নীলফামারীর এক তরুণ উদ্যোক্তার হাত ধরে দেশে বিদেশি ফল চাষে উন্মোচিত হয়েছে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। সদর উপজেলার কচুকাটা এলাকার তরুণ এ.আর. মামুন নিজের ৪৫ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় ‘এম.আর. নার্সারি’। বর্তমানে তার নার্সারিতে প্রায় এক হাজার ২০০ প্রজাতির ১০ লাখেরও বেশি গাছের চারা উৎপাদিত হচ্ছে, যা সরবরাহ করা হচ্ছে দেশজুড়ে।

নয় বছর বয়সে বাবা লেবু মিয়ার হাত ধরে কৃষির সঙ্গে মামুনের পথচলা শুরু। দীর্ঘ ২২ বছরের পরিশ্রম, গবেষণা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগে তিনি গড়ে তুলেছেন উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় ‘এম আর নার্সারি’।

৪৫ বিঘা জমির এই নার্সারিতে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ প্রজাতির গাছের ১০ লাখের বেশি চারা। এর মধ্যে বিদেশি ফলেরই রয়েছে প্রায় ২৫০টি প্রজাতি। বারাব্বা, পিনাট বাটার, ডুরিয়ান, অ্যাভোকাডো, পার্সিমন, লংগান, আলুবোখারা, কোকো, করোসল, মিরাকেল ফল ও জামাইকান চেরিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনপ্রিয় ও বিরল ফলের চারা উৎপাদিত হচ্ছে এখানে।

বিদেশি ফলের পাশাপাশি দেশীয় আম, কাঁঠাল, লিচু, লটকন ও লেবুসহ প্রায় ৩৫০ প্রজাতির ফলের চারাও পাওয়া যাচ্ছে। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কৃষক ও ফলপ্রেমীরা সহজেই উন্নতমানের দেশি-বিদেশি চারা সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছেন।

কৃষিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৩ সালে জাতীয় পদক অর্জন করেন এ আর মামুন। এছাড়া গাছের পরিচিতি ও সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখায় জেলা পর্যায়ে টানা নয় বার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন তিনি।

নার্সারিটিতে বর্তমানে প্রায় ৩০ জন নারী ও পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ঘরের কাছেই কাজের সুযোগ পেয়ে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন স্থানীয় মানুষ।

প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার অংশ হিসেবে অনলাইনেও চারা বিক্রি করা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গ্রাহকেরা অনলাইনে অর্ডার করছেন এবং দক্ষ জনবলের মাধ্যমে চারা নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কেবল বিক্রিতেই সীমাবদ্ধ না থেকে, বিক্রয়োত্তর সেবা হিসেবে গাছের পরিচর্যা ও কারিগরি পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।

নার্সারির অফলাইন ম্যানেজার শ্যামল চন্দ্র সরকার বলেন, আমরা শুধু চারা বিক্রি করি না, ক্রেতাদের গাছের পরিচর্যা, রোগবালাই দমন ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা বিষয়েও নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে থাকি।

অনলাইন ম্যানেজার জয়দেব সরকার জানান, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অনলাইনে চারা বিক্রির অর্ডার আসে। বিশেষ করে বিদেশি ফলের ক্ষেত্রে চাষ পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় সব পরামর্শ গ্রাহকদের দেওয়া হয়।

অনলাইন কর্মী মিজানুর রহমান বলেন, কোনো গ্রাহক গাছের সমস্যার ছবি পাঠালে আমরা কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে দ্রুত সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করি।

সুবিন্যস্ত এই নার্সারিটি এখন শুধু চারা উৎপাদনের কেন্দ্র নয়, কৃষিপ্রেমীদের জন্যও একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসছেন বিদেশি ফলের গাছ দেখতে, বাগান সম্পর্কিত নতুন তথ্য জানতে এবং চারা সংগ্রহ করতে।

নার্সারিতে আসা দর্শনার্থী বাদশা আলমগীর বলেন, অনেকের মুখে মামুন ভাইয়ের নার্সারির কথা শুনেছি। আজ এসে দেখলাম সত্যিই অসংখ্য জাতের গাছ রয়েছে। যাওয়ার সময় বেশ কয়েকটি চারা নিয়ে যাব।

নিয়মিত ক্রেতা শরিফ মাহমুদ রিপন বলেন, আগেও এখান থেকে চারা নিয়ে ভালো ফল পেয়েছি। তাই আবারও চারা কিনতে এসেছি।

উদ্যোক্তা এ আর মামুন বলেন, দেশের প্রতিটি বাড়িতে দেশি-বিদেশি ফলের গাছ থাকুক, মানুষ নিজেরাই ফল উৎপাদন করুক এবং আমদানিনির্ভরতা কমুক—এই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি।