মোহাম্মদ পারভেজ ঘর ছাড়ার কয়েক মিনিট পরই তা চোখের সামনে ভেসে যেতে দেখেন। পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে তাঁর বসতঘরটি উপড়ে পাশের বেইলি সেতুর ওপর আছড়ে পড়ে। মুহূর্তেই তলিয়ে যায় আসবাবপত্র, খাদ্যশস্যসহ সারা জীবনের সঞ্চিত সহায়-সম্বল। বান্দরবানের শীল খালের উত্তর পাড়ের বাসিন্দা পারভেজ ও তাঁর প্রতিবেশী জেবেল মুল্লুক অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। স্রোত ঢুকতে দেখে তাঁরা দ্রুত ঘর ত্যাগ করেন, তবে ফিরে এসে দেখেন ঘরের জায়গায় কেবল ধ্বংসস্তূপ।
পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে এমন ক্ষতচিহ্ন দৃশ্যমান হচ্ছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকায়। কোথাও ঘরবাড়ি ধসেছে, কোথাও নষ্ট হয়েছে ফসল। পুকুর ও মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। পাহাড়ি ঢল ও বন্যার স্রোতে ভেঙেছে সড়ক, সেতু ও কালভার্ট। অনেক গ্রামীণ সড়ক থেকে পানি সরে গেলেও সেগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সম্প্রতি দেশের দক্ষিণ-পূর্ব এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচ জেলা ছাড়াও সিলেট অঞ্চলের হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার বন্যার কবলে পড়েছে। বন্যাকবলিত অঞ্চলগুলো থেকে পানি নামার সাথে সাথে ব্যাপক ক্ষতির চিত্র সামনে আসছে, যদিও অনেক এলাকায় পানি পুরোপুরি নামেনি বলে ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যা ও ঢলের পানিতে জেলার ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৮৯০ কোটি টাকা হতে পারে।
যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে বান্দরবানে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রায় ১৫১ কিলোমিটার সড়ক ও চারটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৪৭টি স্থানে পাহাড়ধস ও ২১ স্থানে গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিছু পথ সচল হলেও অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত অংশের স্থায়ী সংস্কার প্রয়োজন। সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, "ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামতে প্রায় ৭ কোটি টাকা প্রয়োজন। আর দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পুনর্নির্মাণে লাগতে পারে প্রায় ৪০ কোটি টাকা।"
রাঙামাটিতেও অন্তত ১০২ কিলোমিটার সড়কে ক্ষতি হয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে সড়ক খাতে প্রায় ৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। খাগড়াছড়ি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের হিসাবে, জেলার ৯ উপজেলায় ২৫টি ছোট-বড় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে দুটি সড়কে অধিক ক্ষতি হওয়ায় জরুরি সংস্কার কাজ চলছে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লোহাগাড়ায় অন্তত ৩০ কিলোমিটার সড়ক ও ১৭টি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; কোথাও সড়কের মাটি সরে গেছে, আবার কোথাও ঢালাই উঠে বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। বাঁশখালীতে উপজেলা প্রকৌশল কার্যালয়ের হিসাবে, প্রায় ১১০ কিলোমিটার সড়ক, ২৫টি কালভার্ট ও দুটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু অবকাঠামো খাতেই সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি টাকা।
বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত। পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষকেরা খেতে ফিরে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি দেখতে পাচ্ছেন। স্থানীয় সরকারি দপ্তরের হিসাবে, ফসলের ক্ষতি কয়েক শ কোটি টাকা হবে। কক্সবাজার জেলা কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ১০ হাজার ৪০১ একর জমির ফসল ডুবে অন্তত ৪৩ হাজার ২১০ কৃষকের কয়েক শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া ভেসেছে ২ হাজার ৪৪০ হেক্টর পুকুর ও চিংড়িঘেরের মাছ।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, ১৬ হাজার ৫০০ কৃষকের প্রায় ৬০ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে। ১ হাজার ৬২০টি পুকুর ও মাছের খামার ডুবে প্রায় ৮ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাবে, খামার, পশুপাখি ও খাদ্যের ক্ষতি মিলিয়ে এ খাতে লোকসান প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা।
রাঙামাটিতে কৃষিখাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে, ১০ উপজেলায় ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাগড়াছড়িতে প্রায় ১ হাজার ৩১ হেক্টর এবং বান্দরবানে প্রায় ৫ হাজার ২৬০ একর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। খাগড়াছড়ির মহালছড়ির চাষি অজয় বড়ুয়া বলেন, “বন্যায় শুধু ঘরবাড়িই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, আমার পুকুরের প্রায় পাঁচ লাখ টাকার মাছও ভেসে গেছে। নতুন করে কীভাবে শুরু করব, বুঝতে পারছি না।”
বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল সচিবালয়ে এক আন্তমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন অংশ নেন।
সভা শেষে আসাদুল হাবিব দুলু সাংবাদিকদের জানান, দেশের ৫৯টি উপজেলার ৩৬৮টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা চলমান বন্যার কবলে পড়েছে। বন্যায় প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ জনে। ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাসহ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "ইতিমধ্যে ত্রাণের জন্য ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা তাৎক্ষণিক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চাল ও শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে।"
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গতকাল বিকেল চারটার হিসাব অনুযায়ী, বন্যাকবলিত এই সাত জেলার ৩২৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো ১০ হাজার ৮৫৪ জন অবস্থান করছেন।






