ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোর আয়োজনে এবারের অতিথি প্রখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ও নির্মাতা সুচন্দা। কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হককে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশব, বেড়ে ওঠা, চলচ্চিত্রে জড়িয়ে পড়া, জহির রায়হানের সঙ্গে প্রেম–বিয়েসহ জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তিনি।

.

‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ অনুষ্ঠানে আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আজ আমরা যাঁকে অতিথি হিসেবে পেয়েছি, তাঁকে আমি বলতে পারব বাংলাদেশের বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস লিখতে হলে প্রথম অধ্যায়টা তাঁকে দিয়েই শুরু করতে হয়। তিনি আমাদের প্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেত্রী, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননাপ্রাপ্ত সুচন্দা। আপা, আপনি কেমন আছেন?

.

সুচন্দা: আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাকে ভালো রেখেছেন।

.

 আমরা এই অনুষ্ঠান শৈশব থেকে শুরু করি। আপনার ক্ষেত্রেও তা–ই করতে চাই। আপনার জন্ম কি যশোরে?

.

সুচন্দা: আসলে জন্ম হয়েছিল সাতক্ষীরায়। হ্যাঁ, সাতক্ষীরা। কিন্তু ওইটা খুব একটা আমার মনে নেই। কারণ, তখন তো আমি সবেমাত্র হয়েছি আরকি। তো তারপরে যেটা হলো, আমি হচ্ছি আমার বাবার, আমি একটু একটু...

.

 বলেন বলেন।

.

সুচন্দা: …বলতে হবে বেশি। আমার বাবা–ফুফুরা দশ ভাইবোন।

.

আপনার আব্বার নাম কী?

.

 সুচন্দা: আমার আব্বার নাম এ এস এম নিজামুদ্দীন আতাইয়ুব।

.

উনি কী করতেন?

.

সুচন্দা: উনি সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন।

.

আর আম্মার নাম কী?

.

সুচন্দা: আম্মা ছিলেন ডাক্তার বেগম জাহানারা। হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার ছিলেন।

.

 আচ্ছা আচ্ছা। তারপরে সাতক্ষীরা থেকে আপনারা যশোরে এলেন। আপনার স্মৃতি কখন থেকে আছে? মনে পড়ে কোনটা?

.

  সুচন্দা: যখন থেকে মানে বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই আমার সবকিছু মনে আছে। আমি যখন হলাম তো ন্যাচারালি আমার বাবা আমার দাদাকে টেলিগ্রাম করলেন। সাতক্ষীরা থেকে। তখন শোনামাত্রই উনি বললেন, তুমি শিগগিরই আমার বংশের বাতি মানে বংশের প্রথম যে অতিথি তাকে নিয়ে যশোরে চলে আসো… আমাদের গ্রামের বাড়িতে। এটা আমার মার কাছ থেকে শোনা গল্প। তো তারপরে উনি আমাকে নিয়ে এলেন, আমি তখন ছোট। যাহোক সে একটা, মানে পুরো বাড়িতে, পুরো গ্রামের মধ্যে একটা হইচই পড়ে গেল।

.

 যশোরের কোন গ্রাম, সেটা কি আপনার মনে আছে?

.

 সুচন্দা: হ্যাঁ, গ্রামের নাম হচ্ছে বিজয়নগর, চুড়ামনকাঠিও বলে। ওটা অ্যাকচুয়ালি এয়ারপোর্ট থেকে শহরের দিকে আসতে, এয়ারপোর্ট থেকে একটু এলেই তারপরে বাঁ দিকের রাস্তা। একেবারে আমাদের বাড়ি পর্যন্ত একেবারেই পাকা রাস্তা। তো সেখানে...

.

 তাহলে আপনারা তিন বোন তো বিখ্যাত। আপনি হচ্ছেন কোহিনুর আক্তার সুচন্দা, ববিতা আপা আছেন, চম্পা আপা আছেন। তিন বোনই আপনারা নাকি আরও ভাইবোন আছেন?

.

সুচন্দা: না, আমরা তিন বোন, তিন ভাই। আমার আমার ইমিডিয়েট ছোট ভাই ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, অস্ট্রেলিয়াতে আছে এখন। আরেক ভাই পাইলট— ইকবাল ইসলাম। উনি আমেরিকাতে থাকেন। আরেক ছোট ভাই  আমেরিকাতে থাকে। মানে তিন ভাই বিদেশে।

.

হ্যাঁ, সরকারি চাকরিজীবী আব্বা এবং ডাক্তার আম্মার ছয় সন্তানই বিখ্যাত এবং মানুষ হয়েছেন আরকি। এটা নিশ্চয়ই বাবা–মা...

.

সুচন্দা: আমার বাবা–মার কথা আমি বলতে পারি যে—মা কলকাতাতে লেডি ব্রেবর্ন কলেজে থেকে লেখাপড়া করা। বাবা ইসলামিয়া কলেজ থেকে পাস করা।

.

ওই রকম শিক্ষিত আগের জমানার সেই রকম অভিজাত পরিবার।

.

 সুচন্দা: জি জি।

.

তারপরে যশোর থেকে ঢাকায় এলেন কবে আপনি?

.

 সুচন্দা: যশোরে তো ছিলামই। ওখানে পড়াশোনা করছিলাম স্কুলে।

.সেসব সুন্দর দিন আমাদের আসবে, সেটা দেখেই মরতে চাই.

 স্কুলের নাম মনে আছে?

.

সুচন্দা: হ্যাঁ, কেন মনে থাকবে না। আমি সেদিন গিয়েও ছবি তুলে নিয়ে আসছি, ছবি দিতে পারব। এটা কি ভোলার ব্যাপার? কখনোই না। তো...

.

 স্কুলের নামটা একটু বলবেন?

.

 সুচন্দা: স্কুলের নামটা ছিল মোমিন গার্লস স্কুল। এখন হয়েছে সরকারি বালিকা বিদ্যালয়।

.

জি জি।

.

সুচন্দা: ওই স্কুল থেকেই আমি ম্যাট্রিক পাস করেছি। তারপরে ওখান থেকে পাস করার পরে আপনি তো জানেন যে যশোরে এমএম কলেজ খুব বিখ্যাত। হ্যাঁ, সেখানেই পড়াশোনা করেছি। সেখান থেকে ফার্স্ট ইয়ার—এ রকম ছিল, ফার্স্ট ইয়ার, সেকেন্ড ইয়ার। ফার্স্ট ইয়ার পাস করার পর বাবা ট্রান্সফার হলেন বরিশালে।

.

 হ্যাঁ।

.

 সুচন্দা: বরিশালে তখন ওখান থেকে আমার বাবা–মা, অন্য ভাইবোনেরা আগে চলে গেলেন। আমি আমার দাদার বাড়িতে মানে শহরে আরেকটা বাড়ি আমাদের আছে, যেই বাড়িটা ঠিক সার্কিট হাউসের অপজিটে একদম। বাড়িটার নাম হচ্ছে আমার দাদির নামে—রাবেয়া মঞ্জিল। ওখান থেকে মানে আমি ফার্স্ট ইয়ার পরীক্ষা দিয়ে তারপরে বরিশালে চলে গেলাম। বরিশালে যাওয়ার পরে ওখানে ওমেন্স কলেজে ভর্তি হলাম। সেখানে কিছুদিন পড়াশোনা করতে করতে ইতিমধ্যে আব্বা আবার বদলি হলেন ঢাকায়। উনি অবশ্য ডেপুটেশনে চলে এলেন। উনি তখন অ্যাগ্রিকালচারে ডেপুটেশনে চলে এলেন। আসার পরে ন্যাচারালি আমরা চলে এলাম। আসতে হলো। এসে তারপরে তো আমরা প্রথম উঠলাম গেন্ডারিয়াতে ফরিদা আপার ওখানে। ওঠার পরে ওখানে কিছুদিন থাকলাম। তারপর তো অনেক কিছুর পরিবর্তন।

.

 প্রথম সিনেমার অফারটা কেমনে এল? মানে কীভাবে?

.

সুচন্দা: সেটা হচ্ছে আমি কখনো ভাবিনি যে আমি চলচ্চিত্রে কাজ করব বা নায়িকা হব, এ রকম চিন্তাভাবনা করিনি। কারণ, রক্ষণশীল পরিবার থেকে ওই সময়ে মানে চলচ্চিত্রে এসে নায়িকা হওয়া বা কাজ করা এটা কিন্তু খুব একটা অন্য বড় ব্যাপার ছিল। যেহেতু আমার মা–বাবা দুজনই কলকাতাতে পড়াশোনা করেছেন, ওনারা একটু সংস্কৃতিমনা ছিলেন। আমার মা–বাবা দুজনেই। মা একটু বেশি। তো ওনার কারণে মানে যেটা বলতে চাচ্ছি, আমি এখানে আসার পরে তারপরে কী হলো আমি তো পড়াশোনা করছি, কলেজে যাচ্ছি। সিটি নাইট কলেজ যেটা। এখানে পড়াশোনা করছি। তো আমি জানি যে পড়াশোনাই তো করতে হবে। অন্য কিছু তো ভাবনাচিন্তা নেই।

তবে ছোটবেলা থেকেই আমি স্কুলে যখন পড়তাম তখন মানে প্রতিটি স্কুলের যত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো, যত অনুষ্ঠান হতো, সব কটি অনুষ্ঠানে আমাকে অংশগ্রহণ করতেই হতো বাধ্যতামূলক। টিচারদের কথা হলো তোমাকে অংশগ্রহণ করতেই হবে। পারফর্ম করতেই হবে। তো ঠিক আছে, করতাম। করতে করতে, ওই যশোর শহরে আমার খুব নাম হয়ে গেল। মানে আমি স্কুলে তো পুরস্কার পেতামই, তারপরে যখন আমি এই সমস্ত অনুষ্ঠান...তবে একটা অনুষ্ঠানে আমি শকুন্তলা চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। শকুন্তলা চরিত্র করার পরে শহরের মধ্যে এমনই নামডাক হয়ে গেল আমার যে আমার আসল নামটা...

.

 লোকে তখন আপনাকে শকুন্তলা বলেই ডাকতে শুরু করল।

.

সুচন্দা: সবাই ভুলে গেল। তখন আমাকে দেখেই বলত, ওই যে শকুন্তলা যাচ্ছে। আরে শকুন্তলা যাচ্ছে। তো এ রকম একটা ব্যাপার ছিল। আরেকটা কথা আমি বলতে চাই, যখন আমি স্কুলে পড়ি যশোরে…এ রকম অভিনয় করেছি।… তখন দেখতাম যে আমার বান্ধবীরা খুব ঠাট্টা করত। যখন স্কুল ছুটি হতো গেট থেকে বেরোতাম, আমরা তিনজন বান্ধবী খুব ক্লোজ ছিলাম। আমাদের তিনজনের নাম ছিল এলসিএম। একজনের নাম লাইলি, একজনের নাম মঞ্জু আরেকজন তো চাটনি। ওর নিকনেম তো চাটনি।

.জীবন সুন্দর এবং জীবন হলো কাজ করার জায়গা, আনন্দ করার জায়গা.

চাটনি। ওইটা সিটা চাটনি।

.

 সুচন্দা: হ্যাঁ, নিকনেমটা। তো সবাই বেরোলো মানে ওই শহরে তখন মফস্সল শহরে ন্যাচারালি খুব পরিচিতি এবং যখন বেরোতাম গেট দিয়ে তখন দেখতাম যে সব ছেলে গেটের বাইরে...

.

তরুণ সমাজের চিত্তচাঞ্চল্য দেখা দিল তখন।

.

