২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল কেবল স্পেনের শিরোপা জয়ের জন্য নয়, বরং এক অনন্য ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। প্রথমবারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনালে সুপার বোলের আদলে আয়োজন করা হয় এক জাঁকজমকপূর্ণ হাফটাইম শো। এই বিশেষ মঞ্চে একসঙ্গে পারফর্ম করেছেন পপসংগীতের কিংবদন্তি ম্যাডোনা, লাতিন তারকা শাকিরা, কানাডীয় গায়ক জাস্টিন বিবার এবং বিশ্বখ্যাত কে-পপ ব্যান্ড বিটিএস। এছাড়া অনুষ্ঠানে অংশ নেন জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ ‘টেড ল্যাসো’র তারকা জেসন সুডেইকিস ও ব্রেন্ডন হান্ট এবং শিশুদের প্রিয় চরিত্র ‘দ্য মাপেটস’।

এত বড় আয়োজনের পর অনেকের ধারণা ছিল, এই তারকা শিল্পীরা মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক নিয়েছেন। তবে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন; বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত এই মঞ্চে গান গেয়ে তাঁরা কেউই একটি ডলারও নেননি।

ফুটবল বিশ্বকাপে হাফটাইম শো-এর ধারণাটি সম্পূর্ণ নতুন। যুক্তরাষ্ট্রের এনএফএলের সুপার বোল হাফটাইম শো-এর মডেল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ফিফা এই উদ্যোগ নেয়। উল্লেখ্য, সুপার বোলে এর আগে মাইকেল জ্যাকসন, প্রিন্স, বেয়ন্সে, রিহানা, লেডি গাগা এবং কেনড্রিক লামারের মতো তারকারা পারফর্ম করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেয়। আমেরিকান ক্রীড়া সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিশ্বকাপেও যুক্ত করার লক্ষ্যেই আয়োজকরা এই পরিকল্পনা করেন।

ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল স্পেন ও আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত সময়ে গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের গোলে স্পেন ১-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে। তবে মাঠের ফুটবলের চেয়েও বেশি আলোচনা ছিল বিরতির অনুষ্ঠানটি নিয়ে। সাধারণত ফুটবলে হাফটাইম ১৫ মিনিট হলেও এই বিশেষ অনুষ্ঠানের কারণে বিরতি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৭ মিনিটে। এতে অনেক ফুটবলপ্রেমী বিরক্ত হয়ে জানান, ফুটবলের ছন্দ নষ্ট হয়েছে। ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ও বিবিসি স্পোর্টসের বিশ্লেষক ওয়েন রুনি সরাসরি বলেন, তিনি শিল্পীদের পছন্দ করেন, কিন্তু হাফটাইম শোটি তাঁর ভালো লাগেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই আয়োজন নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়; কেউ একে বৈশ্বিক বিনোদন হিসেবে দেখলেও অনেকে মনে করেন এটি ফুটবলের ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

জাস্টিন বিবার, শাকিরা, ম্যাডোনা কিংবা বিটিএস-এর মতো তারকাদের ব্যক্তিগত কনসার্ট বা করপোরেট অনুষ্ঠানে পারিশ্রমিক লাখ লাখ থেকে কোটি ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে। তাই বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁদের পারিশ্রমিক নিয়ে কৌতূহল ছিল স্বাভাবিক। তবে দ্য অ্যাথলেটিকের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, কোনো শিল্পীই অর্থ নেননি; তাঁরা সবাই স্বেচ্ছায় পারফর্ম করেছেন।

এই উদ্যোগটি ছিল গ্লোবাল সিটিজেনের সঙ্গে ফিফার একটি সামাজিক প্রকল্পের অংশ। ফিফা গ্লোবাল সিটিজেন এডুকেশন ফান্ডের মাধ্যমে বিশ্বের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও ফুটবল খেলার সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই শিল্পীরা বিনা পারিশ্রমিকে মঞ্চ মাতান। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই হাফটাইম শো ঘোষণার সময় বলেছিলেন, "বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল ম্যাচে এই অনুষ্ঠান শুধু আনন্দের উপলক্ষ হবে না; এটি শিক্ষা, ঐক্য এবং মানবিকতার বার্তাও ছড়িয়ে দেবে।"

মজার বিষয় হলো, সুপার বোলেও অনেক সময় শিল্পীরা সরাসরি পারিশ্রমিক পান না। এনএফএল সাধারণত শোর প্রযোজনা ব্যয় বহন করে এবং শিল্পীরা পান বৈশ্বিক প্রচারণার বিশাল সুযোগ। বিশ্বকাপেও অনেকটা একই দর্শন অনুসরণ করা হয়েছে।