শেরপুরের একমাত্র বেসরকারি হিমাগারে অ্যামোনিয়া গ্যাস লিকেজের ঘটনায় নষ্ট হয়ে গেছে প্রায় ৫৭ হাজার বস্তা সংরক্ষিত আলু। এতে শতাধিক কৃষক ও আলু ব্যবসায়ী পড়েছেন বড়ো ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে। শুধু তাই নয়, এ ঘটনার প্রভাবে আগামী মৌসুমে বীজ আলুর সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

গত ১৪ জুলাই জেলা শহরের বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত একমাত্র বেসরকারি তাজ কোল্ড স্টোরেজে এ ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, স্টোরেজের রেফ্রিজারেশন ইউনিটে গত ১৪ জুলাই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একটি পাইপ ফেটে বিষাক্ত অ্যামোনিয়া গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে নিজস্ব ব্যবস্থায় স্টোরেজ কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় গ্যাসের লিকেজ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। কিন্তু ততক্ষণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যায়।

স্টোরেজটির তিনটি সংরক্ষণ চেম্বারের মধ্যে দ্বিতীয় চেম্বারে রাখা প্রায় ৫৭ হাজার বস্তা আলু সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। যার পরিমাণ প্রায় তিন হাজার একশ টনের বেশি। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা কোল্ড স্টোরেজে ভিড় করেন এবং ক্ষতিপূরণের দাবি জানান।

কৃষক ও আলু ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কোল্ড স্টোরেজে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবেই এ দুর্ঘটনা হয়েছে। তাদের অনেকেই ঋণ নিয়ে আলু উৎপাদন করে আগামী মৌসুমে বীজ হিসেবে ব্যবহারের জন্য হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু গ্যাস লিকেজে সেই আলু নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। নতুন করে বীজ আলু সংগ্রহ করতে হলে বেশি দামে কিনতে হবে, ফলে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। এতে অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের পক্ষে আগামী মৌসুমে চাষ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

এ ঘটনায় তাজ কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক মো. রফিকুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অ্যামোনিয়া গ্যাস লিক হয়ে বিপুল পরিমাণ আলু নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের ক্ষতি ও পরবর্তী করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কৃষক হামিদুর রহমান বলেন, অনেক কষ্ট কইরা আলু চাষ করছি। ঋণ কইরা বীজ, সার, ওষুধ কিনছি। বীজের লাইগা হিমাগারে আলু রাখছিলাম। অহন শুনি সব আলু নষ্ট অইয়া গেছে। এই ক্ষতি আমরা কেমনে সামাল দিমু? সরকার আর হিমাগার কর্তৃপক্ষ যদি ক্ষতিপূরণ না দেয়, তাইলে পথে বসা ছাড়া উপায় নাই।

আরেক কৃষক রহমত আলী বলেন, আমরা গরিব মানুষ, এই ক্ষতি বইন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। আমরা ক্ষতিপূরণ চাই।

কৃষক সোলাইমান বলেন, দুর্ঘটনায় শুধু আমাদের আলুই নষ্ট হয়নি, পুরো পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে গেছে। এই ক্ষতি নিজেরা বহন করা সম্ভব নয়।

এসময় স্টোরেজ কর্তৃপক্ষ ও সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি জানান তিনি। সামনে যেন আর কোনো কৃষক এমন ক্ষতির শিকার না হন, সে জন্য সরকারকে ব্যবস্থাও নিতে বলেন তিনি।

আলু ব্যবসায়ী আব্দুল গণি জানান, হিমাগারে তিনি ১ হাজার ৬৪০ বস্তা দেশি আলু সংরক্ষণ করেছিলেন। গ্যাস লিকেজের ঘটনায় যা সবই নষ্ট হয়ে গেছে। এতে তার কয়েক লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত মৌসুমে শেরপুরে ৫ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯০০ মেট্রিক টন। সরকারি বীজ সংরক্ষণাগারের ধারণক্ষমতা সীমিত হওয়ায় জেলার অধিকাংশ কৃষক বেসরকারি কোল্ড স্টোরেজের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এ দুর্ঘটনার প্রভাব আগামী মৌসুমের আলু চাষেও পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।

এদিকে, নষ্ট হওয়া আলু বাজারে সরবরাহ হলে জনস্বাস্থ্যের জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করবে কি না এ প্রসঙ্গে জেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপদ খাদ্য অফিসার আবু নাসের মোহাম্মদ শফিউল্লাহ জানান, আলুর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার প্রতিবেদন সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা বিনতে রফিক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায় নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।