 সুচন্দা: গেটের বাইরে সব দেখতাম লম্বা একেবারে সারি বাঁধা কতগুলা ওই আপনার ঝাউগাছ ছিল। লম্বা লম্বা বড় বড়। আর কাঠবিড়ালিগুলো সব ছোটাছুটি করত, এই সেই। যখন গেট দিয়ে বেরোতাম তখন দেখতাম আমার বান্ধবীরা খোঁচা দিত আমাকে, বলত এই দেখ তোর জন্য ছেলেরা কীভাবে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি বলতাম, আরে বাদ দে এগুলা। এগুলা দেখে কে? এ রকম করতাম। তো ছেলেরা কোনো অশালীন আচরণ করত না। খুব ভদ্র এবং আমরা যখন তিন বান্ধবী হেঁটে— আমাদের তিনজনের বাড়ি কাছাকাছিই ছিল। কিন্তু একটু হাঁটতে হতো কিছু দূর যাওয়ার পরে আমাদের বাড়ি। আমাদের পেছন পেছন ছেলেরা, মানে যেত। কিন্তু কোনো কথা নেই। পেছন পেছন যেত। আমি বলতাম, দূর এগুলারে কি পাত্তা দিই নাকি আমি, এগুলা বাদ দে। আমাকে বান্ধবীরা খালি খোঁচাত। যাহোক...

.

তো আমরা ছিলাম যে প্রথম সিনেমার অফারটা কে দিল, কীভাবে দিল?

.

 সুচন্দা: অফারটা কীভাবে হলো? সেটা হচ্ছে যখন আমরা গেন্ডারিয়াতে তখন আমার বাবার ঘনিষ্ঠ  বন্ধু, কাজী খালেক সাহেব পরিচালক–প্রযোজক, আপনি হয়তো অবশ্যই জানেন। উনি আমার আব্বার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। বোধ হয় ওনাদের এ রকম কথাবার্তা হচ্ছে; তো একদিন আব্বা আমাকে বললেন, চলো আমার এক জায়গায় তোমাকে নিয়ে যাই। আমি আমার আব্বার সঙ্গেই গেলাম। যাওয়ার পরে কাজী খালেক সাহেব আমাকে দেখে বলেন যে ‘আরে তোমার মেয়ে তো ভারি সুন্দর দেখতে।’ আমার আব্বা কথার উত্তর দেননি, চুপ ছিলেন। আমিও চুপচাপ ছিলাম। তো বলেন যে তোমার মেয়েকে কি চলচ্চিত্রে দিবা নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করানোর জন্য? তখন এ রকম কোনো চিন্তাভাবনা নেই। বললেন, আচ্ছা আচ্ছা। ঠিক আছে। ঠিক আছে। তারপর এ রকম করে উনি অনেকক্ষণ সময় গেল, গল্পগুজব হলো, উনি অনেক কথা বললেন। ঠিক আছে তুমি যদি ছবিতে না দাও তাহলে একটা কাজ করি, তোমার মেয়ে তো দেখতে সুন্দর একটু দেখি না ক্যামেরায় ওর চেহারাটা কেমন আসে। এটা দেখতে তো আর অসুবিধা নেই। ছবিতে না দাও। তো আমার আব্বা বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে।

যাহোক একদিন ওনার একটা ডকুমেন্টারি শর্ট ফিল্ম হচ্ছিল। সেখানে একটা চরিত্রে আমাকে উনি ডায়ালগ দিলেন এবং একটা গানও বোধ হয় অল্প কিছু ছিল আমার যতটুকু মনে পড়ে। তো আমি অভিনয় করলাম। ওই ডকুমেন্টারিতে। করার পরে, তারপরে তো ওটা ভুলে গেছি। আর কিছু না পড়াশোনা চলছে, জীবন চলছে।

এভাবে চলতে চলতে একদিন হঠাৎ বাড়িতে দেখি কল বেলের আওয়াজ। তো আমি যখন গিয়ে দরজাটা খুললাম। বাবা বাসায় ছিলেন না। মা ছিলেন। ছোট ছোট ভাইবোন ওরা ছিল। আমি দরজা খুলে দেখলাম, পাতলা একটা ছিপছিপে ভদ্রলোক (সুভাষ দত্ত)। আমাকে দেখে বললেন, তোমার আব্বা বাসায় আছেন? আমি বললাম, না, উনি বাসায় নেই। তো উনি তখন পকেট থেকে একটা কাগজ বের করলেন। একটা চিরকুট। উনি বললেন, ঠিক আছে, এই কাগজ তোমার আব্বা এলে দিও। ঠিক আছে? এ কথা বলে উনি কাগজটা আমার হাতে দিলেন। আমি বললাম, আচ্ছা। তারপরে উনি চলে গেলেন। তারপরে আমি আর জানি না যে কিসের চিরকুট কী ব্যাপার কী ভালো–মন্দ আমি কিন্তু কিছুই জানি না। আমাকে কিছু বলা হয় না। আরও পেছনে অনেক ঘটনা আছে, সেগুলো তো বলতে গেলে অনেক সময়ের ব্যাপার। তো আমি জানি না, কিছু না। তারপরে অনেক দিন পার হলো, আমি অত গুরুত্ব দিইনি, কি চিরকুট কিসের কী!

তারপর একদিন আমার মা আমাকে বললেন, তুমি একটু রেডি হও। একটা শাড়ি বের করে দিলেন উনি আমাকে। শাড়িটার কথাও আমার মনে আছে, রংটাও মনে আছে। একটা সুতির শাড়ি। লাল কালো ডোরা ডোরা। বললেন তুমি এই শাড়িটা পরে রেডি হও। আমি বলছি, কেন মা? মানে মা–বাবাকে আমি খুব বেশি সম্মান করতাম; কিন্তু ভয়ও পেতাম। মানে ওনারা এমনই ছিলেন যে কথা একটা বাড়তি কথা বলার সাহস ছিল না। আর আমি একটু বরাবরই মানে যারা মুরব্বি বা বাবা–মা, বিশেষ করে তাঁদের খুব সম্মান করতাম, তাঁদের তাঁরা কিছু না বললে আমি নিজে বাড়তি কোনো কথা বলতাম না। আর আমার নেচারটাও একটু ধীরস্থির ছিল। চুপচাপ। তারপর আমি রেডি হলাম তো আমার মা এসে বললেন, তুমি রেডি হয়েছো? আমি বলছি, জি হয়েছি। আমি বললাম, মা আমি কোথায় যাব? বললেন, তোমার আব্বার সঙ্গে তুমি এক জায়গায় যাবে। যেখানে তুমি যাবে, তাকে তুমি চেনো। আমি বললাম, আমি চিনি! আমি তো কে উনি? বললেন, তুমি তাঁর ছবি দেখেছ। আমি ছবি দেখেছি। ওনার নাম হচ্ছে সুভাষ দত্ত। তুমি ছবি দেখেছ, হয়তো তোমার মনে আছে কিনা জানি না। খুব গুণী লোক। তাঁর বাসায় দাওয়াত করেছে আমাদের সবাইকে। কিন্তু আমরা কেউ যাচ্ছি না, তোমার আব্বা তোমাকে নিয়ে যাচ্ছেন। ঠিক আছে।

  যাহোক ওনার বাসায় গেলাম। তারপর তো কথা শর্টকাট করেই বলি। দরজা বেল দিতেই একজন লোক এসে খুললেন। আমরা গিয়ে ওনার বারান্দায় দেখলাম একটা বড় চেয়ার, তার সামনে টেবিল, টেবিলের এপাশে অনেকগুলো চেয়ার। বড় চেয়ারটা দেখেই বুঝতে পারলাম যে এটাতে নিশ্চয় উনিই বসেন।

 তখন আমি, আমি রাস্তার মধ্যে ভাবছিলাম যে কোন ছবি দেখেছি আমি তা তো মনে করতে পারছি না। পারছি না, পারছি না। তারপরে যাহোক বাসায় গিয়ে আমরা বসলাম চেয়ারে। আমার আব্বা আর আমি। তখন ওনার চেয়ারটা খালি। উনি তখনো ঘর থেকে বের হননি। আমি তখন মানে ভাবছি যে আল্লাহ ওনাকে দেখে বোধ হয় আমি হেসে ফেলব।

.

হেসে ফেলবেন।

.

সুচন্দা: এখন যদি হেসে ফেলি তখন কেমন ব্যাপারটা হবে? তো আমি বসে বসে— আমার নখ তখন বেশ লম্বা লম্বা ছিল। আমি টেবিলের মধ্যে আঁচড় কাটছি যে যে মানে মনটাকে অন্যমনস্ক করার চেষ্টা করছি। যাহোক তারপরে একপর্যায়ে উনি এলেন। এসে উনি বসে আমাকে দেখলেন। দেখে প্রথম কথাটা এই বললেন, তোমার এত বড় বড় নখ তো রাখা চলবে না।

 আমি একটু হতবাক যে হঠাৎ দেখা আবার অত বড় বড় নখ রাখা চলবে না। কথার কোনো লিংক খুঁজে পাচ্ছি না যে কী হচ্ছে ব্যাপারটা। উনি তখন সব বিশ্লেষণ করলেন যে আমি একটা ছবি বানাতে চেয়েছিলাম, ‘কাগজের নৌকা’। সেটার গল্প ছিল যে নায়িকা একজন ডাক্তারি পড়ে। তো সে রকম আমি নায়িকা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমি পাচ্ছি না, আমার যে কল্পনা, আমি সে রকম মেয়ে পাইনি। সে জন্য আমার এটা করা হয়নি। তাতে আমি কী করলাম? আমি ‘সুতরাং’ ছবি বানিয়ে ফেললাম। এটা আমি স্থগিত রাখলাম। আমি নায়িকা পেলে করব। যাহোক এখন আমি তোমাকে দেখে আমার খুব ভালো লাগছে। আমার বাবাকে বললেন, ওকে দেবেন কি না। আমার বাবা বললেন, আমি এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারব না। আমার পরিবারের সবার সঙ্গে আলাপ–আলোচনা করে তখন জানাতে পারব। এই মুহূর্তে কিছু বলতে পারছি না। ঠিক আছে।

 তারপর যাহোক খাওয়াদাওয়া হলো, নাশতা–পানি হলো, সব হলো, আরও কথা হলো। তারপর আমাদের চলে আসার ব্যাপার। তো উনি এখানে, আমরা যেখানে বসেছিলাম সেখান থেকে আবার মেইন দরজাটা একটু একটু হাঁটতে হয়। তো আমি হেঁটে হেঁটে আমার বাবার সঙ্গে মেইন গেটের কাছে যাচ্ছি। আমার হঠাৎ করে মনে হলো, আচ্ছা দেখি তো পেছন থেকে উনি কোথায়, চলে গেছেন নাকি। তাকিয়ে দেখলাম যে উনি আমার হাঁটাটা লক্ষ করছেন, আমি কীভাবে হাঁটছি। উনি সেটা দেখছেন। যাহোক এ পর্যন্তই এখানে শেষ।

.মুনীর চৌধুরী ভাইকে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর শুনে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম.

তারপরে ‘কাগজের নৌকা’ই আপনার প্রথম ছবি।

.

সুচন্দা: হ্যাঁ, ‘কাগজের নৌকা’।

.

১৯৬৫ সালে।

.

 সুচন্দা: ১৯৬৫।

.

আপনার ’৪৭ সালে জন্ম। তাহলে ১৮ বছর বয়সে আপনি নায়িকা।

.

সুচন্দা: হ্যাঁ, আমি যখন কলেজে পড়ি। কলেজে পড়ুয়া।

.

  এরপর ‘বেহুলা’ করলেন, তার মাঝখানে কয়টা ছবি করেছিলেন?

.

