মাঝমাঠে আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ আর স্পেনের রদ্রির লড়াই কি এই ফাইনালের একমাত্র আকর্ষণ? একদমই নয়। পজিশন অনুযায়ী একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ লড়াই অপেক্ষা করছে এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে। আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যকার এই ফাইনাল আসলে বেশ কিছু ব্যক্তিগত লড়াইয়ের সমষ্টি।
প্রথমত, গোলপোস্টের নিচে মুখোমুখি হবেন উনাই সিমন ও এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। দুই গোলরক্ষকের চরিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। সিমন নিঃশব্দ ও প্রায় অদৃশ্য থাকেন, যতক্ষণ না দলের প্রয়োজন হয়। এই বিশ্বকাপে রেকর্ড ছয়টি ক্লিন শিট রাখা সিমন সাত ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছেন। অন্যদিকে, নাটকীয়তার पर्याय হিসেবে পরিচিত মার্তিনেজ বা 'দিবু'। কাতারের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে কোলো মুয়ানিকে রুখে দেওয়ার সেই দৃশ্য ফুটবলবিশ্ব এখনো মনে রেখেছে। এবারও নয়টি সেভ করলেও তাঁর ধার কিছুটা কমেছে বলে মনে হচ্ছে। জার্মান কিংবদন্তি অলিভার কান বলেছেন, "সিমন নির্ভরযোগ্য, শান্ত এক ফুটবলার।" মার্তিনেজ সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন— "আগ্রাসী, দুর্দান্ত প্রতিফলনের গোলরক্ষক।"
রক্ষণে লড়াই হবে ১৯ বছর বয়সী পাউ কুবারসি ও ২৮ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর মধ্যে। এই বিশ্বকাপে স্পেনের রক্ষণে পাথরের দেয়ালের মতো দাঁড়িয়েছেন কুবারসি। টুর্নামেন্টের প্রতিটি মিনিট মাঠে থেকে তিনি মাত্র একটি গোল হজম করেছেন। বিপরীতে আর্জেন্টিনার পোড় খাওয়া সৈনিক রোমেরো সংঘর্ষে নির্মম, যা প্রতিপক্ষের জন্য উদ্বেগের কারণ। মিসরের বিপক্ষে গোলও করেছেন তিনি। কুবারসির পরিণত পাসিং ও নিখুঁত পজিশনিংয়ের বিপরীতে রোমেরোর আদিম বুনো শক্তি—এই দুই ভিন্ন ঘরানার ডিফেন্ডারের লড়াই ফাইনালের ভাগ্য গড়ে দিতে পারে।
ফ্ল্যাঙ্কে লড়াই হবে মার্ক কুকুরেয়া ও নাহুয়েল মলিনার মধ্যে। স্পেনের বাঁ প্রান্তে কুকুরেয়া পুরো টুর্নামেন্টের প্রতিটি মিনিট খেলেছেন। রক্ষণ ছাপিয়ে পাল্টা আক্রমণে তাঁর গতি ও ক্রস প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি। আর্জেন্টিনার ডান প্রান্তে গঞ্জালো মন্তিয়েল বা নাহুয়েল মলিনা—যিনিই খেলুন, তাঁর প্রধান লক্ষ্য হবে কুকুরেয়ার গতি নিয়ন্ত্রণ করা। অন্যদিকে, মলিনার ওভারল্যাপিং দৌড় প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করলেও মাঝেমধ্যে ভুল করে গোল খাওয়ানোর প্রবণতা রয়েছে তাঁর, যার সুযোগ নিতে প্রস্তুত থাকবেন কুকুরেয়া।
আক্রমণের অগ্রভাগে মুখোমুখি হতে পারেন মিকেল ওইয়ারসাবাল ও হুলিয়ান আলভারেজ। স্পেনের আক্রমণের মূল ভরসা ওইয়ারসাবাল, যার ঝুলিতে ৫ গোল ও ১ অ্যাসিস্ট রয়েছে। বক্সের ভেতরে তাঁর নড়াচড়া প্রতিপক্ষ রক্ষণকে বরাবরই ভোগিয়েছে। অন্যদিকে, লাওতারো মার্তিনেজের বদলে কোচ স্কালোনির প্রথম পছন্দ এখন হুলিয়ান আলভারেজ। প্রতিপক্ষের বিল্ড-আপ ভাঙতে তাঁর প্রেসিং অত্যন্ত কার্যকর, ফলে তিনি একইসাথে ফিনিশার ও ফার্স্ট ডিফেন্ডার। এই দুজনের দ্বৈরথই ঠিক করে দেবে বলের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে।
সবশেষে, ট্রফির গন্তব্য নির্ধারণের ভার হয়তো বর্তাবে লিওনেল মেসি ও লামিনে ইয়ামালের কাঁধেই। ৩৯ বছর বয়সে মেসি খেলছেন তাঁর শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ। ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট নিয়ে তিনি গোল্ডেন বলের অন্যতম দাবিদার। বিপরীতে ১৯ বছরের ইয়ামাল ভবিষ্যতের প্রতিনিধি। এই বিশ্বকাপে মাত্র একটি গোল করলেও ডান প্রান্ত থেকে তাঁর গতি ও ড্রিবল স্পেনের সবচেয়ে বিস্ফোরক অস্ত্র। একদিকে গোধূলির শেষ আলো, অন্যদিকে ভোরের প্রথম সূর্য—ফুটবলের রাজদণ্ড হাতবদলের এক মহাকাব্যিক লড়াই হতে যাচ্ছে এটি।