বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার বিশাল সমর্থকগোষ্ঠীর যে বাঁধভাঙা উল্লাসের প্রত্যাশা ছিল, শেষ পর্যন্ত তা দীর্ঘশ্বাসে রূপ নিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে স্থানীয় সময় রোববার ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের গোলটি আর্জেন্টিনার জালে জড়াতেই টিএসসিতে উপস্থিত অধিকাংশ দর্শকের মুখে নেমে এল বিষাদের ছায়া। স্পেনের বিশ্বজয়ের রাতে উৎসবের চেয়ে হতাশার সুরই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
মধ্যরাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটলেও টিএসসিতে ফুটবলপ্রেমীদের আনাগোনা কমেনি। রাজু ভাস্কর্যের চারপাশ নীল-আকাশি রঙে ছেয়ে থাকলেও তার মাঝে দেখা মিলেছে লাল-হলুদ জার্সি পরিহিত কয়েকজন গর্বিত স্পেন সমর্থকের। স্ট্রিটফুডের কার্ট ও চায়ের স্টলগুলোতে ছিল রমরমা আড্ডা। পাঞ্চ মেশিনের ভিড় এবং ম্যাচ-পরবর্তী চুলচেরা বিশ্লেষণ চলে ভোর পেরিয়ে পুরো আলো ফোটা পর্যন্ত।
সাধারণ দর্শকদের পাশাপাশি রাতভর ব্যস্ত ছিলেন বিভিন্ন ইউটিউবার, ফেসবুক কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকেরা। তাঁরা দর্শকদের প্রতিক্রিয়া এবং ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যকার চিরচেনা রেষারেষি ও কৌতুকপূর্ণ তর্কাতর্কির দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করছিলেন।
ভিড়ের মধ্যে নোয়াখালীর ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জাকির হোসেন কাঁধে ফিলিস্তিনের পতাকা নিয়ে স্পেনের সমর্থন জানান। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘স্পেনের উদীয়মান তারকা লামিনে ইয়ামালকে আমার খুব ভালো লাগে। তা ছাড়া ফিলিস্তিনকে স্পেন সব সময় যেভাবে নৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে, সেই ভালোবাসার জায়গা থেকেই আজ আমার এই পতাকা নিয়ে স্পেনের পক্ষে দাঁড়ানো।’
পুরান ঢাকার চকবাজারের ব্যবসায়ী ইমন আহমেদ স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে টিএসসিতে এসেছিলেন। তাঁর স্ত্রী আর্জেন্টিনার অন্ধ ভক্ত হওয়ায় মন খারাপের কথা জানিয়ে ইমন আহমেদ বলেন, ‘ও আর্জেন্টিনার কড়া সমর্থক। দল হেরে যাওয়ার পর ওর মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তাই ভাবলাম ঘরে মুখ ভার করে বসে থাকার চেয়ে টিএসসির থেকে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে আসি, মনটা অন্তত ভালো হবে।’
তাঁর স্ত্রী মৃদু হেসে বলেন, ‘আজকের ম্যাচে আর্জেন্টিনা প্রথম থেকেই তেমন ছন্দে ছিল না। তবে পরেরবার আমরা আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরব।’
গাজীপুরের কালিয়াকৈরের বাসিন্দা ও মিডিয়াকর্মী প্রান্ত জোসেফ গোমেজ আক্ষেপ করে বলেন, ‘ভীষণ আশা নিয়ে টিএসসিতে এসেছিলাম ম্যাচটা দেখতে। পুরো টুর্নামেন্টে ছেলেরা দারুণ খেলে আজ ফাইনালে এসেছিল। কিন্তু আজকে ভাগ্য আমাদের সহায় ছিল না।’
টিএসসিতে স্পেনের নান্দনিক ফুটবলের অনুরাগী সমর্থকদেরও দেখা মিলেছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী তানভীর হাসান ও তাঁর বাবা দুজনেই স্পেনের জার্সি পরে খেলা দেখছিলেন। তানভীর হাসতে হাসতে বলেন, ‘আমাদের পুরো পরিবার, এমনকি পোষা বিড়ালটিও আজকে স্পেনের জার্সি পরে খেলা দেখেছে!’
স্মৃতিচারণ করে তানভীরের বাবা বলেন, ‘২০১০ সালের বিশ্বকাপের সময় ও যখন মাত্র পাঁচ-ছয় বছরের শিশু, তখন রাত তিনটায় ওকে কোলে নিয়ে টিএসসিতে এসেছিলাম স্পেনের ফাইনাল দেখতে। সেবার স্পেন জিতেছিল। ও পরের দিন স্পেনের জার্সি পরেই স্কুলে গিয়েছিল। সেই থেকেই স্পেনের প্রতি ওর এই ভালোবাসা।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি কিন্তু একই সঙ্গে লিওনেল মেসিরও ভক্ত। ২০১১ সালে আর্জেন্টিনা দল যখন ঢাকায় বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে খেলতে এল, তখন এই ছেলেকে নিয়ে গ্যালারিতে বসে মেসির খেলা দেখেছিলাম। সেই স্মৃতি আজও ভুলিনি।’
বেসরকারি চাকরিজীবী আবুল খায়ের কোমেল ২০০৮-১০ সাল থেকে স্পেনের সমর্থক। ম্যাচ বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, ‘আজকের ম্যাচটা একপেশে হতে পারত, কিন্তু আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমি মার্তিনেজ যেভাবে অতিমানবীয় ১২টি সেভ করলেন, তা খেলাটিকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্পেনের নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল ফুটবল ও পাসিং গেমের কাছে আর্জেন্টিনাকে হার মানতেই হলো। যেভাবে স্পেন ফ্রান্স কিংবা ফ্রান্সের ওলিসেকে প্যাক করে রেখেছিল, আজও তাদের ডিফেন্স সে কাজই করেছে।’
ব্রাজিলের কট্টর সমর্থক হয়েও স্পেনের পক্ষে গলা ফাটিয়েছেন বেইলি রোডের তরুণ কণ্ঠশিল্পী রিজভী লোটাস। রসিকতা করে তিনি বলেন, ‘আজকে মাঠে স্পেন যেভাবে খেলছিল, মনে হচ্ছিল যেন ব্রাজিলই স্পেনের জার্সি গায়ে মাঠে নেমেছে! ব্রাজিল তো এবার আগেই বিদায় নিয়েছে, তাই আজ মন খুলে স্পেনের সুন্দর ফুটবল উপভোগ করেছি।’
একই কথা বলেন ওয়ারীর ব্যবসায়ী ইমন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমরা ব্রাজিলের সমর্থক হলেও ফুটবলকে ভালোবাসি। লামিনে ইয়ামালের মতো তরুণদের খেলা দেখতে ভালো লাগে, তাই আজ স্পেনের জয়ে দারুণ খুশি।’
ভোরের আলো ফুটতেই কমতে থাকে ভুভুজেলার আওয়াজ। বিমর্ষবদনে টিএসসি ছাড়ছিলেন সাদা-আকাশি জার্সির সমর্থকেরা। তাঁদের সান্ত্বনার ভাষা ছিল ঠিক তেমনই—‘পরেরবার আমরা আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরব।’