 সুচন্দা: না। কোনো ছবি করিনি। যখন আমি নায়িকা, এই ‘কাগজের নৌকা’ রিলিজ হয়নি তখনো। রিলিজ হয়নি কিন্তু একটা শর্ত ছিল যে এই ছবি রিলিজের আগে অন্য ছবি রিলিজ হতে পারবে না। তখন ‘কাগজের নৌকা’— একদিন হঠাৎ করে আমি বাসায় ছিলাম। তো আমি একটু বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়ছিলাম। আমার মা হঠাৎ আমাকে ডাকলেন। বললেন যে তুমি ওঠো, একটু রেডি হও। পরিচালক জহির রায়হান সাহেব এসেছেন আমাদের বাসায়। তুমি ওনার সাথে দেখা করো, কথা বলো।

 ইতিমধ্যে একটু যখন এই চলচ্চিত্রের কথাটথা হচ্ছে, আমি জহির রায়হানের ছবি কিন্তু দেখিনি তখনো। দেখিনি, আমি তখন একটু খবরাখবর, জানাজানি, খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করে বুঝলাম যে উনি খুব নামকরা একজন পরিচালক। শুধু তো পরিচালক না, উনি এ রকম সাহিত্যিক অমুক–তমুক অনেক কিছু, বিরাট নামকরা গুণী একজন মানুষ।

 আমি তড়িঘড়ি করে একটু ইয়ে হয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকলাম। দেখি ওনারা বসে আছেন। অন্য সোফায় দুজন বসা আর একটা সোফা খালি। আর উনি একটা সোফায় বসা। তাঁর অপজিটে চেয়ারটা খালি। আমি হঠাৎ করে ঢুকে ওনাকে দেখে সালাম দিয়ে মানে আমার একটু অবাক লাগল। আমি মনে মনে কল্পনা করছি, জহির রায়হান অনেক ভালো ভালো কাজ করেছেন, অনেক বড় ডাইরেক্টর। নিশ্চয়ই একটু বয়স্ক লোক হবে। হয়তো একটা ওই রকম চেহারা নিয়ে।

 আমার দেখে মনে হচ্ছে, ওমা একি। উনি তো দেখি এত পাতলা, ছিপছিপে।

.

আপনার সুভাষ দত্তও পাতলা। উনিও পাতলা।

.

 সুচন্দা: উনিও পাতলা। আর ওনাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন উনি কলেজ–ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। আমার মনে হচ্ছে না যে এটা জহির রায়হান। যাহোক উনি একটা গাড়ির চাবি রিং ঘোরাচ্ছিলেন। আমি ওনার সামনে বসলাম। উনি আমার দিকে দেখছেন আর দুজন পরিচালক সহকারী ওনারাও দেখছেন। দেখার এক পর্যায়ে উনি বললেন যে আমি এসেছি একটা ছবি বানাব। আর ছবিটার নাম হচ্ছে ‘বেহুলা’। সেই ছবির নায়িকা চরিত্রে আপনাকে আমি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

 আমি আর কোনো কথা বলছি না। বললেন যে এ রকম, আমার চিন্তাভাবনা চরিত্র ইয়ে করব। তারপর মানে কথা শর্টকাট করছি। কথাবার্তা হলো। তো এই ছবির ব্যাপারে কোন ছবিতে কী করব, কোন ছবিতে করব না, এটা তো আমি সরাসরি কথা বলব না। যেহেতু আমার বাবা জীবিত আছেন। উনি কথা বলবেন বা ওনার সঙ্গে কথা হবে। কোনটা করা উচিত কী করা উচিত নয়। ওই কথাবার্তা হলো। একপর্যায়ে কথাবার্তা শেষ করে উনি চলে গেলেন।

 চলে যাওয়ার পরে তখন উনি একেবারে অস্থির যে এই ছবি খুব তাড়াতাড়ি করে করতে হবে এবং তাড়াতাড়ি রিলিজ করতে হবে।

.

 আগে তো সুভাষ দত্তের ছবিটা হলো ‘কাগজের নৌকা’। পরে জহির রায়হানের সঙ্গে।

.

 সুচন্দা: হ্যাঁ, জহির রায়হানের সঙ্গে তো পরিচয় হলো। তারপর ওটা যেহেতু একটু পৌরাণিক ছবি। ড্রেসট্রেসও একটু অন্য রকম ভিন্ন টাইপের ছিল। সেগুলো করা, মাপজোখ এসব। মানে অন্য আনুষঙ্গিক যে কাজগুলো, ছবি শুটিংয়ের আগে যেগুলো প্রয়োজন হয়, সেগুলো করা হলো। করার পরে প্রথম শুটিং যেটা হলো, সেটা হচ্ছে আমার মনে আছে স্টার সিনেমা হলের পেছনে একটা জমিদারবাড়ি পুরানা। সেই জমিদারবাড়িতে প্রথম শুটিং। রাজ্জাক আর আমি।

 মানে এ রকম ছিল যে প্রথম আমি রাজ্জাককে দেখছি, রাজ্জাক আমাকে দেখছেন। মানে নায়ক–নায়িকাকে দেখছি। তখন মানে সাইলেন্ট শট, কোনো ডায়ালগ নেই। ওখানে আমার বাবার চরিত্র সাঁই সওদাগর। উনি ছিলেন, ওনার লোকলস্কর। ইতিমধ্যে একটা ঘটনাও ঘটে গিয়েছিল। যে কারণে নায়ককে ধরে মানে সাপ উনি মনসাপূজা করতেন। কিন্তু চাঁদ সওদাগর আবার মনসাপূজা করতেন না।

.জীবন থেকেই তো পালাবার চেষ্টা করেছি অনেকবার.

 করতেন না। যেটা ‘বেহুলা’র কাহিনি।

.

 সুচন্দা: হ্যাঁ। তো এই দ্বন্দ্বটা ছিল। তখন কিন্তু তাঁরা আবার দুজন বন্ধু ছিলেন। সাঁই সওদাগর, চাঁদ সওদাগর। কোনো এক সময়ে তাঁরা মানে কথা দিয়েছিলেন যে আমার ছেলে বা মেয়ে হলে তোর আমাদের ছেলে বা মেয়ের মধ্যে বিয়ে হবে। এ রকম একটা কথা কোনো এক মুহূর্তে বলেছিলেন। ওনারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন।

 যাহোক, তখন উনি বললেন যে আমার রাজ্যে এ রকম সাপ আমি যে দেবীর পূজা করি তার কার এত বড় স্পর্ধা যে এ রকম করে করেছে। লখিন্দর সব সময় মৌরল নিয়ে ঘোরাঘুরি করত। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে এদিক–ওদিক–সেদিক। ওই ওনার মৌরলে সে একটা সাপ মেরে ফেলছে। এটাতে মনসা ক্ষিপ্ত। এবং ওইটা যখন ওনার সাঁই সওদাগর শুনলেন যে আমি মানে আমার রাজ্যে এত বড় একটা ঘটনা ঘটছে, তাকে নিয়ে আসো আমার সামনে।

 যখন নিয়ে এসে তাকে জেরা করছে, কথা বলছে। আমি তখন ওখানে দাঁড়ানো। তো তখন এই যে চোখে চোখে কথা।

.

এটাই প্রথম দৃশ্য, রাজ্জাক সাইলেন্ট।

.

 সুচন্দা: কোনো ডায়ালগ নেই। আমি ওনাকে দেখছি, উনি হিরো আমাকে দেখছেন। আমি হিরোকে দেখছি। এসব সাইলেন্ট শটগুলো ওখানে প্রথম।

.

 ‘বেহুলা’ সুপার ডুপার হিট হয়েছিল, তাই তো?

.

 সুচন্দা: সুপার ডুপার মানে কী, বাংলা ছবির মোড়ই ঘুরে গেল যে বাংলা ছবি তখন এত পপুলার হয়ে গেল যে তখন বাংলা ছবি তৈরি হবে। তখন অন্য সব ছবি বাদ। আমাদের দেশে বাংলা ছবির রাস্তা খুলে গেল।

.

আর আপনার সঙ্গে জহির রায়হানের একটা সুসম্পর্ক তৈরি হলো।

.

সুচন্দা: হ্যাঁ, সুসম্পর্ক তো বটেই।

.

আপনি গাড়িতে, উনি গাড়ি চালাচ্ছেন, আর আপনাকে…

.

 সুচন্দা: ওটা তো আছেই। তার আগেও কথা হলো যে উনি তো শুধু পরিচালক নন। উনি ক্যামেরাম্যান। উনি এডিটর। উনি সাহিত্যিক। উনি পরিচালক। উনি কাহিনিকার। উনি সব—একটা ছবি বানাতে যা যা প্রয়োজন, জহির রায়হান সবগুলোই নিজে করতেন। যদিও অন্য লোক থাকত কিন্তু তাঁরা থাকতেন বসে, উনিই সব কাজ করতেন।

 আমি কাজ করতে করতে যখন শুটিং হতো, তখন মাঝেমধ্যে উনি ক্যামেরায় লুক থ্রু করতে করতে আমার দিকে যেভাবে তাকাতেন, তখন আমি বুঝতে পারতাম যে উনি একটু আমার প্রতি দুর্বল।

.

  জি।

.

সুচন্দা: উনি লুক থ্রু করে আবার পাশ থেকে হয়তো তাকাতেন। এ রকম মানে দৃষ্টি বিনিময় এবং আমি পরিষ্কারই বুঝতে পারছি যে উনি আমার প্রতি বেশ দুর্বল হয়ে গেছেন।

.

 শুধু উনি দুর্বল, আপনি দুর্বল না!

.

 সুচন্দা: হ্যাঁ। এ রকম হতে হতে তারপর জহির রায়হান যখন শুটিং করতেন এবং উনি তো একটা কাজপাগল লোক। তারপর সাংঘাতিক সাহসী …ওনার কাজ দেখে সত্যি কথা বলতে কি, ওনাকে দেখে ওনাকে যতটা না আমার ভালো লেগেছে, তার থেকে ওনার কর্মটা ওনার যে কাজ, এই কাজ দেখে আমি কিন্তু ওনার প্রেমে পড়ে গেছি। যে এ রকম একজন গুণী লোক, এত বড় গুণী লোক! আমি সত্যি তখন দুর্বল হয়ে গেছি। মানে এ রকম করেই এই কাজের মধ্যে থেকেই আমাদের এই ভালোবাসার জন্ম।

.

জি। তো এখন এই গাড়ির সিকোয়েন্সটা একটু বলেন।

.

 সুচন্দা: গাড়িতে করে যেটা হতো, আমাদের প্রেমটা এমন মজার ছিল। তার আগে একটুখানি আর গাড়িতে করে হয়তো কোথাও কোনো আউটডোরে কুমিল্লায় যাচ্ছি বা কোথাও যাচ্ছি। তখন আমাদের প্রেমটা এ রকম খোলামেলা তো করা মানে আমরা করব না আর এটা করাও ঠিক ছিল না। তখন ওটার একটা আলাদা লুকোচুরির মধ্যে প্রেমটা, কিন্তু অন্য রকম একটা অনুভূতি। গাড়িতে যখন বসতাম, হয়তো অন্য শিল্পীরা পেছনের সিটে। ওনার মরিস অক্সফোর্ড গাড়ি ছিল। উনি নিজে ড্রাইভ করতেন। উনি গাড়ি ড্রাইভ করতেন আবার পাশের সিটে আমি বসতাম। আর পেছনের অন্য শিল্পীরা বসতেন।

 বসার পরে বেশ জোরেই সব সময় গাড়ি চালানোর একটা অভ্যাস ছিল ওনার। গাড়ি চালাতে চালাতে হঠাৎ করে উনি একটু হয়তো ডান দিকে মোড় নেবেন, বাঁক নেবেন। হঠাৎ করে উনি এমন জোরে একটা টার্ন করতেন যে আমি সিটের থেকে যে ফট ওনার বুকের ওপরে বা গায়ের মধ্যে যে পড়তাম।

.

একটুকু ছোঁয়া লাগে।

.

