এক সময় চা বলতে কেবল দুধ-চিনি মেশানো পরিচিত পানীয়কেই বোঝানো হতো। তবে গত এক দশকে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে হারবাল চা বা ভেষজ চা। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে ক্যাফে—সর্বত্রই বিভিন্ন ধরনের হারবাল চায়ের প্রচলন দেখা যাচ্ছে। অনেকে ওজন নিয়ন্ত্রণ, উন্নত ঘুম কিংবা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর আশায় এই পানীয় গ্রহণ করছেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে, হারবাল চা আদতে কতটা উপকারী এবং এর কোনো ঝুঁকি আছে কি না।

হারবাল চা মূলত বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ, ফুল, পাতা, ফল বা মসলার নির্যাস দিয়ে তৈরি একটি পানীয়। প্রচলিত চায়ের মতো এতে সব সময় চা-পাতা থাকে না, ফলে অনেক ক্ষেত্রে ক্যাফেইনের পরিমাণ থাকে খুবই কম বা একেবারেই থাকে না।

সবচেয়ে পরিচিত হারবাল চায়ের তালিকায় রয়েছে আদা–চা, পুদিনা–চা, ক্যামোমাইল চা, লেমনগ্রাস–চা, হিবিস্কাস চা, তুলসী–চা ও দারুচিনি–চা। আদা–চা হজমে সহায়তা করার পাশাপাশি বমিভাব কমাতে এবং ঠান্ডাজনিত অস্বস্তিতে স্বস্তি দিতে পারে। পুদিনা–চা পেটফাঁপা ও বদহজমের সমস্যায় উপকারী হিসেবে পরিচিত। শরীর ও মনকে শিথিল করতে সাহায্য করে বলে অনেকে ঘুমের আগে ক্যামোমাইল চা পান করেন। কিছু গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, হিবিস্কাস চা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। এছাড়া তুলসী ও লেমনগ্রাস–চা সতেজতা আনতে ও সামগ্রিক সুস্থতায় ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে হারবাল চা প্রাকৃতিক বলেই তা সম্পূর্ণ নিরাপদ—এই ধারণাটি ভুল। ভেষজ উপাদানেও সক্রিয় রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা শরীরের ওপর প্রভাব ফেলে এবং অনেক ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। যেমন—নির্দিষ্ট ফুলজাতীয় ভেষজ বা ক্যামোমাইলে কারও কারও অ্যালার্জি হতে পারে। অতিরিক্ত আদা–চা পান করলে অনেকের অম্বল বা পাকস্থলীর অস্বস্তি বাড়তে পারে। এছাড়া রক্তচাপ কমানোর ওষুধের সঙ্গে হিবিস্কাস চা গ্রহণ করলে রক্তচাপ অতিরিক্ত কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, কিডনি বা লিভারের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি এবং নিয়মিত ওষুধ সেবনকারীদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত হারবাল চা পান করা সমীচীন নয়।

সাধারণত সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দিনে এক থেকে দুই কাপ হারবাল চা নিরাপদ বলে মনে করা হয়, তবে এটি কখনোই পানির বিকল্প নয়। সারা দিনের তরল চাহিদা পূরণে বিশুদ্ধ পানির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। হারবাল চা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে, তবে একে অলৌকিক পানীয় ভাবার সুযোগ নেই।

একই দিনে বিভিন্ন ধরনের হারবাল চা পানের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সকালে আদা–চা, দুপুরে লেমনগ্রাস–চা এবং রাতে ক্যামোমাইল চা—এ ধরনের পরিমিত বৈচিত্র্য সাধারণত ক্ষতিকর নয়। তবে অনেক ধরনের ভেষজ একসঙ্গে বা অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে শরীরে অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া হতে পারে। বিশেষ করে বাজারে পাওয়া বিভিন্ন ‘ডিটক্স’ বা ‘স্লিমিং’ চায়ের উপাদান সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে নিয়মিত পান করা উচিত নয়।

পরিশেষে বলা যায়, সচেতনতা ও পরিমিতির সাথে নিজের শারীরিক অবস্থা বুঝে পান করলে হারবাল চা জীবনযাপনের একটি আনন্দদায়ক ও উপকারী সংযোজন হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য কোনো একক পানীয় যথেষ্ট নয়; বরং সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পানি, নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুমই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

— লেখক: ডা. সাইফ হোসেন খান, সহকারী অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ধানমন্ডি