২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে প্রথম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই দিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ মোট ছয়জন শহীদ হন। এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর থেকেই আন্দোলন সারা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

সরকারি গেজেট অনুযায়ী, এই গণঅভ্যুত্থানে মোট ৮৪৩ জন শহীদ হয়েছেন এবং আরও বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। ছাত্র-জনতার এই তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।

আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল ১ জুলাই, যখন সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীরা।

"কোটা সংস্কারের দাবির এ আন্দোলনে প্রথম প্রাণহানির ঘটনা ঘটে ১৬ জুলাই। সেদিন চট্টগ্রাম, ঢাকা ও রংপুরে মোট ছয়জন শহীদ হন।"

আন্দোলন যখন কর্মসূচি কেন্দ্রিক এগিয়ে চলছিল, তখন ১৫ জুলাই আন্দোলনকারীরা বড় ধরনের হামলার শিকার হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হকিস্টিক, রড ও জিআই পাইপসহ দেশি অস্ত্র দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ চালান। এই হামলার পর আন্দোলন আরও বেগবান হয়, যদিও রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও তৎকালীন সরকারদলীয় সংগঠনের দমন-পীড়ন তীব্রতর হয়।

১৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। "ভিডিওতে দেখা যায়, আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন আর পুলিশ তাঁর বুকে একের পর এক গুলি করছে। এ হত্যাকাণ্ড আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং সারা দেশে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।"

আবু সাঈদের শাহাদাতের পর ওই দিন সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। "আবু সাঈদের মৃত্যুর পর ওই দিন সন্ধ্যায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। এ ছাড়া ক্যাম্পাসে ৬টি প্রাইভেট কার ও ১৩টি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। এ পরিস্থিতিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় ওই দিন।"

আবু সাঈদের পাশাপাশি ওই দিন চট্টগ্রামে ছাত্রদলের নেতা ওয়াসিম আকরাম, আসবাবশ্রমিক মো. ফারুক ও শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ এবং ঢাকায় নিউমার্কেট এলাকার হকার মো. শাহজাহান ও শিক্ষার্থী মো. সবুজ আলী শহীদ হন।

হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ মুছে ফেলতে ১৬ জুলাই দুপুরে সরকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয় এবং রাতে ফেসবুকে ধীরগতি লক্ষ্য করা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়। ওই দিন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।

মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৬ জুলাই শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, ঢাকা মেডিকেল, কার্জন হল ও চানখাঁরপুল এলাকায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হামলায় শিক্ষার্থীরা আহত হন। ঢাকার বাইরে আরও ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা হামলা চালায়।

বেলা দুইটার পর থেকে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সরকার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো বন্ধের পাশাপাশি এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। তবে এসব পদক্ষেপ আন্দোলন দমাতে পারেনি, বরং তা আরও বিস্তৃত হয়।