লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরী হাটের মেঘনা নদীর তীরে সারিবদ্ধভাবে বাঁধা বেশ কিছু জেলে নৌকা। বাইরে থেকে কেবল সাধারণ ঘরবসতি মনে হলেও এগুলো আসলে মান্তা সম্প্রদায়ের ভাসমান সংসার। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো স্থায়ী ঠিকানা বা ভূমি ছাড়াই নদীতে জীবন কাটানো এই যাযাবর জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনে অবহেলা ও বঞ্চনাই ছিল প্রধান নিয়তি। জন্ম থেকে মৃত্যু—সবই কাটে নৌকার ছোট্ট ছাদের নিচে। এমনকি মারা গেলেও মেলেনি এক চিলতে জমি; লাশ নিয়ে যেতে হতো মেঘনার জনমানবহীন কোনো চরে, যা পরদিন জোয়ারের তোড়ে ভেসে যেত। তবে এই শতবছরের অন্ধকারের বুকে নতুন এক আলোর বাতিঘর হয়ে দাঁড়িয়েছে মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্ট পরিচালিত মেঘনাপাড় ধীবর আলোর পাঠশালা।
যে শিশুদের বাবাকে সহায়তা করতে মেঘনার উত্তাল তরঙ্গে মাছ ধরা কিংবা নৌকার অন্ধকার কোণে সময় কাটানোর কথা ছিল, তারা এখন পাঠশালায় শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিবিড় মমতা ও প্রচেষ্টায় বিনামূল্যে বই, খাতা, কলম ও পোশাক পেয়ে নতুন দিগন্তের স্বপ্ন দেখছে মান্তা শিশুরা। পাঠশালার প্রধান শিক্ষক মোঃ জহিরুল ইসলাম জানান, প্রকৃতির বৈরিতা, ঝড়-ঝঞ্ঝা বা চরম দারিদ্র্য এখন আর শিশুদের স্কুলে আসা আটকাতে পারছে না। প্রতিদিন সকালে তাদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ।
স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের মতে, এটি শুধু একটি স্কুল পরিচালনা নয়, বরং অবহেলিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মূলধারার সমাজে ফিরিয়ে আনার এবং এক মানবিক সমাজ গঠনের অনন্য প্রচেষ্টা। শত বছরের অবহেলার দেওয়াল ভেঙে মান্তা শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে বাতিঘরের ভূমিকা পালন করছে এই মেঘনাপাড় ধীবর আলোর পাঠশালা।