তথ্য অধিকার আইনের আওতায় মানুষের তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে গঠিত তথ্য কমিশন ২২ মাস ধরে কার্যত অচল। এ কারণে তথ্য না পাওয়ার অভিযোগের শুনানি বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কমিশনে ৭৮০টি অভিযোগ নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। কমিশন অচল থাকায় এসব অভিযোগের শুনানি যেমন হচ্ছে না, তেমনি তথ্য অধিকারবিষয়ক প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম, প্রকাশনাসহ অন্যান্য কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে। এর আগে এত দীর্ঘ সময় তথ্য কমিশন অচল থাকার নজির নেই।

তবে নতুন সরকার কমিশন পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে ৯ জুলাই প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনার নিয়োগে পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তথ্য কমিশন গঠিত হয়। কোনো ব্যক্তি তথ্য না পেলে কমিশনে অভিযোগ করতে পারেন। অভিযোগের শুনানি শেষে কমিশন জরিমানা আরোপ, ক্ষতিপূরণ প্রদান কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারে।

.

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার আবদুল মালেক ও তথ্য কমিশনার শহীদুল আলম ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করেন। আরেক তথ্য কমিশনার মাসুদা ভাট্টিকে গত বছরের জানুয়ারিতে অপসারণ করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার নতুন কমিশন গঠন করেনি। শেষ পর্যন্ত কমিশন গঠন না করেই গত ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হয়।

এখন বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পাঁচ মাস পর কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আপিল বিভাগের বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের নেতৃত্বাধীন নতুন বাছাই কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান ও মাসুদ সাঈদী এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ। কমিটি প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনারের প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুজন করে প্রার্থীর নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে।

কবে নাগাদ কমিশন গঠন হতে পারে—সম্প্রতি এমন প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছিলেন, দ্রুত তথ্য কমিশন গঠন করা হবে।

বর্তমানে তথ্য কমিশনের নিয়মিত সচিবও নেই। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. শাহ আলম অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।

.

গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত তথ্য কমিশন ভবনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে নেই কাজের তেমন তৎপরতা। নিয়মিত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিস করছেন। তাঁরা নিয়মিতই অফিস করছেন, তবে তাঁরা কেবল রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন।

তথ্য কমিশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কমিশন না থাকায় এখন কেবল রুটিন প্রশাসনিক কাজ চলছে। কমিশনের মূল দায়িত্ব হলো অভিযোগের শুনানি, তথ্য অধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা। কিন্তু এই তিন মৌলিক কাজই বন্ধ রয়েছে। প্রকাশনাও বন্ধ আছে। আইন অনুযায়ী প্রতিবছরের ৩১ মার্চের মধ্যে রাষ্ট্রপতির কাছে বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালের প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব হয়নি।

ওই কর্মকর্তার মতে, নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা ৭৮০টি অভিযোগ প্রকৃত চিত্র নয়। কারণ, অনেকেই জানেন, কমিশন কার্যকর নেই। কমিশন সচল থাকলে অভিযোগের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারত।

.
এখন প্রত্যাশা থাকবে, এমন একটি তথ্য কমিশন গঠন করা হবে, যেটি বাস্তবেই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হবে।
ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি
.

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তথ্য কমিশনের মতো জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) দীর্ঘদিন ধরে গঠিত হচ্ছে না। যদিও দুদক ও তথ্য কমিশন গঠনে বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে তথ্য কমিশনের গুরুত্ব বলার অপেক্ষা রাখে না। নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে এ কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইফতেখারুজ্জামানের মতে, জনগণের কাছে রাজনৈতিক অঙ্গীকার বা জবাবদিহি না থাকায় অন্তর্বর্তী সরকার তথ্য কমিশন গঠনে ব্যর্থ হয়েছে। তবে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার রয়েছে। বিলম্বে হলেও সরকার বাছাই কমিটি গঠন করেছে। এখন প্রত্যাশা থাকবে, এমন একটি তথ্য কমিশন গঠন করা হবে, যেটি বাস্তবেই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হবে।