কক্সবাজার জেলায় ৯ দিনের বন্যায় ৭ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরবাড়ি, সড়ক, কৃষি, মৎস্য, বেড়িবাঁধসহ সাতটি খাতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অন্তত ৮৯০ কোটি টাকার। জেলা প্রশাসনের করা প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
কক্সবাজারে ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত ৯ দিন মুষলধারে বৃষ্টি হয়। এর সঙ্গে পাহাড়ি ঢল যুক্ত হয়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় বন্যা দেখা দেয়। এ ছাড়া বেশ কটি পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটে। ১২ জুলাইয়ের পর বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও এখনো অনেক মানুষ পানিবন্দী।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মানুষের চলাচলের সমস্যা হচ্ছে। দুর্গত এলাকার অনেক মানুষ সুপেয় পানিসহ খাদ্যের সংকটে রয়েছে। তবে ত্রাণসহায়তা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
.জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যার প্রভাবে জেলার ১০টি উপজেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭০টি কমবেশি প্লাবিত হয়েছে। পাঁচটি পৌরসভা এলাকার মধ্যে চারটির বাসিন্দারা বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। বন্যায় জেলার অন্তত সাত লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা ও পাহাড়ধসে জেলায় মৃত্যু হয়েছে ৩১ জনের, যার মধ্যে ১৫ জন রোহিঙ্গা।
.গত বুধবার রাতে ঘরে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। এর মধ্যেই চার সন্তান নিয়ে পানির ওপরই বসবাস করছি। ঘরে রান্না করা যাচ্ছে না। পাঁচ দিন ধরে শুকনা খাবার খেয়ে বেঁচে আছি।রাশেদা বেগম, বাসিন্দা, পেকুয়া উপজেলা
জেলায় এ পর্যন্ত ত্রাণ হিসেবে ৭ হাজার ৭৯০ প্যাকেট শুকনা খাবার ও ২৯৮ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। আরও ৩ হাজার ৬৩৫ প্যাকেট শুকনা খাবার ও ২৩৩ মেট্রিক টন চালের বিতরণ চলছে। জেলায় ৫৭ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার, নগদ ২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, ৫৩০ মেট্রিক টন চাল, ৪ হাজার ৮৮৩ বান্ডিল ঢেউটিন এবং ৯৫ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটের চাহিদা রয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, জুলাই মাসে কক্সবাজারে স্বাভাবিক গড় বৃষ্টির পরিমাণ ৯২৪ মিলিমিটার, অথচ ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত ৯ দিনে জেলায় বৃষ্টি হয়েছে ৮২৩ মিলিমিটার। এই অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানির কারণে জেলায় এবার ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। বৃষ্টি বন্ধ থাকায় গত দুই দিনে বন্যার পানি নেমে গেছে। বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
.ভেসে উঠছে বন্যার ক্ষত
পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের বলিরপাড়া অরুণিমা আশ্রয়ণকেন্দ্রে থাকে ৪০টি ভূমিহীন পরিবার। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, আশ্রয়ণকেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তা এখনো পানির নিচে ডুবে আছে। কোমরসমান পানি মাড়িয়ে লোকজন চলাচল করছেন। আশ্রয়ণকেন্দ্রের উঠানে এখনো হাঁটুসমান পানি। বন্যায় অন্তত ১৫টি বসতঘরের মেঝে দেবে গেছে। দেয়াল ধসে পড়েছে সাতটি বসতঘরের।
.জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ৭০টি ইউনিয়ন ও ৪টি পৌরসভার ৪৯ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ৯৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে পেকুয়া উপজেলায়। মাতামুহুরী উপজেলার ৮৫ শতাংশ, চকরিয়ার ৮০ শতাংশ, কুতুবদিয়ার ৬৫ শতাংশ, মহেশখালীর ৫০ শতাংশ, রামুর ৩৫ শতাংশ প্লাবিত হয়।.
