বর্ষার আগমনে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের খইয়াছড়া ঝরনা এখন অপরূপ সৌন্দর্যে সেজেছে, যা পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। গভীর বন, পাহাড়ি ছড়া এবং ট্রেকিংয়ের রোমাঞ্চ মিলিয়ে এটি দেশের অন্যতম জনপ্রিয় একটি গন্তব্য। তবে এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এখানে রয়েছে যথেষ্ট ঝুঁকি। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের তথ্যানুযায়ী, গত ছয় বছরে মিরসরাইয়ের ঝরনাগুলোতে ৩৭টি দুর্ঘটনায় ৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৫১ জন। এর মধ্যে অধিকাংশ দুর্ঘটনাটি ঘটেছে খইয়াছড়া ঝরনায়। ফলে এই ঝরনা ভ্রমণে বিশেষ সতর্কতা ও বিধিনিষেধ মেনে চলার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

মিরসরাই উপজেলার খইয়াছড়া ইউনিয়নের পূর্ব খইয়াছড়া এলাকায় অবস্থিত এই ঝরনাটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার পূর্বে। মহাসড়ক পেরিয়ে এক কিলোমিটার পাকা সড়ক এবং এরপর গ্রামীণ মেঠো পথ ও ছোট ছোট পাহাড়ি ছড়া পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় এখানে। স্বচ্ছ জলের পাথুরে ছড়া আর বুনো বনের পাখিদের কলকাকলি পর্যটকদের এক অনন্য অভিজ্ঞতা দেয়। পাহাড়ের কয়েকটি ধাপ ডিঙিয়ে গেলেই চোখে পড়ে খইয়াছড়া ঝরনার মোহনীয় রূপ। সুউচ্চ পাহাড়চূড়া থেকে সশব্দে নেমে আসা পানি যে কাউকে মুগ্ধ করে। খইয়াছড়া ছাড়াও মিরসরাইয়ে নাপিত্তাছড়া, সোনাইছড়ি, বাওয়াছড়া ও রূপসী নামে আরও কিছু পরিচিত ঝরনা রয়েছে, যা চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বারইয়াঢালা জাতীয় উদ্যানের অন্তর্ভুক্ত।

সম্প্রতি খইয়াছড়া ঝরনায় আসা ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আজমল হাকিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা তিন বন্ধু মিলে এবারই প্রথম খইয়াছড়া ঝরনায় ঘুরতে এলাম। এ ঝরনা অপরূপ। এখানে এসে শুধু ঝরনা নয়, বন-পাহাড়ের মিতালি, ঝিরি আর পাহাড়ি পথে ট্রেকিং করার আনন্দও পেয়েছি।’

তবে পর্যটকদের জন্য বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিছু কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। বিশেষ করে ভারী বৃষ্টির সময় পাহাড়ি ছড়ায় ঢল নামার সম্ভাবনা থাকে, তাই ওই সময়ে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। বন বিভাগ ও ইজারাদার নির্ধারিত রুট ছাড়া অন্য পথে যাওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি পথে ঝরনাচূড়ায় ওঠা সম্পূর্ণ নিষেধ। এছাড়া বিপজ্জনক স্থানে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলা ঝুঁকিপূর্ণ। নিরাপদ ভ্রমণের জন্য গাইডের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বারইয়াঢালা জাতীয় উদ্যানের ঝরনাগুলোর ইজারা নিয়েছে পর্যটন প্রতিষ্ঠান 'থ্রি-বি'। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আকার–আয়তনে খইয়াছড়া বাংলাদেশের বড় ঝরনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখানে প্রতিবছরই পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। তবে কিছু পর্যটকের অসতর্কতা আর অতি কৌতূহলের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনা এড়িয়ে নিরাপদে ঝরনাভ্রমণ করতে আমরা পর্যটকদের বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে থাকি। এ ছাড়া বিপজ্জনক স্থানগুলো চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে। রাখা হয়েছে নিরাপত্তাকর্মীও।’

বারইয়াঢালা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা আশরাফুল আলম জানান, মিরসরাই ও সীতাকুণ্ডের সব ঝরনার মধ্যে খইয়াছড়া সবচেয়ে বড়। বর্ষায় এর সৌন্দর্য বহুগুণ বেড়ে যায়। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অতি উৎসাহী পর্যটকরা দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। বিশেষ করে ছড়া এলাকার কূপগুলো সতর্কতার সঙ্গে পার হওয়া, ভারী বৃষ্টির সময় ভ্রমণ না করা এবং চূড়ায় উঠে সেলফি না তোলাসহ বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা জরুরি।

ভ্রমণ পরিকল্পনা যারা করছেন, তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বড়তাকিয়া বাজারে নেমে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ঝরনার পথে যেতে পারেন। খাবারের জন্য বড়তাকিয়া বাজারের রেস্তোরাঁ বা ঝরনা এলাকায় ব্যবস্থা রয়েছে। রাত্রিযাপনের জন্য বড়তাকিয়া বাজার, মহামায়া হ্রদ ও বারইয়ারহাট পৌর বাজারের হোটেলগুলো অথবা সোনা পাহাড়ে অবস্থিত ফার্ম হাউস রিসোর্টে (পূর্ব বুকিং সাপেক্ষে) থাকা সম্ভব।