ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে আবেগপ্রবণ হয়ে চোখের জল আটকাতে পারলেন না লিওনেল স্কালোনি। আর্জেন্টিনা কোচ আভাস দিয়েছেন, এই ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষে দলের দায়িত্বে থাকবেন কি না, সেটি নিয়েও তিনি চিন্তা করবেন। তবে এই বিদায় সংকেতের পাশাপাশি স্কালোনির সামনে এখন কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নের পাহাড়।
গতকাল ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হতাশাজনক পারফরম্যান্স স্কালোনির কৌশল নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। পুরো বিশ্বকাপজুড়ে আর্জেন্টিনার ফুটবল খুব একটা আনন্দদায়ক ছিল না। যদিও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পে তারা দেখিয়েছিল প্রয়োজনে ম্যাচ জেতার ক্ষমতা, কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে সেই লড়াইয়ের চিহ্ন ছিল না। ১০ জনের দল হয়ে যাওয়ায় ফিরে আসা কঠিন ছিল বলে যুক্তি দিতে পারেন স্কালোনি, তবে গোল খাওয়ার পর শেষ মুহূর্তে যেটুকু চেষ্টা দেখা গেছে, তা আগে কেন করা হয়নি?
পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে ৯০ মিনিটে প্রতিপক্ষের অর্ধে একটি শটও নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা। এই চরম ব্যর্থতার ব্যাখ্যা স্কালোনি কীভাবে দেবেন, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
ফাইনালের একাদশ নির্বাচন নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। আগের ম্যাচের একাদশ থেকে লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও জুলিয়ানো সিমিওনেকে সরিয়ে নিকো গঞ্জালেজ ও রদ্রিগো দি পলকে নামানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধে গঞ্জালেজকে তুলে নিলেও একাদশে তাঁকে রেখে স্কালোনি ঠিক কী করতে চেয়েছিলেন, তা বোঝা কঠিন ছিল। অন্যদিকে, আগের বিশ্বকাপে ভরসার নাম রদ্রিগো দি পল এবার নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন, যার ফলে ৭০ মিনিটে তাঁকে তুলে নিতে হয়।
কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালে গোল পাওয়া লাওতারো মার্তিনেজকে কেন মাঠেই নামানো হলো না, সেটিও বড় প্রশ্ন। লাওতারো তাঁর হেডিং সামর্থ্য ও প্রেসিং দক্ষতা প্রমাণ করলেও স্কালোনি তা কাজে লাগাননি। এছাড়া নিকো পাজ এবং ভ্যালেন্টিন বার্কোর মতো ইন-ফর্ম তরুণ প্রতিভাদের যথাযথ সুযোগ না দেওয়ার দায়ও স্কালোনির ওপর বর্তাচ্ছে। সিরি আ-তে দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়ে ১২ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট করা নিকো পাজ পুরো বিশ্বকাপে মাত্র ৭২ মিনিট খেলেছেন, যার ৬১ মিনিটই ছিল জর্ডানের বিপক্ষে গুরুত্বহীন ম্যাচে। ফ্রেঞ্চ লিগে আলো ছড়ানো বহুমুখী খেলোয়াড় ভ্যালেন্টিন বার্কোও তেমন সুযোগ পাননি।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে হারের পর এনজো ফার্নান্দেজ ও হুলিয়ান আলভারেজের মতো তরুণদের সুযোগ দিয়ে ঝুঁকি নিয়েছিলেন স্কালোনি। কিন্তু চার বছর পর তিনি সেই পুরনো দলের ওপরই আস্থা রাখতে চেয়েছেন। অ্যাস্টন ভিলার ইউরোপা লিগজয়ী এমিলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার মতো ইন-ফর্ম খেলোয়াড়কে স্কোয়াডে রাখেননি তিনি। মধ্যমাঠ যখন খাবি খাচ্ছিল, তখন লে চেলসোর মতো অভিজ্ঞ কাউকে নেওয়া যেত, কিন্তু স্কালোনি তাঁর চেনা ছক থেকে সরেননি। নকআউট পর্বে নিষ্প্রভ মধ্যমাঠ বদলানোর কথা কেন ভাবলেন না তিনি?
আর্জেন্টিনার কৌশলগত ব্যর্থতাও প্রকট ছিল। বল দখলে রাখতে না পারলে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক বা ট্রানজিশন ফুটবলে যেতে হয়, কিন্তু আর্জেন্টিনা কোনোটিই করতে পারেনি। স্পেনের অর্ধে পুরো দল মাত্র ৩৭টি বলে টাচ করেছে, যা ফ্রান্সের বিপক্ষে শারীরিক ফুটবল খেলা প্যারাগুয়ের চেয়েও কম।
অনেকের মতে, অভিজ্ঞতা এবং মেসির জাদুর জোরেই আর্জেন্টিনা ফাইনালে পৌঁছেছিল। চার বছর আগে ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে যে দুর্দান্ত ফুটবল দেখা গিয়েছিল, তার ছিটেফোঁটাও ছিল না এবারের খেলায়। আনহেল দি মারিয়ার অনুপস্থিতি কি আর্জেন্টিনার খেলায় এত বড় প্রভাব ফেলল? এই সব প্রশ্নের উত্তরই এখন দিতে হবে লিওনেল স্কালোনিকে।