দুপুরে আশ্রয়ণকেন্দ্রের একটি ঘরে জমে থাকা পানি সরাচ্ছিলেন রাশেদা বেগম (৩৭)। তাঁর ঘরের ভেতরে তখনো হাঁটুপানি। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘গত বুধবার রাতে ঘরে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। এর মধ্যেই চার সন্তান নিয়ে পানির ওপরই বসবাস করছি। ঘরে রান্না করা যাচ্ছে না। পাঁচ দিন ধরে শুকনা খাবার খেয়ে বেঁচে আছি।’
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, গত সোম ও মঙ্গলবার সারা দিন বৃষ্টি হয়নি। এতে লোকালয় থেকে পানি দ্রুত সাগরে নেমে যাচ্ছে। তবে নিচু এলাকায় অবস্থিত কয়েকটি গ্রামে এখনো পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দী।
.পেকুয়ার পাশের উপজেলা চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের পহরচাঁদা কুতুববাজার থেকে গোবিন্দপুর সড়ক সোমবার দুপুরেও কোমরসমান পানিতে ডুবে ছিল। গতকাল দুপুরে সেখানে গিয়ে পানি দেখা যায়নি। তবে পানি নামলেও সড়কজুড়ে দেখা গেছে বড় বড় গর্ত। সড়কের পিচ উঠে এসব গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। যান চলাচল বন্ধ রয়েছে সড়কটিতে।
একইভাবে চকরিয়া উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, হারবাং, কৈয়ারবিল, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, চিরিংগা, বরইতলী ইউনিয়ন এবং চকরিয়া পৌরসভার শতাধিক সড়কের সাড়ে তিন শতাধিক কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়কগুলোতে যান চলাচল বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে মানুষকে।
নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় স্লুইসগেটের কারণে বন্যার পানি নামতে সময় লেগেছে। উপজেলার অন্তত ১১টি স্লুইসগেট আটকে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মাছ ধরার জাল বসিয়েছিলেন। মাতামুহুরী উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউএনও শাহীন দেলোয়ার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘স্লুইসগেট আমরা খুলে দিয়ে এলে কিছু কুচক্রী মহল সেটি বন্ধ করে দেয়। পরে প্রতিটি স্লুইসগেটে পাহারা বসিয়ে পানি চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। এখন দ্রুত পানি নামছে।’
.৮৯০ কোটি টাকার ক্ষতি
বন্যায় জেলায় বসতবাড়ি, মৎস্য, কৃষি, সড়ক, সেতু-কালভার্ট, বেড়িবাঁধের ভাঙনসহ সাতটি খাতে প্রাথমিক ক্ষতি নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৯০ কোটি টাকা। এর পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ৭০টি ইউনিয়ন ও ৪টি পৌরসভার ৪৯ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ৯৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে পেকুয়া উপজেলায়। মাতামুহুরী উপজেলার ৮৫ শতাংশ, চকরিয়ার ৮০ শতাংশ, কুতুবদিয়ার ৬৫ শতাংশ, মহেশখালীর ৫০ শতাংশ, রামুর ৩৫ শতাংশ প্লাবিত হয়। জেলার ১ হাজার ৬১৩টি বসতবাড়ি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, জেলার ৬১টি ইউনিয়নের ২ হাজার ৪৪০ হেক্টর আয়তনের ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর ও ৪৫৩টি চিংড়িঘেরের মাছ ভেসে গেছে। তাতে ৭৬৮ জন খামারির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।
.বন্যার পানিতে জেলায় ১০ হাজার ৪০১ একর জমির ফসল ডুবে অন্তত ৪৩ হাজার ২১০ কৃষকের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক বিমল কুমার প্রামাণিক। তিনি বলেন, আউশের ৬ হাজার ৪৭২ একর, বীজতলা ৯১৪ একর, শাকসবজি ২ হাজার ৩৫৯ একর এবং শতাধিক একর পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। তাঁদের বীজ, সার ও প্রণোদনা সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দিতে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঢলের পানিতে ৩৮০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অন্তত ৪৪টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে চকরিয়ার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পূর্ব পাড়ায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ ও একটি সেতুর অংশ ভেঙে গেছে। তিনি বলেন, মাতামুহুরী নদীর বিপৎসীমা ৫ দশমিক ৮০ মিটার। তবে ১১ জুলাই সকাল ছয়টায় এই নদীতে পানি ছিল ৬ দশমিক ৫৬ মিটার, যা বিপৎসীমার অনেক ওপরে।
জেলা প্রশাসন জানায়, বন্যা ও ঢলের পানিতে জেলার ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ২২০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায়। জেলার ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫৮০ জন আশ্রয় নিয়েছে। ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এসব মানুষ বাড়িতে ফিরতে পারছে না।