সুচন্দা: একটুকু ছোঁয়া লাগে। তো এই যে স্পর্শটা ওই যে বুকে পড়লাম, গায়ে পড়লাম, এই স্পর্শটাই মানে এত মধুর, এত সুন্দর মানে আমি সত্যি এখনো মাঝে মাঝে মনে হয় যে এই প্রেমটা সত্যি অন্য রকম ছিল। তো এ রকম একটা ব্যাপার।

.

 দুই গুণী মানুষের প্রেম। আচ্ছা আরেকটা বলছেন।

.

 সুচন্দা: আরেকটা বলছিলাম যেটা, সেটা হচ্ছে যে ‘বেহুলা’র যখন শুটিং করি, তখন উনি তো কাজপাগল এটা তো বলেইছি। একদিন হঠাৎ করে এ রকম ভেলার শুটিং হবে, মানে লখিন্দরকে সাপে কেটেছে, এখন চাঁদ সওদাগর বলছেন ওকে ভেলায় ভাসিয়ে দিতে হবে।

.

ভেলায় ভাসিয়ে দিতে হবে। তাঁর বডিটা নিয়ে আপনি যাচ্ছেন।

.

 সুচন্দা: তখন ভেলায় যাব, ভেলা তৈরি হয়েছে। অনেক মানে কলাগাছ কেটে কেটে বেশ মোটা করে খুব সুন্দর করে তারপর দড়ি মানে কি যেগুলো দিয়ে ওই লঞ্চ বা শিপগুলো বাঁধা হয়, মোটা মোটা শিকল, মোটা মোটা দড়ি ওগুলো দিয়ে। তারপর ওগুলো সব রেডি টেডি করে আমি তখনো জানি না কী শুটিং হবে, সেটা উনি বলেননি। উনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন যে ম্যাডাম, আপনাকে এই পানিতে এবং এই ভেলার মধ্যে আপনাকে নামতে হবে, শুটিং করতে হবে।

 তো শুটিংটা ছিল আবার পদ্মা, মেঘনা, যমুনার মিলনস্থল, যেটা তিনটা নদী এক জায়গায় হয়েছে। সেই তখন ছিল জুন–জুলাই মাস মানে ভরা বর্ষা, অথই পানি, কোথাও কিছু চারদিকে দেখা যায় না। শুধু বিশাল বিশাল ঢেউ। তখন উনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন আপনাকে এই ভেলায় নেমে শট দিতে হবে। আপনি পারবেন? আমি একদম ওনার চোখে চোখ রেখে আমি বললাম, পারব।

.

আপনি সাঁতার জানতেন?

.

 সুচন্দা: না, কিন্তু ওখানে সাঁতারে…

.

হ্যাঁ, ওই ওইখানে তো বড় বড় জাহাজ ডুবে যায়।

.

 সুচন্দা: তারপর উনিও দেখলেন যে আমিও চোখের পলক না ফেলে চোখে চোখ রেখে বললাম পারব। বেশ তারপর তো আমাকে ভেলায় নামিয়ে দিলেন। যাহোক… তারপর অনেক দুর্ঘটনা ঘটে গেল। ভেলা ছিঁড়ে চলে গেল অনেক দূরে, ঝড় শুরু হলো বিকেলে। সন্ধ্যার সূর্য অস্ত যাচ্ছে, অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। দেখাচ্ছেন যে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, রাতদিন বেহুলা শুধু ভাসছেই আর ভাসছে, স্বামীকে বাঁচাবার জন্য তাকে নিয়ে।

 তখন উনি বিভিন্ন শট নিতে নিতে এই ভেলা ছিঁড়ে চলে গেল বহুদূর।

.

আপনি?

.

 সুচন্দা: আমি কিন্তু ভেলার মধ্যে বসা। আর রাজ্জাক ছিল না। রাজ্জাকের বদলে একটা বডি।

.

 বডি তো হ্যাঁ, ডেডবডি, অন্য একজন।

.

 সুচন্দা: হ্যাঁ, ডেডম্যান একটা ছেলে। তো ওকে বলছে আপনার কিছু করতে হবে না, সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে নিচে ওকে শুয়ে রাখছে। তো চলে গেল যখন, তখন তো মানে আমি তাকিয়ে দেখি অন্ধকার। বাতাস আর অন্ধকার। আর ভেলা ছুটছে তো ছুটছে আর বিশাল বিশাল ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে আমার ওপরে। ওই ছেলেটা তো উঠে বসে পড়ছে। আর জহির সাহেব, আরেকটা কথা জহির সাহেব বলছিলেন যে আপনাকে তো এত দূর থেকে বলতে পারব না আমি কখন শট নিচ্ছি বা আমি কাট করছি। আপনি কিন্তু অলওয়েজ আপনার অ্যাকশনে থাকবেন যে আপনি আপনার স্বামীকে বাঁচাবার জন্য দিনের পর দিন, মাস ভাসছেন। আপনার খাওয়া নেই, নাওয়া নেই, এই মুখটা আপনি রাখবেন। ঠিক আছে, আমি তো সারাক্ষণ ওই মুডে থাকছি। আমি যখন ওই ডেড বডি উঠে গেছে আমি বলছি আপনি করলেনটা কী এইটা? তখন আর শুটিং করার কোনো …আমি তখন আর জাহাজটাও দেখতে পাচ্ছি না… কিছুই না। শুধু আমরা দুজন মানুষ। আমি বললাম দেখেন, এখন কান্না করে কী,… আমি বললাম, দেখেন এই কথা বাদ দিয়ে আপনি আপনার ভগবানকে ডাকেন আর চুপচাপ থাকেন। ওইগুলো বলে এখন কোনো লাভ নেই। আপনি এখান থেকে নামতে পারবেন? …যাহোক এ রকম করতে করতে প্রায় দুই–তিন ঘণ্টা হয়ে গেল। আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না… শিপ টিপ কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

.

আচ্ছা আপা, আপনার বিয়ের প্রসঙ্গে আসব, তার আগে একটু আমরা...

.

 সুচন্দা: না, এখানে একটা ছোট্ট কথা আছে যে অনুভূতির কথা। তারপর যা হোক অনেক কিছুর পরে যখন আমাকে উনি যখন আমাকে ভেলায় ওঠাল, আমার তো পুরো শরীর ভেজা। উনি দাঁড়িয়ে অনেক কষ্টে তুলল, সে কাহিনি আরও অনেক বড়। তো উনি তুলে আমাকে মানে জড়িয়ে ধরলেন। আমার ভেজা কাপড় আর উনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। জড়িয়ে ধরার যে অনুভূতি এই যে মানে ওভাবে তো কখনো আমরা দুজন কখনো এক হইনি। তো আমাকে জুড়ে দেওয়ার পর যেই ফিলিংসটা আমার হলো, আমি আজও সেই অনুভূতি ফিল করি। আজও সেই অনুভূতি অনুভব করি। ওই থেকেই মানে ভালোবাসাটা আরও গভীর থেকে গভীর হয়ে গেল।

.

 আপনার বিয়ে কি ‘জীবন থেকে নেয়া’র আগে হয়েছে না পরে হয়েছে?

.

সুচন্দা: ‘জীবন থেকে নেয়া’র পরে।

.

তাহলে আগে বিয়ে হলো।

.

 সুচন্দা: হ্যাঁ, একদিন এসে তিনি বললেন যে চলো।

.

  বিয়ে হলো, বিয়ের পরে ছবি হলো?

.

 সুচন্দা: ছবি হলো ‘মনের মতো বউ’।

  বিয়ে করে ভালো একটা বউ পেয়ে ‘মনের মতো বউ’ সিনেমা বানিয়ে ফেললেন।

.

আচ্ছা, ওই আপনার বিয়ের প্রস্তাব দিতে মানে যেদিন বিয়ে হবে, এসে যে আপনাকে বললেন চলো। ওইটা একটু বলেন।

.

 সুচন্দা: ওটা আবার কী ব্যাপার, আমি তো বাসায় এমনিই নরমাল। হঠাৎ করে দেখি উনি গাড়ি চালিয়ে আমাদের বাসায় চলে আসছেন। তো আমি তো জানি না যে এ রকম তো আসার কথা না। আর সেদিন কোনো শুটিংও ছিল না। তো এ রকম এসে বলছে শুটিং আছে। তাড়াতাড়ি চলো, তাড়াতাড়ি চলো, এ রকম বলছে। আমি ওনার দিকে তাকালাম, উনি আর কিছু বলেন না। বলেন যে শুটিং আছে। তখন ন্যাচারালি আমার বাবা–মা, শুটিং থাকলে তো যেতেই হবে। আমি নিচে এসেছি, শুটিং আছে আজকে। আমি তখন যে কাপড় পরা ছিল, ওই রকমই কাপড় পরা নরমাল। আমি গাড়িতে উঠলাম। আমি তখনো কিছু জানি না। গাড়িতে ওঠার পরে গাড়ি যাচ্ছে যাচ্ছে, দেখি এফডিসি, টেফডিসির দিকে তো গাড়ি যাচ্ছে না। গাড়ি তো যাচ্ছে ধানমন্ডি–টানমন্ডির দিকে। এদিকে কিছু দূর যাওয়ার পর বলছে আজকে আমাদের বিয়ে।… তখন আমাকে বলল।

 আজকে আমাদের বিয়ে মানে কী? বিয়ে মানে বিয়ে। আমি তো একদম স্তব্ধ হয়ে গেছি। যে আল্লাহ এই পাগল তো কি পাগলামি করছে বিয়ে এইভাবে কোনোদিন কারও বিয়ে হয়? যাহোক তখন তো আমি বুঝতে পারছি যে উনি যেটা চান, সেটা উনি করেই ছাড়েন। তো আমাকে এভাবে তুলে নিয়ে তারপর ধানমন্ডির একটা বাসায়, আগের থেকেই সব আয়োজন করা ছিল বিয়ের, সব ওনার বন্ধুবান্ধব আর ওখানে একজন খালি আমাদের ওই যে বেবি জামান সাহেব, উনি ছিলেন। যাহোক বিয়েটিয়ে হলো। বিয়ে হলো, গল্পটল্প হলো, খাওয়াদাওয়া হলো অনেক কিছু। তারপর আমাকে রাতের বেলায় বাসায় তো ফিরতেই হবে। … যাহোক তারপর আমাকে বাসায় আবার এনে পৌঁছে দিল। এই হচ্ছে বিয়ের কাহিনি।

.

 বাংলাদেশের ইতিহাস এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছবি হচ্ছে ‘জীবন থেকে নেয়া’।

.

 সুচন্দা: ‘জীবন থেকে নেয়া’। এটা অনস্বীকার্য। এটা এমন একটা দলিল। এটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছে। এটা মানুষকে সাহস জুগিয়েছে। তার মধ্যে যেসব উনি একটা পরিবার, পারিবারিক গল্পের মধ্য দিয়ে যেভাবে একটা রাজনৈতিক ব্যাপারকে তুলে ধরেছেন!

.

পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসককে…

.

সুচন্দা: স্বৈরাচারী শাসন একনায়কত্ব, যেটা তারপরে চাবির গোছা, একটা পাওয়ার, যার কাছে ওইটা থাকে, তখনই তার পাওয়ার।

.

 রওশন জামিল।

.

সুচন্দা: এগুলো নিয়েই আর কি সেই গল্প এবং আমি তখন ওই ছবিটা যখন হয়, তখন আমি কিন্তু মা হতে যাচ্ছি। তখন আমার বড় ছেলে পেটে।

.

  আপনার ছোট ছেলে তপু। বড় ছেলের নাম?

.

সুচন্দা: ছোট ছেলে। ওর ডাকনাম অপু আর ভালো নাম আরাফাত রায়হান।

.

আর ছোট ছেলে তপু রায়হান।

.

 সুচন্দা: তপু রায়হান। তো বড় ছেলে এখন ব্যাংকেই আছে। আর তপু ব্যবসা করে। সেই সঙ্গে রাজনীতিতে একটু সংযুক্ত যাহোক। তো তখন উনি (জহির রায়হান) ওই ছবিটা তখন করলেন। তো আমি বলতেছি, না না এটা কী করে হয়? আরে আমি মা হতে যাচ্ছি—এ রকম অবস্থা।… তিনি বললেন, ওই সব চিন্তা তোমার করতে হবে না। যাহোক এই নামকরা একটা ছবি জহির রায়হান বানিয়ে গেছেন। সেটা শুধু আমাদের দেশে নয়, আমি বলব পাশের দেশে সত্যজিৎ থেকে শুরু করে যত পরিচালক নামকরা, সবাই দেখে।

.

 অবশ্যই এটা তো বাংলাদেশের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ছবি হয়ে গেছে।

.

সুচন্দা: এটাই।

.

 এবং পৃথিবীর চলচ্চিত্র ইতিহাসে ওটা গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা হিসেবে খুব ভালো আর রাজনৈতিক কারণে এটা অমূল্য।

.

 সুচন্দা: অমূল্য এবং এত সত্যি এ রকম ছবি এত বছর হয়ে গেল আমি পথ চেয়েছিলাম যে হয়তোবা কেউ বানাবে। … সম্ভব না।

.

আপনার সঙ্গে রাজ্জাক সাহেব অভিনয় করেছেন আর আপনার বিপরীতে আর কে কে অভিনয় করলেন?

.

 সুচন্দা: সব। এমন কোনো নায়কের নাম বলতে পারবেন না আপনি, যে নায়কের সঙ্গে আমি অভিনয় করিনি। আমার সৌভাগ্য ছিল এই যে ওই সময় যত নায়ক ছিল, আমি সবার সঙ্গে অভিনয় করেছি। তবে আমার মনে হয় রাজ্জাকের সঙ্গে আমি যতগুলো ছবিতে অভিনয় করেছি, তার চেয়ে বেশি বোধ হয় আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে বেশি করেছি। … এমন কোনো পরিচালক ছিল না যে এই পরিচালকের ছবির নায়িকা আমি ছিলাম না। নতুন বলেন আর পুরোনো বলেন—সব পরিচালকের ছবির নায়িকা আমি ছিলাম। এই নারায়ণ ঘোষ মিতা বলেন, ওই মমতাজ আলী বলেন, সবার ছবিতে আমি নায়িকা ছিলাম। এটা আমার সৌভাগ্য।

  নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। এরপর ১৯৭১ সাল এল। জহির রায়হান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেন।

.সুচন্দার স্মৃতিতে: জহির রায়হানের শেষ কথা ও শেষ দিনের ঘটনা.

আপনি তখন কী করছিলেন?

.

 সুচন্দা: না, যখন উনি চলে গেলেন, তখন যাওয়ার সময় উনি তো মানে খুব অস্থিরমনা, একদম অস্থির হয়ে গেছেন যে কীভাবে ওখানে গিয়ে দেশের জন্য কাজ করতে হবে। তখন আমার বাচ্চা তো মানে তপু তখন একেবারেই ছোট; মানে একেবারেই, কোলে… হাঁটতেও পারে না। আর অপু ওর আবার এক বছর এক দিনের ছোট–বড়। দুটো ছেলে। তো বড়টা একটু হাঁটি হাঁটি করে। আর ছোট তো হাঁটতে পারে না। তখন আমাকে বলল দেখো আমাকে দেশের জন্য কাজ করতে হবে। আমি চলে যাব আর তোমাদেরকে আমি…; উনি রেডি হয়ে গেছেন একদম লুঙ্গি পরে মাথায় টুপি দিয়ে কাপড় পরে রেডি হয়ে এসে আমাকে বলছে এ কথা।

.

বেরিয়ে যাচ্ছেন।

.

 সুচন্দা: যে আমি চলে যাচ্ছি, তোমাদের আল্লাহর কাছে রেখে গেলাম। আর আরেকটা কথা, আমি যাব প্রথমে এখন তো তোমাদের নিয়ে যাওয়া যাবে না। আমি কোন দিক দিয়ে যাব কোথা দিয়ে যাব কিছুই জানি না। তো আমি যখন লোক পাঠাব, তখন তুমি ওদের নিয়ে কলকাতায় চলে আসবে। আমি বললাম আচ্ছা। তো আমাকে রেখে গেল। আমি তো তখন এক জায়গায় থাকি না। বিভিন্ন জায়গায় আমাকেও তখন পাকিস্তানি আর্মিরা তখন খুঁজছে।

জহির রায়হানের দিলু রোডের বাড়িতে ছিলাম, মগবাজারে ভাড়া বাড়িতে। তো তখন আমরা বেরিয়ে যাওয়ার ওই ২৫ মার্চের রাতের পরপরই আমরা সকালবেলা বেরিয়ে গেলাম, যে আমাদের তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে, না হলে কিন্তু; জহির রায়হানকে পাকিস্তানি আর্মিরা তো খুঁজছেই, স্বাভাবিক; ‘জীবন থেকে নেয়ার’ যিনি বানিয়েছেন। তো আমরা বেরিয়ে যাওয়ার বোধ হয় আধা ঘণ্টার মধ্যে বাড়িতে পাকিস্তানি আর্মিরা যায় এবং বাড়ি তছনছ করে ফেলে সব জিনিসপত্র। আমাদেরকে পায়নি। আমরা আল্লাহর রহমতে তার আগেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছি। তো এই হচ্ছে অবস্থা। তারপরে উনি চলে গেলেন আমাকে রেখে গেলেন আমি তখন কী করব? বলে যে তুমি এক জায়গায় থেকো না। তখন মাঝেমধ্যে কখনো গেন্ডারিয়াতে, কখনো জহিরের কোনো পরিচিতজন, কখনো আমার কোনো পরিচিত জন—এ রকম বিভিন্ন বাড়িতে বাড়িতে ওই বাচ্চা নিয়ে এ রকম থাকতাম। কায়েতটুলি মানে জহিরদের বাড়িতে। ওখানে যে একনাগাড়ে থাকছি, তা–ও না। আবার আমাদের বাড়িতে গেন্ডারিয়ার যে বাড়ি, সেখানেও কিছুদিন থাকি। এ রকম করে করে আমার ওই সময়টা কেটেছে।

তারপরে একদিন হঠাৎ যখন আমি গেন্ডারিয়াতে আমাদের বাড়িতে, তখন হঠাৎ করে দেখি জহিরের লেখা একটা চিরকুট। তার মধ্যে লেখা আছে, বাবুল চৌধুরীকে পাঠালাম তুমি বাচ্চাদের নিয়ে ওর সঙ্গে চলে এসো। বাবুল চৌধুরী মানে উনিও একজন পরিচালক এবং জহির রায়হানের আপন মামাতো ভাই। তো যাহোক এ রকম করে তখন তো আমি পড়লাম মহাবিপদে যে এখন মুশকিল হয়ে গেল এখান থেকে আমি কীভাবে বেরোব? আমার বাবা তো কিছুতেই রাজি হবেন না এবং বাবার অবাধ্য হওয়া তো সম্ভব নয়। তখন আমি একটু মনে মনে চিন্তা করলাম, একটা প্ল্যান করলাম। তখন একটা চিঠি লিখলাম আমার আব্বাকে। মানে আমি যে চলে যাচ্ছি বাচ্চাদের নিয়ে তো বাবাকে সরাসরি সামনে বলার ক্ষমতা আমার ছিল না। আব্বা দিতও না। আমি একটা চিঠি লিখলাম সুন্দর করে। তো চিঠিটা খামের মধ্যে দিয়ে আটকিয়ে তখন ববিতার হাতে দিয়ে বললাম যে এই চিঠিটা আমি চলে গেলে তুমি আব্বার হাতে দিবা। তার আগে না। তো আব্বা তখন হয়তো কোথাও ঘুমিয়ে আছে বা কিছু বা যাহোক অতটা খেয়াল নেই। মানে আমি বেরিয়ে গেলাম বাসা থেকে। তো ববিতা সেটাই করেছে। তো এভাবে সেই চললাম। জানি না কোথায় যাব, কীভাবে যাব। বাবুল চৌধুরী আমাদের নিয়ে রওনা হলো। নিয়ে যেতে যেতে তারপরে তো যাচ্ছি কুমিল্লা। কুমিল্লা যাওয়ার আগে বাবুল চৌধুরী নিয়ে গেলেন রাতের বেলা… দুই দিন কি ওই জায়গাটার নাম? মৌচাক মার্কেট। মৌচাক মার্কেটের ওখানে তাঁর পরিচিত কোনো একজন ল’ইয়ারের বাসায় রাত কাটালাম দুই দিন। এরপর ওখানে নিয়ে বলল যে কালকে সকালবেলা আমরা রওনা হবো। তখন আমি মনে মনে ঠিক করলাম যে, এভাবে গেলে তো আমাকে পাকিস্তানি আর্মিরা যদি চিনে ফেলে, এভাবে যাওয়া যাবে না। তখন আমি করলাম কী আমার একটা প্লাস্টিকের ঝুড়ির মধ্যে একটা শাড়ি আমার পরা আর একটা শাড়ি নিলাম পুরোনো, খুব পুরোনো আর বাচ্চাদের দু–একটা পুরোনো কাপড়চোপড় নিলাম একটা ফ্লাস্ক পানির বোতল—এই। তখন আমি করলাম কি বুদ্ধি করে ওই কাপড়টাকে যেই কাপড়টা আমি পরব, সেটাকে ব্লেড দিয়ে কিছু কিছু জায়গা কাটলাম।

.

 ছেঁড়া ছেঁড়া করলেন।

.

সুচন্দা: ছেঁড়া ছেঁড়া করলাম। করে মাটির মধ্যে খুব করে ঘষলাম। ময়লা করলাম। আর ওই আপনার কাজল বা কালি দিয়ে করলাম কি সারা মুখে প্রথমে মাথায় মধ্যে তেল দিলাম। অনেক করে তেল একেবারে চাপচুপ করে দিয়ে একদম মাঝখানে সিঁথি করে গ্রাম দেশে যে রকম করে ওই রকম করে একটা খোঁপা করলাম। আর এদিক দিয়ে তেল বেয়ে বেয়ে পড়ছে আর আমি ওই কালি দিয়ে তারপরে পুরা মুখের মধ্যে একদম হালকা করে কালো করে ফেললাম। লিপস্টিক তো প্রশ্নই ওঠে না। যাহোক এমনভাবে মেকআপটা করলাম, আমার আজও মনে হয় যে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মেকআপ ওটাই ছিল। তো এরপরে তো সকালবেলা যাহোক রওনা হলাম।

কুমিল্লার কাছাকাছি গেলেই আর্মিরা আমাদের বেবি ট্যাক্সি থামিয়ে ফেলল। নামিয়ে তারপরে তোমরা কোথায় যাও এসব—ওই সব। আমি তো উর্দুতে কথা বলতেই পারি কিছু কিছু। তো আমি কোনো কথা বলছি না। আমি শুধু গ্রামের মেয়ে কিছুই বুঝি না জানি না। তা আমি ওকে তোমরা কোথায় যাচ্ছ কী ব্যাপার আর আমার বাচ্চা ভীষণ কানতেছে ছোট বাচ্চাটা। অনেক কান্নাকাটি করত। আমি বলতেছি ওই আর্মি যে কথা বলতেছে ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ, কী ব্যাপার’— তা আমি বুঝি না। মানে এ রকম ইশারা করতেছি। তো আমি দেখাচ্ছি যে আমার বাচ্চা কানছে কানছে। মানে এমনভাবে অ্যাক্টিং করছি যে আমি কিছুই বুঝি না কিছুই জানি না।

.

 সে অভিনয়টাও করতে হলো।

.

 সুচন্দা: হ্যাঁ, তখন একটা সেরা অভিনয় ওখানে করলাম। করার পর পাকিস্তানি আর্মিদের বোধ হয় মনটা একটু নরম হলো। দেখল বাচ্চাটা ভীষণ কাঁদছে আর আমি এ রকম অসহায়ের মতো মানে অভিনয় করছি, যেটা দেখে ওদের মনটা হয়তো একটু নরম হলো।…এরপর আবার আমরা চলতে শুরু করলাম। গিয়ে আমরা পৌঁছালাম জহিরদের গ্রামের বাড়িতে।

.

 নোয়াখালী।

.

 সুচন্দা: নোয়াখালী। মুজিপুর গ্রাম। ওখানে গিয়ে পৌঁছানোর পরে তখন তো রাত হয়ে গেছে। পৌঁছানোর পর বাচ্চা তো কাঁদছে, গরম ও অন্ধকার। ওখানে রাতটা থাকলাম। থেকে পরের দিন সকালবেলায় বাবুল চৌধুরী ইতিমধ্যে সব ঠিকঠাক করে ফেলেছে। তারপরে একটা ঝুড়ির মধ্যে আমার ছোট ছেলেকে বসালাম। আর একটা লোক ঠিক করেছে বাবুল চৌধুরী। ওই ঝুড়িটা বাচ্চাসহকারে সেই লোক মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছে। আর আমার ছেলেটা হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছি , কাঁদছি। তারপরে তো কত খালবিল, অনেক জঙ্গল। এই–সেই করতে করতে… আমার বাচ্চার কষ্ট আর আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। আমার মনে হচ্ছে যে, আল্লাহ আমি মরে গেলেই ভালো হতো। আমার আর সহ্য হচ্ছিল না। এ রকম করতে করতে তারপরে একটা সময় যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, তখন একটা জায়গায় পৌঁছালাম। তখন বাবুল চৌধুরী হাফ ছেড়ে বলছে, ওহ আমরা এখন ইন্ডিয়ান বর্ডারে। আগরতলা।

.

 আপনারা কি আগরতলা গেলেন?

.

 সুচন্দা: হুম। আগরতলা গেলাম। গিয়ে তারপরে কী করি? ওখানে একটা ভাঙা জিপের মতো। বিভিন্ন লোকজন পারাপার করে সে। আমাদেরকে বসাল ওই গাড়ির মধ্যে। লক্কড়ঝক্কড় করতে করতে এরপর গিয়ে একটা জায়গায় পৌঁছালাম। দেখলাম অনেকগুলো টিনের ঘর, এই সেই লোকজন। বুঝতে পারছি এখানে ইন্ডিয়াতে ঢুকে গেছি আমরা। আগরতলায় তখন রাত। এখানে থাকতে হবে। তো তখন একটা ওই টিনের ঘর তার মধ্যে চৌকি ঠিক করল বাবুল চৌধুরী। দুটি চৌকি—একটায় ও থাকবে, একটা আমি বাচ্চা নিয়ে থাকব। ওখানে রাতটা কাটিয়ে তারপরে আবার যাত্রা শুরু। এ রকম করতে করতে পরের দিন তারপরে গিয়ে পৌঁছালাম।

.

  কোথায় পৌঁছালেন শেষে?

.

সুচন্দা: তখন গিয়ে পৌঁছালাম কলকাতা শহরে।

.

 কলকাতা।

.

সুচন্দা: বলতেছে যে কলকাতা শহর। তো আমি দেখছি, ও মা, এই নাকি কলকাতা শহর। মনে মনে ভাবছি। ও কলকাতা শহর মানে আমার ধারণা বিরাট এই যা শুনি যা অমুক–তমুক! এমন জায়গায় নিয়ে গেল, যেখানে… যাহোক তারপরে…

.

  জহির রায়হানের সঙ্গে দেখা হলো।

.

 সুচন্দা: সেই ওখান থেকে আবার বাবুল চৌধুরী ফোন করল। বোধ হয় হাসান ভাইকে, হাসান ইমামকে। উনি ঠিকানা দিলে তারপরে আমরা ট্যাক্সিতে করে সেই জহির রায়হান যেখানে ছিলেন, সেখানে গিয়ে হাজির হলাম।

.

  উনি তো ‘স্টপ জেনোসাইড’টা তখনই বানালেন।

.

সুচন্দা: ‘স্টপ জেনোসাইড’ তো কলকাতাতেই থেকে। কলকাতাতে থেকেই তো উনি দিনের পর দিন রাতের পর রাত ওই যে শরণার্থীরা আসতেছে যাচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং হচ্ছে। …এ তো আরেক কাহিনি, মানে সংসারের কোনো খেয়াল নেই। আমি হয়ে গেলাম প্রচণ্ড অসুস্থ। মানে এত রান্দি এত টেনশন এমন অবস্থা, বাচ্চার অসুস্থ হয়ে গেছে। যাহোক কোনো কথা নেই। আমি তো জানি কাজপাগল মানুষ, এত বলে কোনো লাভ নেই।

.

 তারপরে দেশ স্বাধীন হলে আপনারা এলেন এবং ৩০ জানুয়ারি উনি মিরপুরের দিকে গেলেন। যাওয়ার সময় আপনাকে বলেছিলেন যে গাড়ির তেলের টাকা দাও। তাই তো?

.

সুচন্দা: হ্যাঁ। …উনি প্রায় রোজ সকালেই বের হয়ে যেতেন প্রতিদিন। মানে জহির রায়হান শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতেন। শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতেন এবং শুধু শহীদুল্লা কায়সার না, উনি তো সব মানুষকে ভালোবাসেন। বলছেন যে আরও যেসব মুক্তিযোদ্ধা এবং যারা বুদ্ধিজীবী ছিলেন, যাদের ডেড বডি পাওয়া যায় নাই, তাঁদের; উনাকে এই ইনফরমেশন দেওয়া হয়েছে যে উনাদেরকে মিরপুর ১০ নম্বর সেক্টরে কোথাও একটা জায়গা আটকে রাখা হয়েছে।

তখন উনি পাগল হয়ে গেলেন। উনি তখন ওই ছুটতেছেন ডিআইটিতে গিয়ে ওখানকার ম্যাপ কী করে ওই ১০ নম্বর সেক্টরে কোন দিক দিয়ে ঢোকা যায়। এরপরে প্রতিদিন সকালে বেরোতেন গাড়ি নিয়ে লোকজন নিয়ে খুঁজতে খুঁজতে কোথাও পায় না পায় না। তো আমাকে তখন উনি সকালবেলায়, উনি তখন নামাজ পড়তেন। এর মাঝখানে আবার আমরা আজমির শরীফেও গিয়েছিলাম। মাঝখানে। তো তারপরে উনি নামাজ পড়তেন। আমি তো পড়তামই। তো নামাজ পড়ে বেরিয়ে যাবে। আমি নাশতা রেডি করে বলছি… উনি তো এ রকম কাজপাগল মানুষ ছিলেন তখন তো আরও বেশি পাগল। মানে একটা কাপড়ই হয়তো তিন দিনই পরতেন। তো যখনই বাইরে যেত, আমি পিছন দিক থেকে শার্ট টেনে ধরে কাপড় চেঞ্জ করে দিতাম বা আমি বলছি মোজাটা তো অনেক ময়লা। এইটা নাও। বলে না না এখন সময় নেই। আজকে পরে ফেলেছি ও আসলে তুমি ধুয়ে দিও। তারপর আমি বললাম নাশতা খেতে বলে নাশতা খাওয়ার সময় নেই। উনি তরতর করে নিচে… একজন ছেলে ওই বাসার কাজ করত, এসে বলল যে একজন আর্মি পারসন আপনার জন্য ড্রইংরুমে অপেক্ষা করছেন উনি ডাকছেন আপনাকে তাড়াতাড়ি করে যাওয়ার জন্য। তো বললেন, বসাও আমি আসতেছি।

উনি তাড়াতাড়ি করে নাশতাটাশতা কিছুই খেলেন না, না খেয়ে উনি তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন। তো আমি তখন আল্লাহকেই স্মরণ করছিলাম। তো করার পরে হঠাৎ দেখি দু–তিন মিনিট পরেই দেখি অর্ধেক সিঁড়ি বোধ হয় গেছে কি না। ও দেখি দৌড় দিয়ে চলে আসছে। বলে কি, আরে আমার তো গাড়ির টাকাই নেই। পেট্রোল কেনার টাকা নেই। তো আমাকে টাকা দাও। উনার পকেটে কখনো উনি টাকাপয়সা রাখতেন না। যা টাকাপয়সা ইনকাম করতেন সবই জয়েন্ট ফাইল মিলে উনার ভাই জাকারিয়া হাবিবের কাছেই টাকাপয়সা, চেক উনার যা কিছু সর্বোচ্চ তার কাছে থাকত। আর আমি তখন নিজেও ইনকাম করতাম। আমার তার তার কাছে চাওয়ারও প্রয়োজন ছিল না। এভাবে বরং আমি উল্টাই করতাম। তো যাহোক উনি ওরকম এসে গাড়ির পেট্রোলের টাকা নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

.

 আর কোনো দিন এলেন না।

.

সুচন্দা: না। অপেক্ষা, অপেক্ষা, অপেক্ষা।

.

তারপরে আপনি যে ‘তিন কন্যা’ ছবিটা প্রডিউস করেছিলেন।

.

সুচন্দা: হ্যাঁ, প্রডিউস তো করেছিলাম। তারপরে তো এ রকম করে…

.

 তিন বোনে অভিনয় করলেন।

.

 সুচন্দা: হ্যাঁ, সেটা তো করলাম। এর মাঝখানে তো জীবনের অনেক চড়াই–উতরাই ছোট ছোট ভাইবোন, আমার মা ৪০ বছর বয়সে মারা গেলেন। তখন সব ভাইবোন—এই ববিতা, চম্পা মানে আমার অন্যান্য ভাইবোন সব ছোট। তখন এই হাল ধরার মতো কেউ নেই। আমার বাবাও তখন অসুস্থ হয়ে পড়লেন। উনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ডাক্তার রেস্টে থাকতে বললেন। তো তখন তার আগেই আমি বাবাকে বললাম যে আপনার চাকরির মেয়াদ আছে আরও। আমি বললাম আপনার চাকরি করার দরকার নেই। আপনি চাকরি ছেড়ে দেন। তো তখন আমি তখন ছবিতে কাজ করি। যাহোক তখন আমাকে এই অথৈ সাগরে … মানে ওই জহিরকে হারিয়ে, আর এই ছোট ছোট ভাই বোন আর আমার সন্তান নিয়ে মনে হলো যে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো আমার সমস্ত কিছু ছিন্নভিন্ন করে দিল। আমি তখন মনে হয় যে অথৈ পানিতে একটা ভেলার মধ্যেই বোধ হয় ভাসছি। জানি না আমি কোথায় যাব কী করব। আমার তখন তো আমার অত বয়সও হয়নি।

.

 না।

.

সুচন্দা: আমার সঙ্গে জহিরের বিয়ে হয়েছিল তো খুবই অল্প বয়সে।

.

  আপনার জন্ম ’৪৭ মানে পাকিস্তানের বয়স যত আপনার বয়স তত, তাই না? ’৭১ সালে ২৬ হবে বয়স।

.

 সুচন্দা: হ্যাঁ। কলেজে পড়ি হয়তো। আমি তারপর কী করব? তখন মায়ের একটা কথা, যেটা আমি মেনে চলি, মানে রবীন্দ্রনাথের একটা গানের কথা—‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’ ব্রত নিয়েই এগোতে শুরু করলাম। ভাবলাম, আমার ভেতরে সাহসও ছিল।

.

