অভিনয়জগতে কোনো অভিমান ছিল না তাঁর, ছিল কেবল একটি আকাঙ্ক্ষা—কোনো একদিন একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করবেন। দীর্ঘ ৩০ বছরের ক্যারিয়ারে এফডিসির আঙিনায় ঘুরে ঘুরে অবশেষে সেই সুযোগটি একবারই পেয়েছিলেন তিনি। গুণী পরিচালক তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পাওয়া ছিল ‘এক্সট্রা’ চরিত্রের অভিনেতা আবদুল করিম খানের জীবনের সেরা প্রাপ্তি।
ঢালিউডের চেনা মুখ আবদুল করিম মূলত জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বস্তিবাসী, ভৃত্য, ভিক্ষুক কিংবা মিছিল-মিটিংয়ের সদস্য হিসেবে নানা চরিত্রে তাঁকে দেখা যেত। কখনো ভিড়ের মাঝে দুই-একটি দৃশ্যে তাঁর উপস্থিতি থাকত, কখনো সংলাপ থাকত, আবার কখনো থাকত না। তবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর শখ ও পেশা, তাই এসব নিয়ে তাঁর কোনো পরোয়া ছিল না।
‘মাটির ময়না’ সিনেমায় তাঁর যুক্ত হওয়ার গল্পটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। এই সিনেমার শুটিং স্মৃতিচারণ করে তারেক মাসুদ এক ভিডিওতে বলেন, “এটা বেশ অদ্ভুত ব্যাপার। করিম চাচা দীর্ঘদিন ধরে এফডিসিতে এক্সটা চরিত্রের শিল্পী হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু কখনোই তেমন সংলাপ বলার চরিত্র পান না। সেই করিম চাচাকে আমরা একটি প্রধান চরিত্র দিলাম। তিনি খুশিতে অভিভূত হয়ে গেলেন।”
সেই রোমাঞ্চের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল শুটিংয়ের প্রথম দিনেই। উত্তেজনার বশে আবদুল করিম খান পূর্ণ স্যুট ও মাথায় হ্যাট পরে শুটিং ইউনিটে হাজির হন এবং অনুশীলনে অংশ নেন। তবে পরবর্তীতে তাঁকে একটি নাপিতের চরিত্রে অভিনয় করতে হয়। এই স্মৃতি স্মরণ করে তারেক মাসুদের ভাই নাহিদ মাসুদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “করিম চাচা এর আগে এত ভালো, এত বড় চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পাননি। যে কারণে পুরো সিনেমার শুটিংয়ে তিনি অনেক খুশি ছিলেন। এ ছাড়া তাঁর নাপিতের চরিত্রটি ঠিকমতো হচ্ছে কি না, সেটা দেখভাল করার জন্য একজন নাপিত ঠিক করা হয়েছিল। তাঁর জন্য এসব আয়োজন দেখে তিনি খুবই সম্মানিত বোধ করেছিলেন। কারণ, প্রত্যেক অভিনেতার ইচ্ছা থাকে একটি মনে রাখার মতো চরিত্রে অভিনয় করার। সেটা তিনি “মাটির ময়না” সিনেমায় পেয়েছিলেন।”
মুক্তিযুদ্ধের আগে সিলেট থেকে পরিবারের সঙ্গে ঢাকার সূত্রাপুরে চলে আসেন করিম। যুদ্ধের সময় পুরান ঢাকায় থাকাকালীন তিনি পরিবারের সবাইকে হারান। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে গাজীপুরের কাপাসিয়ার কামড়া গ্রামে বিয়ে করে সেখানেই স্থায়ী বসতি গড়েন এবং সেখান থেকেই শুটিংয়ে যাতায়াত করতেন। তাঁর স্ত্রী হেনা বেগম একটি ইউটিউব ভিডিওতে জানান, ১৯৭১ সালে ঢাকার একটি পত্রিকা অফিসে চাকরির মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন আবদুল করিম। এরপর মঞ্চনাটক ও যাত্রাপালার মাধ্যমে অভিনয়ে প্রবেশ করেন এবং ৮০-র দশকের শুরুতে শখের বশে চলচ্চিত্রে নাম লেখান। সততা ও দক্ষতার কারণে পরিচালক ও সহশিল্পীদের প্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি এবং একসময় অভিনয়কেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। ‘মাটির ময়না’, ‘প্রেমের অহংকার’, ‘অধিকার চাই’, ‘সৎ মানুষ’ ও ‘ভুলোনা আমায়’সহ তিন শতাধিক সিনেমায় তিনি অভিনয় করেছেন।
জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে তাঁর পারিশ্রমিক ছিল সামান্য। কখনো এক থেকে দুই হাজার টাকা পেতেন, যা দিয়ে তিনি সংসার চালাতেন এবং সন্তানদের পড়াশোনা করাতেন। এমনকি শুটিংয়ের আয় দিয়েই গ্রামে জমি কিনেছিলেন তিনি। বর্তমানে তাঁদের একমাত্র ছেলে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। হেনা বেগম জানান, শুটিংয়ের প্রয়োজনে দেশের যেকোনো প্রান্তে ছুটে যেতেন আবদুল করিম। ঢাকার আশপাশে শুটিং থাকলে নিজ খরচে বাসে যাতায়াত করতেন। ‘মাটির ময়না’ সিনেমার প্রধান সহকারী পরিচালক আক্তার হোসেন জানান, “আমাদের সিনেমার জন্য প্রতিদিন করিম চাচাকে এক হাজার টাকা দিতাম।”
শুটিংয়ের প্রতি এই অদম্য ভালোবাসা ছিল তাঁর শেষ দিন পর্যন্ত। ২০০৯ সালে কক্সবাজারে শুটিং চলাকালীন তাঁর ঠান্ডা লাগে এবং শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। শুটিং শেষ করে ঢাকায় ফিরে তিনি শুটিং ইউনিটের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে ভর্তি হন। কিছুটা সুস্থ হয়ে কাপাসিয়ার গ্রামের বাড়ি ফিরে গেলেও পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। স্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, শেষ দিনগুলোতে তিনি কিছুই খেতে পারতেন না। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩০ সালে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতা ২০০৯ সালের ২২ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।