বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নেওয়ায় পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ক্ষোভ প্রকাশ্যে এসেছে। ক্ষোভ রয়েছে প্রশ্নপত্র নিয়েও। পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নে ভুল এবং একাধিক বিষয়ে তুলনামূলক ‘কঠিন’ প্রশ্ন হওয়ার অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
সরকার পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নে ভুলের বিষয়টি স্বীকার করেছে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বলেছেন, পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল ছিল। ওই দুটি প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে। এ ছাড়া ভুল হওয়া পদার্থবিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্র মডারেশনের (পরিশোধন) দায়িত্বে থাকা চার শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
.ঢাকা-চট্টগ্রামসহ ১৩ জেলায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ .২ জুলাই শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে মোট পরীক্ষার্থী ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। সারা দেশের ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
অতিবৃষ্টিজনিত বন্যায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড এবং ওই অঞ্চলের মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা একাধিকবার স্থগিত করতে হয়েছে। সর্বশেষ ১৬ জুলাই পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
.শিক্ষার্থীবান্ধব যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়েছে: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন.চট্টগ্রাম অঞ্চল বাদে গত সোমবার দেশের বাকি এলাকায় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেদিন প্রবল বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকায় পরীক্ষার্থীরা যাতায়াতে দুর্ভোগে পড়েন। এর মধ্যে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে অনেক পরীক্ষার্থী হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে, আবার কেউ নৌকায় করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছান। গতকাল রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষার্থীদের একাংশ এ পরিস্থিতির প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে।
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন গতকাল জাতীয় সংসদে বলেন, বন্যার কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডের প্রতিটি জেলার পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই পরীক্ষা আবার নিতেই হবে। সে ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা নেওয়ার সময় পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা (সোমবার অনুষ্ঠিত) পরীক্ষা আবার নেওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে।
.শিক্ষামন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ, পরীক্ষা আবার নেওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে.পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, করোনা মহামারির পর থেকেই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে। এরপর ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন কারণে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমও অনেকাংশে ব্যাহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এবারের কোনো কোনো বিষয়ের প্রশ্নপত্র তুলনামূলক ‘কঠিন’ হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী বিপাকে পড়েছেন।
ঢাকার একটি পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক পরীক্ষার্থীর মা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রথম দিনের বাংলা বিষয়ের বহুনির্বাচনী (এমসিকিউ) অংশ তুলনামূলক কঠিন ছিল। নটর ডেম কলেজের এক ছাত্রের অভিভাবক বলেন, তাঁর সন্তানও জানিয়েছেন, এবার প্রশ্নপত্র তুলনামূলক কঠিন হয়েছে।
.প্রশ্নপত্র কঠিন হওয়ার অভিযোগের সঙ্গে একমত নন শিক্ষা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা। তাঁর ভাষ্য, প্রশ্ন সিলেবাসের বাইরে থেকে করা হয়নি। তিনি বলেন, এখন অনেক শিক্ষার্থী মূল পাঠ্যবইয়ের চেয়ে গাইড বইয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল। প্রশ্ন কিন্তু মূল বই ও সিলেবাস থেকেই করা হয়। তাই যাঁরা মূল বই কম পড়েন, তাঁদের কাছে প্রশ্ন তুলনামূলক কঠিন মনে হতে পারে।
এর মধ্যে গত সোমবার অনুষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞানের সৃজনশীল অংশের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল পাওয়া গেছে।
.গতকাল সন্ধ্যার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, পদার্থবিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্র মডারেশনের দায়িত্বে থাকা চার শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছেন সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াছমীন।
যাঁদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা হলেন শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, বৃন্দাবন সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক কাজী জুনায়েদ আল আমিন, এমসি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক মোছাদ্দেক হোসেন খান ও সিলেট সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের প্রভাষক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
.এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নপত্রে ভুল, চার শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ.এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে প্রতিটি বিষয়ে দুই অংশে (এমসিকিউ ও সৃজনশীল) প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়। প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডে প্রধান প্রশিক্ষকদের (মাস্টার ট্রেইনার) তালিকা রয়েছে। এই তালিকা থেকে পরীক্ষা শুরুর নির্ধারিত সময়ের আগে প্রতিটি বিষয়ের জন্য চারজন প্রশ্ন প্রণয়নকারী (শিক্ষক) নির্বাচন করা হয়। তাঁরা পৃথকভাবে চার সেট প্রশ্নপত্র তৈরি করে সিলগালা খামে বোর্ডে জমা দেন। পরে চারজন পরিশোধনকারী (মডারেটর) গোপনীয়তার সঙ্গে প্রশ্নপত্রগুলো যাচাই করেন। প্রয়োজনে প্রশ্ন সংশোধন, সংযোজন কিংবা সম্পূর্ণ নতুন প্রশ্নপত্রও তৈরি করার স্বাধীনতা তাঁদের রয়েছে।
যাচাই-বাছাই শেষে চার সেট প্রশ্নপত্র পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে জমা দেওয়া হয়। সেগুলো বোর্ডে গোপনীয়তার সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়।
.এইচএসসি পদার্থবিজ্ঞানের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নের বিষয়ে বোর্ডের যে ব্যাখ্যা.ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এবার অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হলেও ৯টি সাধারণ বোর্ডের জন্য মোট ৩৬ সেট প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। পরে বোর্ডের চেয়ারম্যানরা লটারির মাধ্যমে চার সেট নির্বাচন করেন। এর মধ্যে দুই সেট সরাসরি বিজি প্রেসে ছাপার জন্য পাঠানো হয় এবং বাকি দুই সেট সংরক্ষণ করা হয়, যাতে প্রয়োজন হলে ব্যবহার করা যায়।
ছাপার পর প্রশ্নপত্র স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়। জেলা সদরে সাধারণ ট্রেজারিতে এবং উপজেলায় সাধারণত থানায় প্রশ্নপত্র সংরক্ষণ করা হয়। প্রশ্নপত্রগুলো ঠিকঠাক গেল কি না, সেটি উপজেলা পর্যায়ে দেখভাল করা হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে।
.আবহাওয়ার পূর্বাভাসে পরীক্ষা, পদার্থবিজ্ঞানের ৬ ও ৭ প্রশ্নের পুরো নম্বর দেওয়া হবে: সংসদে শিক্ষামন্ত্রী.ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রতিটি পরীক্ষার দিন সকাল ৯টা ১০ মিনিটে আন্তশিক্ষা বোর্ডের সভাপতি লটারির মাধ্যমে কোন সেটে পরীক্ষা হবে, তা নির্ধারণ করে সব বোর্ডের চেয়ারম্যানদের জানান। এরপর জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়। তারপর সেই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হয়। ফলে আগে থেকে কোন প্রশ্নপত্র ব্যবহার হবে, তা দেখার সুযোগ কারও থাকে না। তাই প্রশ্নে কোনো ত্রুটি থাকলেও তা পরীক্ষা শুরুর আগে জানা সম্ভব হয় না।
শিক্ষা বোর্ডের একটি সূত্র জানিয়েছে, এবার পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের যে প্রশ্নপত্রে ভুল পাওয়া গেছে, সেটি সিলেট শিক্ষা বোর্ডে প্রস্তুত করা হয়েছিল।
বিভিন্ন সময়েই দেখা যায় পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুলত্রুটি হয়। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এমসিকিউ ও সৃজনশীল অংশের প্রশ্ন কেমন হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক সময় সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরির ক্ষেত্রে প্রশ্নকর্তারা প্রশ্নের লেভেল অনুযায়ী ঠিকভাবে তা করতে পারেন না। তাই প্রশ্ন প্রণয়ন ও পরিশোধনের (মডারেশন) পুরো প্রক্রিয়ায় আরও সতর্কতা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা বোর্ডগুলোর উচিত প্রশ্ন প্রণয়নকারী ও মডারেশনের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের দক্ষতার ব্যাপারে আরও পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।