 নিশ্চয়।

.

সুচন্দা: আমার মা আমাকে এমনভাবে ছোটবেলা থেকে তৈরি করে দিয়েছেন, কোনো কিছুতেই আমি পারব না বা আমাকে দিয়ে হবে না—এ রকম কোনো কথা আমি ভাবিনি। কখনো এমনটা করিওনি। ওই যে বললাম না, আমার ভাই–বোন ও সন্তানদের মানুষ করতে হবে; এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে। যা–ই হোক, এসব চিন্তাভাবনা করে সব কাজ শুরু করলাম। তো তখন আমি অভিনয় থেকে অনেকটা দূরে। জহিরকে হারানোর পর অভিনয়ে মন নেই। কাজী জহির এসে আমাকে অভিনয় করার জন্য অফার দিলেন। আমি বললাম যে না, আমার এখন কাজ করার মতো মনই নেই। আমি এখন করতে পারব না। যা–ই হোক, এ রকম করে একটা ব্রেক হয়ে গেল, আমার অভিনয়জীবনের একটা বিশাল গ্যাপ হয়ে গেল। আমি নতুন করে তখন শুরু করলাম। যখন অভিনয় শুরু করেছিলাম, তখন থেকেই আমার মনের একটা ইচ্ছা ছিল যে আমি শিল্পী হবো, প্রযোজক হবো, পরিচালক হবো। চলচ্চিত্রের তিনটি জিনিসই আমাকে করতে হবে। আমি নিজের কাছে নিজে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম।

.

 জহির রায়হানও তো আপনাকে বলেছিলেন যে আপনার মধ্যে পরিচালকের মন আছে।

.

সুচন্দা: উনি বলেছিলেন। কিন্তু আমি বলেছিলাম, না না, আমার এখন এটা করা সম্ভব নয়। আমার আরও কিছু অভিজ্ঞতার প্রয়োজন।

.

উনি বলেছিলেন যে উনি চিত্রনাট্য লিখে দেবেন, আপনি পরিচালনা করবেন।

.

 সুচন্দা: হ্যাঁ। কিন্তু আমি বলেছিলাম, না, আরও কিছুদিন কাজ করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি, তারপর।

.

 ‘তিন কন্যা’ তো অনেক হিট হয়েছিল।

.

 সুচন্দা: হ্যাঁ, সুপারডুপার হিট। ববিতাকে যখন ছবিতে নামাব, তখন আমার বাবা কিছুতেই রাজি ছিলেন না। দোনলা বন্দুক ছিল ওনার। বন্দুক নিয়ে বাবা বললেন, তোরে আমি গুলি করে মেরে ফেলব। আমি বললাম, করেন। তারপরও উনি দেবেন না। জানালেন, আমার পড়াশোনার ক্ষতি হয়েছে, এটা উনি সহ্য করতে পারেন না। লেখাপড়া আগে, তারপর অন্য সব। তো বাবার কথা ছিল, তুমি একটা ‘কাগজের নৌকা’ ই করবা, আর করবা না। তারপর তো হয়ে গেল অন্য কিছু। … যা–ই হোক, অনেক নাটক হলো, অনেক কিছু হলো। তারপর তো ববিতাকে নিয়ে এলাম চলচ্চিত্রে। এরপর যখন আমি আর ববিতা একসঙ্গে অভিনয় করেছি ছবিতে, তারপর দেখি বাবা পুরো চেঞ্জ। … আরেকটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছি, খুব ইম্পরট্যান্ট। ছোটবেলায় আমি ফ্রক পরতাম। কিন্তু যখন বয়সটা চার–পাঁচ বছর হলো, তখন থেকে বাবা আমাকে শার্ট–প্যান্ট পরাতেন। বলতেন, তুমি আমার মেয়ে নও, তুমি আমার ছেলে। উনি ভাবতেন যে আমার এই মেয়েই সব করতে পারবে। আমার প্রতি ওনার এ রকম একটা দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। আমি শার্ট–প্যান্ট পরেই থাকতাম। যাহোক, আপনার কথায় ফিরে আসি।

.

 ‘তিন কন্যা’...

.

 সুচন্দা: হ্যাঁ, ‘তিন কন্যা’। তখন বাবা খুবই অসুস্থ। একদিন আমাকে ডেকে বললেন, মা, তোমরা দুজন তো এক ছবিতে অভিনয় করেছ। আমার খুব ইচ্ছা যে তোমরা তিন বোন একটা ছবিতে অভিনয় করো। আমি দেখে যেতে চাই। উনি এই কথাটা এ রকম করে বললেন এবং যখন কথাটা বলছিলেন, ওনার চোখ দুটো ছলছল করছিল। আমি তাকিয়ে দেখছিলাম। সেটা আমার মনের মধ্যে ঢুকে গেল। এর পর থেকে সারাক্ষণ যত কাজ, যত শুটিং, যা কিছু করতাম, আমার মাথায় চিন্তাটা ঘুরত।

একপর্যায়ে বাবা মারা গেলেন। বাবা মারা গেলে তখন আমি ভাবলাম যে আমি সব আশাই পূরণ করলাম, সবকিছুই করছি, কিন্তু আমার বাবার যে আশা, ইচ্ছা ছিল, সেটা কি পূরণ করতে পারব না? না, আমাকে করতেই হবে, যেভাবেই হোক। তখন আউটডোর শুটিংয়ে যেতাম কক্সবাজারে, এখানে–ওখানে শুটিংয়ে। তখন আমি নিজে আমার ছোটবেলা থেকেই মায়ের থেকে পাওয়া… লেখার একটা অভ্যাস ছিল; তো, ওই ঘুমাতে যাওয়ার আগে বা ঘুম থেকে উঠে কাগজ–কলম বা যা–ই হোক, মাথার কাছে থাকত, যা পারতাম হিজিবিজি লিখতাম। কিন্তু বুঝতে পারতাম যে আমি কী লিখছি। যা–ই হোক, এ রকম করে করে আমি লেখা শেষ করলাম।

ভাবলাম, তাহলে ছবির নামটা কী হবে? ছবির নাম কী দেব? আমি মোটামুটি একটা গল্পের কাঠামো তৈরি করে ফেললাম যে আমরা তিন বোন—একজন এই সাংবাদিক, একজন পুলিশ অফিসার আর একজন একটু দুষ্টু টাইপের, পকেটমার এই–সেই। আমি জানি যে এটার জন্য ববিতাকে মানাবে। আর চম্পা যে রকম, সে জন্য ওকে পুলিশ অফিসার হিসেবে মানাবে। আর আমি হচ্ছি সাংবাদিক। নিরীহ। চুপচাপ সাংবাদিকতা করি। এ রকম করে চিন্তা করলাম। ছবির নাম কী রাখব? তখন ভাবলাম, আরে, এত নাম খোঁজাখুঁজি কেন। আমরা তিনজন তো আমার বাবার তিন কন্যা।

.

 রাইট।

.

সুচন্দা: তাহলে ছবির নাম হবে ‘তিন কন্যা’। তখন এই ‘তিন কন্যা’ নাম ঠিক করলাম এবং শিবলি সাদিককে আমি ডাকলাম। উনি তখন খুব ভালো টেকনিশিয়ান, ভালো ডিরেক্টর, কিন্তু ওনার কোনো ছবি চলত না। ওনাকে ডেকে যখন অফার দিলাম, উনি বললেন, আমাকে দিয়ে আপনি ছবি করবেন? হ্যাঁ, আপনাকে দিয়ে করব। কারণ, আমার ভেতরে সব সময় একটা সাহস ছিল এবং কনফিডেন্স ছিল আমার কাজের ক্ষেত্রে। আমি জানতাম, যেটা হবে এবং বাদবাকি কাজ তো আমিই করব। তখন উনি রাজি হলেন। তারপর ‘তিন কন্যা’ ছবি শুরু হলো।

.

আচ্ছা। তারপর ‘হাজার বছর ধরে’ সিনেমায় তো আপনি পরিচালকও হলেন এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলেন।

.

 সুচন্দা: না, তার আগে আমি একটা ছবি শুরু করেছি। পরিচালক হিসেবে ‘হাজার বছর ধরে’ দ্বিতীয় ছবি।

.

  জি, পরিচালক হিসেবে।

.

 সুচন্দা: তারপর ‘তিন কন্যা’ করলাম, অন্য অনেক ছবি করলাম। প্রায় আটটা ছবি প্রযোজনা করেছি।

.

 হ্যাঁ হ্যাঁ।

.

সুচন্দা: সবই কিন্তু আমার ব্যবসাসফল ছবি এবং পুরস্কারপ্রাপ্ত অনেকগুলোই। আমার ছবি দেখে কেউ কোনো দিন বলেনি যে ভালো নয়। এগুলো কিন্তু সবই আমার চিন্তাভাবনার ছিল, আমার কোনো পারসোনাল কাহিনিকারের নয়। আমার নিজের ব্যক্তিগত। তো এগুলো করলাম, তারপর যেটা বলছিলাম যে...

.

  ‘হাজার বছর ধরে’র আগে আরেকটি ছবি প্রযোজনা করেছেন।

.

সুচন্দা: তখন আমি চিন্তা করলাম, ‘তিন কন্যা’ প্রযোজনা করলাম, আরও অনেক ছবি করলাম, এবার আমাকে পরিচালনা করতে হবে। পরিচালনা করতে হলে কী করব? তখন পত্রিকার পাতায় আমি প্রায় দেখতাম যে বিদেশে লোক পাচার হচ্ছে। যে লোক যাচ্ছে, সে তার জমিজমা বিক্রি করছে, নিঃস্ব হচ্ছে। টাউট লোকজনের পাল্লায় পড়ে অনেকে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। তখন মনে হলো, এই সাবজেক্টটা তো ভালো! এই সাবজেক্টের ওপরই আমি আমার প্রথম ছবি করব।

.

 এটা কোন ছবি ছিল?

.

সুচন্দা: তখন ছবির নাম রাখলাম ‘বিদেশযাত্রা’। মালয়েশিয়ায় শুটিং করলাম। সবকিছুর পারমিশন করাতে করাতেও সময় লাগল। প্রায় ২১ জনের টিম ছিল। লাইট, ক্যামেরা, লাইটম্যান, ড্যান্স ডিরেক্টর, অমুক–তমুক সব নিয়ে গেলাম। মেকআপম্যান থেকে শুরু করে সব। প্রোডাকশন ম্যানেজার আমি, পরিচালকও আমি, প্রযোজকও আমি—সব আমি নিজ হাতে করি। আমার বড় ছেলে আরাফাত বাইরে পড়ছিল, তখন পড়া শেষ। আমি বললাম, বাবা, তুমি আমাকে একটু সহযোগিতা করো। তখন ও আমার সঙ্গে গেল।

যা–ই হোক, ‘বিদেশযাত্রা’ নামেই শুটিং হলো, সবই করলাম। দেশে ফিরলাম, ছবিটা রিলিজ করব। সেন্সর হয়ে গেছে ‘বিদেশযাত্রা’ নামে। ছবিটা খুবই সুন্দর। গল্প খুবই সুন্দর। সিনসিনারি অপূর্ব। সেই দুঃখ–কষ্ট আছে, ওখানে গিয়ে তারা কী করে না করে, সব আছে। আমি তখন অফিসেই বসি, তো যারা বুকিং এজেন্ট, প্রযোজক, যারা ছবি চালাবে; আমার ম্যানেজার ছিল, চেকার ছিল, তারা বলছে যে নামটা ঠিক নয়।

.

 কেন?

.

 সুচন্দা: নামটা খুব নরম।

.

 নরম!

.

