একসময় জীবিকার তাগিদে দিনমজুরের কাজ করতেন হাজীমুল ইসলাম (৫৫)। তবে মনে ছিল নতুন কিছু করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। অন্যের বাড়িতে বাঁশের মাচা তৈরির কাজ করার সময় তাঁর মাথায় আসে বাঁশ দিয়ে ভিন্নধর্মী কিছু তৈরির চিন্তা। কৌতূহলবশত ইউটিউবে অনুসন্ধান করে তিনি বাঁশের তৈরি নান্দনিক হস্তশিল্পের ভিডিও দেখতে পান। টেবিল ল্যাম্প, ঝাড়বাতি, মুঠোফোনের স্ট্যান্ড ও ফুলদানির মতো পণ্যের ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০১৮ সালের শুরুর দিকে নিজের বাড়িতেই ছোট পরিসরে কাজ শুরু করেন তিনি।
নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ি ইউনিয়নের উত্তর সোনাখুলি গ্রামের বাসিন্দা হাজীমুলের এই পথচলা সহজ ছিল না। শুরুতে তৈরি করা ট্রে ও টেবিল ল্যাম্প বিক্রি করতে না পেরে চরম আর্থিক সংকটে পড়েন তিনি। সেই কঠিন সময়ে দিনাজপুরের বন্ধু মোহাম্মদ মিশু তাঁকে সাহস দেন এবং কান্তজিউ মেলা, বদরগঞ্জের মেলা ও ঢাকার শিল্প মেলায় নিয়ে যান। সেখানে পণ্যের ব্যাপক চাহিদা দেখে তিনি আত্মবিশ্বাস ফিরে পান। বড় ছেলে আরিফুল ইসলামের সহায়তায় একটি ফেসবুক পেজ খোলার পর ঢাকার বিভিন্ন শোরুম থেকে অর্ডার আসতে শুরু করে। ব্যবসার প্রসারে ২০২০ সালে ভাড়া নেওয়া জমিতে একটি ছোট কারখানা স্থাপন করেন তিনি এবং দিনমজুরের কাজ ছেড়ে পুরোপুরি উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। বর্তমানে তাঁর কারখানায় প্রায় ১২০ ধরনের পণ্য তৈরি হয়, যা স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ঢাকায়ও পৌঁছে যাচ্ছে।
হাজীমুলের পণ্যের একজন নিয়মিত ক্রেতা ঢাকার ব্যবসায়ী মরিয়ম আকতার নিশাত। তিনি বলেন, “বাঁশের তৈরি এসব পণ্য ব্যতিক্রমী। আমি এসব সংগ্রহ করি। ঢাকায় অনেক প্রতিষ্ঠানে এসব পণ্যের চাহিদা আছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমরা এ হস্তশিল্প সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পারব।”
গত বুধবার উত্তর সোনাখুলি গ্রামে হাজীমুলের কারখানায় দেখা যায় ব্যাপক ব্যস্ততা। কেউ বাঁশ কাটছেন, কেউ ঘষছেন, আবার কেউ পণ্যে বিশেষ রাসায়নিক প্রলেপ দিচ্ছেন যাতে ঘুণ না ধরে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা হাজীমুল জানান, তাঁর স্ত্রীও এই কাজে সহযোগিতা করেন। কারখানার পুঁজি হিসেবে দুই লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন তিনি, যার মধ্যে এক লাখ টাকা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা (বিসিক) নীলফামারী জেলা কার্যালয় থেকে বিনা সুদে ঋণ হিসেবে পেয়েছেন এবং বাকি এক লাখ টাকা ছিল তাঁর নিজস্ব সঞ্চয়। তিনি মনে করেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সৈয়দপুরে হস্তশিল্পের ব্যাপক বিকাশ সম্ভব।
বর্তমানে এই কারখানায় ২০ জন নারী-পুরুষ কর্মরত। ১০ জন শ্রমিক দৈনিক ৪০০ টাকা এবং বাকি ১০ জন ৩০০ টাকা মজুরি পান। পাঁচ বছর ধরে এখানে কর্মরত মিনতি দাস (৫০) বলেন, “আমরা বাঁশের ট্রে, ঝাড়বাতি, দেয়ালঘড়ি, সোফা, খাট, টেবিল—অনেক ধরনের পণ্য বানাই। আমি বেশি ট্রে তৈরি করি। দিনে অন্তত ২০টি ট্রে বানাতে পারি। ১০ ঘণ্টা কাজ করে দৈনিক ৪০০ টাকা মজুরি পাই।”
প্রতিবেশী মমিনুল ইসলাম (৪৫) স্মৃতিচারণ করে বলেন, “শুরুতে আমরা তার (হাজীমুল) কাজ দেখে হাসাহাসি করতাম। মনে হতো পাগলামি করছে। এখন বুঝেছি, আমরা ভুল ছিলাম। এখন আমরাও এই কারখানায় কাজ শিখতে আসি। ভবিষ্যতে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাই।”
হাজীমুলের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি মাসে তাঁর বিক্রি প্রায় তিন লাখ টাকা এবং সব খরচ বাদ দিয়ে নিট আয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। সবচেয়ে কম দামি পণ্য হিসেবে ৩০ থেকে ৫০ টাকায় মুঠোফোনের স্ট্যান্ড ও সাবানদানি বিক্রি হয়, আর সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে ৩০০ থেকে ৩ হাজার টাকার টেবিল ল্যাম্পের। পণ্যের প্রধান উপকরণ হুতুম বাঁশ পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে আনা হয়, যার প্রতিটির দাম ৭০০ টাকা। উৎপাদন ব্যয় কমাতে তিনি নিজের জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে হুতুম বাঁশ আবাদ শুরু করেছেন।
এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বিসিকের নীলফামারী জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. নুরুল হক বলেন, “তাঁর এ যাত্রায় আমরা পাশে আছি। সারা দেশে তাঁর কাজ আমরা তুলে ধরতে চাই।”
বাবার এই সাফল্যে গর্বিত ছেলে আরিফুল ইসলাম, যিনি বর্তমানে সৈয়দপুরের কামারপুকুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, “বাবাকে নিয়ে অনেক গর্ব আমার। আমি মনে করি, তিনি নিজ উদ্যোগে একটা ব্র্যান্ড তৈরি করেছেন। সময় পেলে আমিও বাবার কারখানায় শ্রম দিই। খুব ভালো লাগে। এভাবেই যদি প্রতিষ্ঠানটি চলতে থাকে তাহলে একদিন আমরা অনেক দূর এগিয়ে যাব। লেখাপড়া শেষ করে আমি যোগ দেব বাবার কারখানায়।”