যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত বৈশ্বিক মনোযোগকে যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ঝুঁকির দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষ এখন ভয়, অনিশ্চয়তা এবং সহিংসতার মুখে। সেখানে জনপদগুলো বিপর্যয়, বাস্তুচ্যুতি ও যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে মানুষের জীবন বাঁচানোই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার। তবে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, একটি মৌলিক শিক্ষা সামনে চলে এসেছে।

এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি কাঠামোগত দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। যতক্ষণ দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল থাকবে, ততক্ষণ যেকোনো আঞ্চলিক অস্থিরতা পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ফলে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য বিকেন্দ্রীকৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাওয়া এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ফলে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তেল ও গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে পারিবারিক বাজেটে চাপ সৃষ্টি করেছে। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দাম দরিদ্র মানুষের ওপর বাড়তি বোঝা চাপিয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় এর প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাত, বিদ্যুৎ বিল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। একেই বলা হয় ‘ফসিলফ্লেশন’ বা জীবাশ্ম মূল্যস্ফীতি, যা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণেই তৈরি হয়।

একটি অর্থনীতি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর যত বেশি নির্ভরশীল হবে, বহিঃশক্তির অস্থিরতায় সেটি তত বেশি ঝুঁকিতে পড়বে। বিপরীতে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি এই ঝুঁকি কমিয়ে দেশগুলোকে আরও স্বাবলম্বী ও স্বাধীন করে তোলে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) সতর্ক করে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করছে। উচ্চ জ্বালানি মূল্যের প্রভাব পড়ছে পরিবহন, বিদ্যুৎ বিল এবং ভোক্তামূল্যের ওপর। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, অন্তত ৪৬টি দেশের সরকার তাদের জনগণকে জ্বালানির বাড়তি দাম থেকে বাঁচাতে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে।

"ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের শিক্ষা হলো, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে, তা খবরের শিরোনাম থেকে হারিয়ে যাওয়ার পরও দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়।"

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করেছে যে, তেল, গ্যাস ও সারের উচ্চমূল্য খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ডব্লিউএফপির হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখে পড়তে পারে।

দেখা গেছে, এই অস্থিরতা ও দামের ওঠানামা জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর জন্য বিপুল মুনাফা বয়ে আনে। রিস্টাড এনার্জির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুদ্ধের প্রথম মাসেই বিশ্বের ১০০টি বড় তেল ও গ্যাস কোম্পানি প্রতি ঘণ্টায় তিন কোটি ডলারের বেশি বাড়তি মুনাফা করেছে। সংকট তৈরি হলে এই শিল্প খাতের প্রতিক্রিয়া হয় চেনা; তারা আরও ড্রিলিং, পাইপলাইন, দ্রুত অনুমোদন, সরকারি ভর্তুকি এবং পরিবেশগত সুরক্ষা কমানোর দাবি তোলে।

মূলত সংকটকে মুনাফায় রূপান্তর করা এবং সেই সংকটকেই ব্যবহার করে পুনরায় নির্ভরশীলতা বাড়ানোর যুক্তি দেওয়া এই ব্যবসার কৌশল। এর ফলে সমাজ বারবার অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়ে এবং এমন শক্তিকে ভর্তুকি দিতে বাধ্য হয় যা তাদের অস্থিতিশীল করছে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হলেও মূল ঝুঁকি থেকে যাবে, কারণ পরবর্তী সংকট অন্য কোনো যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক সংঘাত বা চরম আবহাওয়ার কারণে আসতে পারে।

তাই আলোচনা শুধু যুদ্ধবিরতি বা স্বল্পমেয়াদি দামের ওঠানামার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেওয়া উচিত। নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান নয়, বরং এটি একটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সমাধানও। প্রতিটি ছাদে সৌরবিদ্যুৎ-ব্যবস্থা, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক বাস এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী ভবন ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে পারিবারিক খরচের সম্পর্ককে দুর্বল করে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেউ অবরুদ্ধ করতে পারে না বা এর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যায় না।

যেসব দেশ দ্রুত বিকেন্দ্রীকৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থায় রূপান্তর করবে, তারা ভবিষ্যতে জীবাশ্ম জ্বালানির ধাক্কা থেকে সুরক্ষিত থাকবে। আর যারা নির্ভরশীল থাকবে, তারা বারবার এই জীবাশ্ম মূল্যস্ফীতির চক্রের মুখোমুখি হবে।

— মাদস ফ্লারুপ ক্রিস্টেনসেন, গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক এবং পরিবেশ আন্দোলনকর্মী।