 সুচন্দা: তখন তো খুব অশ্লীল ছবির ব্যবসা চলছে রমরমা। মানে কাটপিস ঢুকিয়ে দিয়ে হলের মধ্যে সব ছবি চলছে। বলে, এই নামের ছবি চলবে না। কেউ চালাবে না। তো আমি বিপাকে পড়লাম, যে এত সুন্দর নাম গল্পের সাথে! আমি কোনো দিন কারও কথা শুনি না। আমি যেটা ভালো মনে করি, ভালো হোক খারাপ হোক, আমার সিদ্ধান্তে অটল থাকি। কিন্তু কী যে হলো, ফিল্মের প্রযোজক, পরিচালক, বুকিং এজেন্ট সবাই এমন করে বলতে শুরু করল, তখন চেঞ্জ করে নাম দিলাম ‘সবুজ কোট কালো চশমা’।

.

 ‘সবুজ কোট কালো চশমা’!

.

 সুচন্দা: গল্পের কাহিনির মধ্যে একটা ঘটনা আছে। এই নাম দিয়ে দিলাম। দেওয়ার পর তো ছবিটা… ওই সব কাটপিস… আমার ছবি তো কাটপিস চালানোর সাহস কারও নেই।

.

সুন্দর সামাজিক ছবি।

.

 সুচন্দা: তখন আমার ছবির একরকমের ব্যবসা হলো। কিন্তু অন্য ছবিগুলোর যেমন ব্যবসা হলো, তেমন ব্যবসা হলো না। তাতে আমার কোনো দুঃখ নেই। আমার প্রথম ছবি, গল্প সুন্দর, সব সুন্দর।

.

তাহলে দ্বিতীয় ছবি তখন হলো ‘হাজার বছর ধরে’। জহির রায়হানের উপন্যাস অবলম্বনে।

.

সুচন্দা: তখন আমি শুরু করিনি। এই ছবি করার পর ভাবছি যে পরবর্তীতে কী ছবি করব? জহির রায়হানের এই গল্পটা আমি অনেকবার পড়েছি। এই যে নারীদের নিয়ে, খেটে খাওয়া মানুষ, কুসংস্কার, নিম্নবিত্ত মানুষ, মধ্যবিত্ত মানুষের যে জীবন, সেই জীবনে এই নারীর অবমূল্যায়ন—এই জিনিসগুলো। এই বই পড়তে পড়তে আমি খুব আকৃষ্ট হয়ে গেলাম। তখন আমি প্রকৃতিকে ভালোবাসি। আমার বান্ধবীরা মিলে অনেক সময় নৌকা নিয়ে এদিকে–সেদিকে ঘুরে বেড়াতাম। তো আমি তখন বিভিন্ন জায়গায় যেতাম আর মনে করতাম, আরে, গল্পের সঙ্গে তো এই জায়গাটা মানায়। এখানে শুটিং করলে এই দৃশ্যটা খুব ভালো হয়। তখন লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করে আমি ডায়েরির পাতায় জায়গার নাম, ঠিকানা লিখে সব রাখতাম। এটা কিন্তু আমার এক দিনের নয়। দুই বছর, আড়াই বছর ধরে এই গল্প পড়া, চিত্রনাট্য করা বা এই জায়গাগুলো, স্পটগুলো সব ঠিক করেছিলাম এবং ঠিক সময়মতো সব জায়গায় গিয়ে আমি শুটিং করেছি। এই ছবি দেখার পর দেশে–বিদেশে আপনারা হয়তো জানেন…

.

  নিশ্চয়।

.

 সুচন্দা: বাংলাদেশের যদি প্রকৃতি দেখতে হয়, তাহলে এই ছবি দেখতে হবে। বাংলার যে ঐতিহ্য গ্রামের, অলরেডি তখন টিনের ঘর গ্রামগঞ্জে উঠে গেছে, ইলেকট্রিক তার। আমি সেগুলো সরিয়ে কত কষ্ট যে করেছি ছবি করতে গিয়ে, তা বর্ণনাতীত। শুধু তা–ই নয়, আমি কিন্তু শুটিং করে শীতকালে ওয়েট করছি বর্ষাকালের জন্য। বিভিন্ন ওয়েদারে এই শুটিংগুলো করেছি। যার জন্য হয়তো ছবিটা সবার পছন্দ।

.

  হ্যাঁ, আপনি তো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন, সেরা পরিচালকের পুরস্কার পেয়েছেন।

.

 সুচন্দা: ছটা পুরস্কার। জহির রায়হানের কাহিনি, আমি বেস্ট ডিরেক্টর এবং বেস্ট ছবি।

.

 আচ্ছা, আরেকটু ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি। ’৭৮ সালের দিকে আপনার তো আরেকবার বিয়ে হলো। ওনার নাম কী?

.

সুচন্দা: পরে যে আমার বিয়ে হলো, ওনার নাম এম রেজাউল মালিক। বরিশালে বাড়ি। খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে একমাত্র ছেলে।

.

 তারপর আপনার তিনজন মেয়ে হয়েছে।

.

 সুচন্দা: আমার কিন্তু বিয়ে করার কোনো রকম চিন্তাভাবনাই ছিল না। আমি কিছুতেই রাজি নই। তখন আমার বাবা কিন্তু বেঁচে আছেন। অসুস্থ। বললেন, দেখো, তোমার ভাই–বোন ছোট। তুমি চলচ্চিত্র অঙ্গনে কাজ করো। বয়স কম। তোমার সন্তান ছোট। তোমাদের তো কোনো গার্ডিয়ান নেই। একটা পরিবারের গার্ডিয়ান তো লাগবে। তোমাদের দেখভাল করবে কে?

.

 ৩০-৩১ বছর বয়স...

.

 সুচন্দা: …এই বয়সে তোমার দেখভাল তোমাকে বিয়ে করতে হবে। তখন আমার চাচারা দেশের বাড়ি থেকে প্রেশার দিতে শুরু করলেন। আমার মামা ছিলেন। আমার বাবা সবাই মিলে, আমার টিচার কলেজে, যেই কলেজে আমি, সিটি নাইট কলেজে পড়তাম। ওনার নাম হচ্ছে কোরেশী সাহেব। উনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। সবাই মিলে তখন আমাকে বললেন যে …

.

 আপনার পরে তিন মেয়ে হলো।

.

সুচন্দা: হ্যাঁ, পরে ও ঘরে আমার দুটি মেয়ে।

.

আচ্ছা, দুই ছেলে দুই মেয়ে।

.

 সুচন্দা: দুই ছেলে দুই মেয়ে।

.

 আপনার দ্বিতীয় বিয়ের, আমাদের যে ব্রাদার ইন ল, উনি কি অল্প বয়সেই মারা গেছেন?

.

সুচন্দা: হ্যাঁ, অল্প বয়সে মারা গেছেন। হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। মানে বিয়ের কয়েক বছর পরই উনি মৃত্যুবরণ করেন।

.

 দুই মেয়ে, আগের ঘরে দুই ছেলে—চার ছেলে–মেয়ে, নাতি–নাতনি নিয়ে ভালোই আছেন।

.

সুচন্দা: নাতি–নাতনি নিয়ে এখন আমার পরিবারটা অনেক বড় হয়ে গেছে মাশা আল্লাহ; আপনাদের দোয়া, আল্লাহর রহমতে।

.

 একটা প্রশ্ন। বলেন তো, ববিতা আপা, চম্পা আপা, সুচন্দা—তিনজনের মধ্যে ভালো অভিনেত্রী কে?

.

 সুচন্দা: আমি ছাড়া ওরা দুজন।

.

  (হাসি)

.

সুচন্দা: ওরা দুজন তো অনেক বড়।

.

 নিশ্চয়। আপনার একটা ঐতিহাসিক অবদান আছে বাংলা চলচ্চিত্রে।

.

 সুচন্দা: … ওদের আমি যে কত ভালোবাসি! এদের দেশে–বিদেশে অভিনয় করার ব্যাপারে আমার এবং জহির রায়হানের অনেক অবদান।

.

  হুম।

.

 সুচন্দা: অনেক অবদান।

.

 নিশ্চয়।

.

 সুচন্দা: আমি বড়।

.

  ওই যে আপনার আব্বা বলে গেছেন না, তুমি তো মেয়ে নও, আমার ছেলে।

.

 সুচন্দা: ছেলে।

.

 বড় সন্তান।

.

সুচন্দা: আমি আমার দায়িত্ব আমি পালন করেছি। জীবনে অনেক ঘাত–প্রতিঘাত, কষ্ট–দুঃখ পেয়েছি, কিন্তু তার হিসাব–নিকাশ করি না। আমি কী পেয়েছি, কী পেলাম কী পেলাম না।

.

ভালোবাসা পেয়েছেন।

.

 সুচন্দা: যা পেয়েছি, জীবনে সেটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট।

.

  এখন নতুন প্রজন্মের শিল্পী যারা অভিনয় করছে—এখন নাটক, সিনেমা, অনেক নতুন ধরনের ছবি হচ্ছে—তাদের উদ্দেশে কিছু বলেন। আমরা শেষ করে দিই। এটাই শেষ প্রশ্ন।

.

 সুচন্দা: তাদের উদ্দেশে শুধু একটাই কথা বলতে চাই, এত দিন অনেক অপেক্ষা করলাম। আমি মনে করি, আমাদের যাঁরা পরিচালক আছেন দু–চারজন, তাঁরা তো ওই ধরনের ছবি এত দিন আর তৈরি করেননি। যা–ই হোক, আমি মনে করি যে আজকের যে নতুন প্রজন্ম, এরাই পারবে আমাদের সেই সোনালি দিনে ফিরিয়ে নিতে। এদের মেধা, এদের কর্ম; এরা চেষ্টা করলেই আমি বিশ্বাস করি, এই প্রজন্মই আমাদের আবার সেই সোনালি দিনের চলচ্চিত্রে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।

.

 খুব সুন্দর বললেন। এটা দিয়ে আমরা শেষ করি। বাংলাদেশের দর্শক এই অনুষ্ঠান যাঁরা দেখছেন, বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম এবং বাংলাদেশের জনগণ, তাঁদের উদ্দেশে আপনি কিছু বলবেন কি না?

.

 সুচন্দা: হ্যাঁ, দর্শকেরাই তো আমার সব। দর্শক বলেন, পাঠক বলেন, শ্রোতা বলেন, তাঁরাই তো আজ আমাকে কোহিনুর আক্তার থেকে সুচন্দা বানিয়েছেন। তাঁদের ভালোবাসা, তাঁদের দোয়া। তাঁরা ছাড়া কি আমি কোহিনুর আক্তার হতাম? তাঁরা যদি আমার ছবি না দেখতেন, আমাকে যদি এত ভালো না বাসতেন, তাহলে আমি কখনোই সুচন্দা হতে পারতাম না। আপনাদের বলব, আপনারা আমাকে দোয়া করবেন। আমি যেন শেষনিদ্রায় যাওয়ার আগপর্যন্ত আপনাদের ভালোবাসা নিয়ে, আপনাদের শ্রদ্ধা নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারি।

.

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, অনেক সময় দিলেন। আপনার স্মৃতির কথা, এটা বাংলাদেশের ইতিহাস। এটা শুধু আপনার জীবনের কথা নয়। এটা আমাদের সবার জানা উচিত। দর্শকমণ্ডলী, আমরা ক্রাউন সিমেন্ট–মুক্তকণ্ঠের এই বিশেষ আয়োজন ‘অভিজ্ঞতার আলো’তে এতক্ষণ বাংলাদেশের কিংবদন্তি শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক সুচন্দার কথা শুনলাম। এর থেকে আমরা আমাদের জীবনকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব, সেই রসদ পাব। সেই আলোয় আমরা আমাদের বাংলাদেশকে আলোকিত করব। সবাই ভালো থাকবেন।