ক্যালেন্ডারের পাতা বদলে পেরিয়ে গেছে একটি বছর। কিন্তু উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি আজও তাড়া করে ফিরছে প্রত্যক্ষদর্শী ও হতাহতদের পরিবারকে। শরীরে পোড়া দাগ কিংবা দফায় দফায় অস্ত্রোপচারের যন্ত্রণার চেয়েও স্বজনদের বেশি পোড়াচ্ছে প্রিয়জনকে হারানোর কষ্ট আর মানসিকভাবে থমকে যাওয়া শিশুদের ভয়, আতঙ্ক ও দুঃস্বপ্ন।

দুর্ঘটনায় আহত সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফা আহমেদ পায়েল এখন সুস্থ হওয়ার চেষ্টা করছে। তবে তার শারীরিক উন্নতি হলেও মানসিক ক্ষত এখনও তাজা। তিনি বলেন, এখনও বিকট কোনো শব্দ শুনলেই মনে হয়—এই বুঝি আবার বিমান ভেঙে পড়ল।

সেদিনের ভয়াবহতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানায়, হঠাৎ বিকট শব্দের পর চারদিক ঢেকে যায় কালো ধোঁয়ায়। চারদিকে মানুষের আর্তনাদ আর ছোটাছুটি। শ্রেণিকক্ষে আটকে পড়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিল সে; খুঁজছিল একটু পানি। নিজের হাত পুড়ে গলতে দেখে মনে হচ্ছিল জীবন বুঝি সেখানেই শেষ।

আজও পায়েলের গায়ে রয়ে গেছে আগুনের ক্ষতচিহ্ন। রোদে গেলে ফোসকা পড়ে, গরমে বাড়ে চুলকানি। রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে বারবার ঘুম ভেঙে যায় তার।

একই ট্র্যাজেডির শিকার আরেক আহত শিক্ষার্থী জায়ানা মাহাবুব। ঘটনার সময় সে ছিল টিচার্স রুমে। চোখের পলকেই বদলে যায় তার জীবন। জায়ানা বলেন, ২১ জুলাই অন্যদের কাছে হয়তো সাধারণ একটা দিন। কিন্তু আমাদের জন্য এটি আজীবন এক অভিশপ্ত দিন হয়ে থাকবে। আকাশে কোনো প্রশিক্ষণ বিমানের শব্দ শুনলেই এখনও বুক ধড়ফড় করে ওঠে।

বার্ন চিকিৎসার দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের মতো আহতদের জন্য আজীবন স্বাস্থ্য কার্ড ও চিকিৎসা সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া জরুরি।

আহত শিক্ষার্থী তাসমিয়া খন্দকারের মা শাহেরা খান জানান, তার মেয়ের দুই হাতের ক্ষত অনেকটাই শুকিয়েছে, কিন্তু মানসিক অবস্থা দিন দিন জটিল হচ্ছে। মেয়েটা এখন PTSD (পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার) এবং OCD-তে ভুগছে। বিমানের শব্দ শুনলেই কানে হাত দিয়ে চিৎকার করে ওঠে। বাধ্য হয়ে তাকে আবারও হাসপাতালে ভর্তি করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

তিনি জানান, ইতোমধ্যে মেয়ের চিকিৎসায় পাঁচ লাখ টাকারও বেশি ব্যয় হয়েছে। সরকারি সহায়তার আশ্বাস মিললেও চিকিৎসার সিংহভাগ খরচ পরিবারকেই বহন করতে হচ্ছে। তবে বার্ন ইনস্টিটিউট ও মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ কিছু সহায়তা করেছে।

দুর্ঘটনায় ২৫ শতাংশ দগ্ধ হওয়া শিক্ষার্থী আহসানাফ ইসলাম নিলয়ের মা আইভি হোসেন নিজুম জানান, চলতি মাসেই তার ছেলের তিনটি অস্ত্রোপচার করার কথা রয়েছে। কানের পুনর্গঠন এবং হাতের অস্ত্রোপচার শেষ হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগবে। আহতদের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনে রাষ্ট্রীয়ভাবে আজীবন স্বাস্থ্য কার্ড এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবি জানান তিনি।

নিহত শিক্ষার্থী ওয়াকিয়া ফেরদৌস নিধির ভাই মোহাম্মদ এনামুল হাসান রায়হান বলেন, এক বছর পর আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধুই দীর্ঘ অপেক্ষা। সকালে বোনকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে এলাম, আর দুপুরে পেলাম তার নিথর দেহ। এক বছরেও আমরা কোনো বিচার পেলাম না।

তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না পাওয়া এবং ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা টাকার জন্য লড়ছি না। আমাদের প্রশ্ন—কেন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর যুদ্ধবিমান আছড়ে পড়ল? কার অবহেলায় এতগুলো তাজা প্রাণ ঝরে গেল? আমরা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।

আহত শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও নিহতদের স্বজনদের বক্তব্যে উঠে এসেছে কয়েকটি দাবি—প্রকৃত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, দায়ীদের বিচার, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার নিশ্চয়তা, আজীবন স্বাস্থ্য কার্ড, উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং নিহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২১ জুলাই উত্তরার দিয়াবাড়িতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভবনে বিধ্বস্ত হয়। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় পাইলট, শিক্ষক ও ২৮ জন শিশু শিক্ষার্থীসহ মোট ৩৬ জন প্রাণ হারান এবং দেড় শতাধিক মানুষ আহত হন।