বিদায়বেলায় আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম মনে করিয়ে দিয়েছেন, একজন বিচারকের আনুগত্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ক্ষমতার প্রতি নয়; বরং তাঁর আনুগত্য হতে হবে সংবিধান, আইন এবং নিজস্ব বিবেকের প্রতি।

আজ মঙ্গলবার আপিল বিভাগের ১ নম্বর বিচারকক্ষে (প্রধান বিচারপতির এজলাস) বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীসহ আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতিরা উপস্থিত ছিলেন।

বিচার বিভাগের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বিচার বিভাগের সামনে আগামী দিনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে। মামলার জট কমাতে হবে। বিচারকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে। মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেড়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে বিচার বিভাগকে আরও দক্ষ, আরও আধুনিক এবং আরও সেবামুখী হতে হবে।’

আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে, বিচার বিভাগের প্রকৃত শক্তি বলপ্রয়োগে নয়, বরং এর শক্তি নিহিত বিচারবোধ, স্বাধীনতা এবং জনগণের আস্থায়। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সংবিধান শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার দলিল নয়। এটি আমাদের স্বাধীনতার চেতনা, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার। বিচার বিভাগের দায়িত্ব সেই অঙ্গীকারকে সমুন্নত রাখা।’

বিচারপতি আশফাকুল ইসলামের মতে, বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে তা দৃশ্যমান হওয়া এবং বিচার হয়েছে বলে বিশ্বাস করা জরুরি। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের আস্থা এবং সেই আস্থা রক্ষা করাই সর্বোচ্চ দায়িত্ব।

বিদায়ী ভাষণে তিনি বিচার বিভাগকে সবার প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘আমি একটি কথা বিশেষভাবে বলতে চাই। বিচার বিভাগ শুধু বিচারকদের নয়, শুধু আইনজীবীদেরও নয়, এই বিচার বিভাগ আমাদের সবার। বিচারক, আইনজীবী, কর্মকর্তা-কর্মচারী—আমরা সবাই এই প্রতিষ্ঠানের অংশ। আমরা যদি সবাই বিচার বিভাগকে নিজের প্রতিষ্ঠান বলে মনে করি, তাহলে এই প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। বিচার বিভাগের শক্তি একা কোনো বিচারকের শক্তি নয়, একা কোনো আইনজীবীরও নয়। এটি আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। তাই ভবিষ্যতেও বিচার বিভাগের কল্যাণে বার ও বেঞ্চ একসঙ্গে কাজ করবে—এই প্রত্যাশা করি।’

প্রথা অনুযায়ী দুপুর পৌনে ১২টার দিকে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রথমে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বিদায়ী বিচারপতির কর্মময় জীবন নিয়ে বক্তব্য রাখেন।

১৯৫৯ সালের ১৫ জুলাই জন্মগ্রহণ করা বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের আজ ৬৭ বছর পূর্ণ হচ্ছে, যার ফলে আজ তাঁর শেষ কর্মদিবস। এর মাধ্যমে দুই দশকেরও বেশি সময়ের বিচারিক জীবনের সমাপ্তি ঘটল তাঁর। তিনি ২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান এবং ২০০৫ সালের ২৭ আগস্ট স্থায়ী বিচারপতি হন। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন।