‘সারা জীবন কষ্ট কইরা যেই ঘরডা বানাইছিলাম, অই ঘরখানা নিমিষে ভাইঙা গ্যাছে। অহন পোলা, পোলার বউ আর নাতি–নাতনি লইয়া আমরা ছয়জন মানুষের থাকার আর কোনো ঠাঁই নাই। সব শেষ অইয়্যা গেল।’
কথাগুলো ষাটোর্ধ্ব রানী দেবের। তাঁর বাড়ি হবিগঞ্জ সদরের সুঘর গ্রামে। বন্যায় তাঁর কাঁচা ঘরটি ভেঙে যায়। পানি কমার পর ভাঙা সেই বাড়িতে ফিরলেও মাথা গোঁজার জায়গা হারিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর পরিবারের।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও মৌলভীবাজার—এই ৭ জেলার ৫৯টি উপজেলায় বন্যা প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানি কমতে শুরু করায় ক্ষতির চিত্রও স্পষ্ট হতে থাকে। বাসিন্দারা ঘরবাড়িতে ফিরতে শুরু করলেও শুরু হয়েছে নতুন ধরনের টিকে থাকার লড়াই।
কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলে এসব অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়। মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন বলছে, গতকাল সোমবার বিকেল চারটা পর্যন্ত বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে ৫৪ জন মারা গেছেন। পানিবন্দী পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১।
মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বন্যার্তদের জন্য এসব এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে ১ হাজার ৪৯টি। এখনো এসব আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন ৩৮ হাজার ৪২২ জন মানুষ।
এদিকে আরও ৯টি জেলায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা করছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণকেন্দ্র। জেলাগুলো হলো সিলেট, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও কুড়িগ্রাম। কেন্দ্রটি বলছে, ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এসব অঞ্চল বন্যা প্লাবিত হতে পারে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর কাথারিয়া ইউনিয়নের নওশা মিয়া এখনো নিজের বাড়িতে ফিরতে পারেননি। এক সপ্তাহ ধরে তিনি এক আত্মীয়ের বাড়িতে আছেন। ৭৫ বছর বয়সী নওশা মিয়া বলেন, ‘পানি কমছে ঠিক, কিন্তু ঘরে ফিরলেই তো আর থাকা যায় না। আগে ঘর শুকাতে হবে, কাদা সরাতে হবে। চাল ও দেয়াল মেরামত করতে হবে। তারপর দেখা যাবে কীভাবে আবার সংসার শুরু করা যায়।’
নওশা মিয়ার মতোই চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের লাখো মানুষের অবস্থা একই রকম। কোথাও পানি নেমেছে, কোথাও এখনো রয়ে গেছে। ভাঙা ঘর মেরামত, কাদা সরানো, নষ্ট ফসলের ক্ষতি সামাল দিতে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার নতুন করে চেষ্টা শুরু হয়েছে।
গতকাল চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, লোকজন ঘরের কাদা পরিষ্কার করছেন। কেউ নষ্ট হয়ে যাওয়া আসবাব সরাচ্ছেন। অনেক পরিবার শুধু শুকনা খাবার খেয়েই দিন পার করার কথা জানালেন।
বাঁশখালী উপজেলার ডোংরা এলাকার শাহীন আক্তার বলেন, ‘আঁরা ক্যান গইজ্জুম (কী করব)। ক্যানে ঘর বাইন্দুম। টিঁয়া-পয়সা হডে পাইয়ুম।’
সাতকানিয়ার সদর, সোনাকানিয়া, ছদাহা, মাদার্শা, কেঁওচিয়া, কাঞ্চনা, আমিলাইশের কিছু জায়গা থেকে পানি নেমেছে। লোহাগাড়ার সব ইউনিয়ন থেকেও বন্যার পানি সরে গেছে। তবে অনেক নিচু এলাকা এখনো জলমগ্ন রয়েছে।
কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, রামু ও ঈদগাঁও উপজেলার বেশির ভাগ এলাকা থেকেও পানি নামতে শুরু করেছে। আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে ঘরে ফিরছেন বাসিন্দারা।
চকরিয়ার গোবিন্দপুর এলাকার নাছিমা বেগম বলেন, পাঁচ দিন পর গতকাল তিনি ঘরে ফিরে দেখেন মেঝে ধসে গেছে। পুরো ঘর ভরে গেছে কাদায়। কাদা সরিয়ে ঘর বসবাসের উপযোগী করার চেষ্টা করছিলেন।
ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৭ জুলাই থেকে মানবিক সহায়তা হিসেবে বিতরণের জন্য ৬৪ জেলার প্রশাসকদের ৮ হাজার ৯৫০ টন চাল এবং ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত সাত জেলার প্রশাসকদের দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ও ৩ হাজার ২৫০ টন চাল।
এমন দুর্যোগ জীবনে দেখেননি বলে জানিয়েছেন বাশখাঁলীর প্রেমাশিয়া এলাকার নুরুল আমিন। তিনি বলেন, ‘ছোট ছেলেমেয়েরা ৭ দিন ধরে কষ্ট করছে। পানি নেমেছে, কিন্তু ঘরে আগুন জ্বালানোর মতো অবস্থাও হয়নি।’
একই উপজেলার কাথারিয়া ইউনিয়নের বানুর বাপের বাড়ি এলাকার বাসিন্দা সাদুর রশীদ (৫৫) কথার মধ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘পরের জমি বর্গা চাষ করে কোনোমতে সংসার চলত। বানের পানিতে মাটির ঘরটাও ধসে গেল। এখন নতুন করে ঘর তুলব কীভাবে, সেই চিন্তাই মাথা থেকে নামছে না।’
পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের প্রায় সব কাঁচা রাস্তা পানির নিচে। মাঠ, পুকুর, গাছপালা—সব মিলেমিশে একাকার। কোথাও মাটির দেয়াল ধসে পড়েছে। আবার কোথাও ঘরের টিনের চালা পানির ওপরে দেখা যাচ্ছে। ভাঙা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ নষ্ট হওয়া জিনিসপত্র খুঁজছেন, কেউ কাদা সরাচ্ছেন।
পানির ওপর দাঁড়িয়ে ছেঁড়া শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে ধরেছিলেন আশা খাতুন। আঙুল তুলে দেখান, যেখানে একসময় তাঁর ঘর ছিল, এখন সেখানে শুধু ঘোলা পানি। মাটির ঘরটা আর নেই। ভেসে গেছে ধানের গোলা, চাল, হাঁস-মুরগি। পুকুরের মাছও বন্যার পানিতে বেরিয়ে গেছে।
ষাটোর্ধ্ব এই নারী বলেন, ‘ও বাপ, আঁর ঘর আর নাই, কিছু বাঁচাইত ন পারি। আঁরা হডে যাইয়ুম, হডে থাইক্কুম, কনে মাথা গুঁইজ্জুম, ন জানি।’
রাঙামাটিতে পানি কমতে শুরু করায় অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি ফিরছেন। তবে জেলার ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো রয়েছেন ৩ হাজার ৭৩৯ জন। পানিবন্দী রয়েছে ১ হাজার ৬৪৬টি পরিবার। অতিবৃষ্টিতে জেলার সাত উপজেলায় ১৩৫টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে।
বান্দরবানের বালাঘাটা, আর্মিপাড়া, ইসলামপুর, উজানিপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় লোকজনকে ঘরের কাদা পরিষ্কার করতে দেখা গেছে। সরকারি হিসাবে এখনো জেলার ৬ হাজার ২৫০ জন আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন।
উজানিপাড়ার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন, ঘরের ভেতর এখনো কাদা। পরিষ্কার না করলে সেখানে থাকা সম্ভব নয়। অনেক জিনিসপত্রও নষ্ট হয়ে গেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা–বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বন্যাকবলিত এসব মানুষকে এখন জরুরি সহায়তা দেওয়া দরকার। স্থানীয় সরকার কার্যত দুই বছর ধরে অচল হয়ে আছে। তাই দুর্গত ব্যক্তিদের সহায়তায় সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠন করা হোক। এসব এলাকার সংসদ সদস্যদের তাঁদের এলাকায় পাঠানো উচিত। তাঁরা গিয়ে দুর্গত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে সহায়তার বিষয়টি সমন্বয় করবেন। প্রয়োজনে সংসদ অধিবেশন মুলতবি থাকুক।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ এবং প্রতিনিধি, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি]