রধান শিক্ষক হিসেবে আছি, এসব কাজ আমরা নিজের হাতে তুলে নেই। শিক্ষক হয়ে ঝাড়ু, বেলচা, বালতি হাতে তুলে নেই। যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি সেটাকে নিজের ঘরবাড়ি মনে করে পরিষ্কার করি। এটা বিব্রতকর হলেও আমরা নিরুপায়।’

পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় বৃষ্টি-জলাবদ্ধতায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে জানান ধানমন্ডির আইয়ুব আলী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাহিদা আক্তার। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সম্প্রতি জলাবদ্ধতার কারণে যে আবর্জনা স্কুলের সামনে এসে জমা হয়েছে, এগুলো পরিষ্কার করার কেউ নাই। শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করা, ময়লার ঝুড়ি নামানো, বাথরুম পরিষ্কার করা, বিদ্যালয়ের চারপাশ পরিষ্কার রাখার জন্য কোনো লোক নেই। শুক্র-শনিরার বন্ধ থাকলে রবিবার সব জায়গায় ফাঙ্গাস পড়ে। এগুলো পরিষ্কার করে তারপর বাচ্চাদের বসতে দিতে হয়। আমাদেরই পরিষ্কার করতে হয়। আমার ছোট স্কুল, তারপরও এসব ফেস করতে হয়। যদি ক্লিনার পদ সৃষ্টি করা হয়, সেক্ষেত্রে তার একটা জবাবদিহি থাকে। আমরা নিজেদের টাকা দিয়ে ক্লিনার রাখি, তারপরও অনেক সমস্যা। দেখা যায়, সে প্রতিদিন আসে না। এই যে দুদিন জলাবদ্ধতা হলো, পরের দিন খোঁজ নিলাম। জানাল, তার জ্বর, আসবে না। বাধ্য হয়ে নিজেদেরই পরিষ্কার করতে হলো।’

বাড়ছে সংক্রমণের শঙ্কা

পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. নাদিম আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় টয়লেট ব্যবহারের সময় শিশুদের (বিশেষ করে মেয়েশিশুদের) মূত্রনালিতে সংক্রমণের মতো জটিল সমস্যা দেখা দিতে পারে। ঠিকমতো বাথরুম করতে পারে না। বাথরুমে যাওয়া এড়াতে তারা কম পানি পান করে, অনেক সময় প্রস্রাব চেপে রাখার প্রবণতা তৈরি হয়। এগুলো মারাত্মক রোগ সৃষ্টির কারণ।’

গ্রামাঞ্চলে সমস্যা আরও গুরুতর বলে জানান ড. নাদিম আহমেদ। তিনি বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে যেটি হয়, ওয়াশরুমে যখন শিশুরা যেতে পারে না, তখন তারা উন্মুক্ত জায়গায় টয়লেট করে। এটি আরও বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। হাত ধোয়ার সঠিক পরিবেশ না থাকায় টাইফয়েড, জন্ডিস ও ডায়রিয়ার সংক্রমণও স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যালয়ে শিশুদের জন্য পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।’

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

বিষয়টি নিয়ে গত ১১ মে এক বিবৃতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি। এতে বলা হয়, ‘দেশের প্রতিটি উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসায় একাধিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী, আয়া ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রয়েছে। কিন্তু যে স্তরের শিশুরা সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল এবং যাদের সবচেয়ে বেশি যত্ন প্রয়োজন, সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো ক্লিনার নেই। অবিলম্বে প্রতিটি বিদ্যালয়ে আউটসোর্সিং বা স্থায়ীভাবে অন্তত একজন করে ক্লিনার নিয়োগের জোর দাবি জানাচ্ছি।’

বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামসুদ্দীন মাসুদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘একটা প্রতিষ্ঠানে ক্লিনার না থাকায় অনেক ধরনের সমস্যা হয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছোট ছোট বাচ্চারা পড়াশোনা করে। তারা সবকিছু নোংরা করে। এগুলো তো পরিষ্কার করতে হয়। কারা পরিষ্কার করবে? বাধ্য হয়ে শিক্ষকদেরই করতে হয়। এতে সমস্যা হয়ে যায়। স্বাস্থ্যঝুঁকিরও বিষয় আছে। এগুলো পরিষ্কার করে আবার যদি শিক্ষকরা ক্লাসে যায়, তাহলে তো শিক্ষক-বাচ্চা সবারই ঝুঁকি তৈরি হয়। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে যেন অবশ্যই ক্লিনার নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয় থেকে এখনও কোনো নির্দেশনা পাইনি। নির্দেশনা পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’