জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে মুছে দিতে চায়—এমন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু লিখিত-কাগুজে বিষয় হয়েছে। আবার সেটাকেও মেনে নেওয়া, না নেওয়ার জায়গায় রশি টানাটানি চলছে। এই রশি টানাটানির মধ্যে কার শক্তি বেশি, এটাও আগামীতে প্রমাণ হবে, ইনশা আল্লাহ৷’
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে এ কথা বলেন হামিদুর রহমান আযাদ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘আত্মোপলব্ধি ও আত্মপর্যালোচনায় অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের দীপ্ত শপথ’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।
আলোচনায় জামায়াত নেতা বলেন, সারাজীবন সংস্কারের কথা বলা হলেও দিনের পর দিন ঐকমত্য কমিশনে আলোচনা শেষে একটি জায়গায় আসা হয়েছে। তিনি জানান, রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা, জাতিকে প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের পর জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয় দেশ ও জাতির স্বার্থে।
জুলাইয়ের শহীদ ও জুলাই যোদ্ধাদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য সেদিন একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে সনদে স্বাক্ষর করার কথা উল্লেখ করে হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, সেগুলো আমরা এখনো বাস্তবে রূপ দিতে পারিনি। মৌলিক সংস্কারের অনেকগুলো অধ্যাদেশ হয়েছিল। সংসদে ২০টি মৌলিক সংস্কারের অধ্যাদেশ বাদ পড়ে গেল। জানি না, এগুলোর ভাগ্যে কী হবে।’
গণভোটের অধ্যাদেশ রহিত করে জন–আকাঙ্ক্ষার গণভোটকেও দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে—এমন অভিযোগও করেন তিনি। তবে আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোট পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঘটনাকে সুখবর বলে অভিহিত করেন হামিদুর রহমান আযাদ।
তিনি সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কার করতে হবে। জনগণ গণভোটে সেই রায়ই দিয়েছে। একই তফসিলের অধীন একই দিনে দুটি ভোট হয়েছে। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।’
গণভোটের গণরায়ের কথা উল্লেখ করে জামায়াত নেতা বলেন, ‘এটাকে উপেক্ষা করে কীভাবে গণতন্ত্র কায়েম হবে? রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে আরেকটি সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র কেন কায়েম হবে? সংসদে আপনারা বলেছেন, নির্বাচনের জন্য সংস্কার মেনে নিয়েছিলাম। জাতির সঙ্গে দ্বিচারিতা করে কোনো দিন সামনে এগোতে পারবেন না।’
সংসদের কার্যকারিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সংসদ তখনই কার্যকর হবে, যখন সরকারি দলের ও বিরোধী দলের বক্তব্য সমন্বয় করে যেটা দেশ ও জনগণের স্বার্থে প্রয়োজন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। সংসদে এখন কথাবার্তা যেগুলো হয়, দেশ ও জনগণের স্বার্থে কতটুকু হয়, আপনারা জানেন। সেখানে হালকা-পাতলা রসিকতায় অনেক সময় ব্যয় করা হয়৷ তিনি বলেন, দেশ থেকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চিরতরে বিলুপ্ত করতে হবে। যারা খুন করেছে, হামলা করেছে, গুলি করেছে, শুধু তাদের বিচার নয়; যারা নির্দেশ দিয়েছে, মদদ দিয়েছে তাদেরও বিচার করতে হবে৷ সংস্কার ও গণভোট বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে৷’
‘জাতিকে বোকা বানানোর চেষ্টা করবেন না’
গত মঙ্গলবার ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মায়ের স্বাক্ষরিত একটি স্মারকলিপি সংসদের স্পিকারের কাছে দেওয়া হয়েছে বলে জানান জামায়াতের এ নেতা। তিনি বলেন, স্মারকলিপিতে ছয়টি দফা আছে। প্রথম দফা হচ্ছে, অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকুন এবং সংস্কার বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিন। হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বিষয়টি টেকসই হবে না এবং সংবিধান সংশোধনের জন্য সরকার কমিটি গঠন করেছে, কিন্তু বিরোধী দল সেখানে যায়নি।
তিনি বলেন, ‘সংবিধান সংশোধনের জন্য নয়, জুলাই বিপ্লব হয়েছে সংবিধান সংস্কারের জন্য। গণভোটে সংবিধান সংশোধনের জন্য জনগণ রায় দেয়নি, জনগণ রায় দিয়েছে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংস্কারের জন্য। সরকার যে পথে হাঁটছে, এটা জনআকাঙ্ক্ষার বিপরীত পথ। এটা জুলাইয়ের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার পথ।’
সরকারের উদ্দেশে জামায়াত নেতা আরও বলেন, ‘সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া অবলম্বন করে জাতিকে বোকা বানানোর চেষ্টা করবেন না। কারণ, অতীতে সংশোধনী অনেকগুলো আদালতে গিয়ে বাতিল হয়ে গেছে। ফলে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে যে সংস্কারের পথে হাঁটা হচ্ছে, এটা এক সময় চ্যালেঞ্জ হয়ে বাতিল হয়ে যাবে। তাই জনগণ বুঝেশুনে রায় দিয়েছে যে সংশোধনী নয়, সংস্কার করতে হবে। আসুন, আমরা এই শপথে বলীয়ান হই যে সংসদ যদি সমাধান না করে, তাহলে রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে, জনতার সংসদে সমাধান হবে৷’
সভায় সভাপতিত্ব করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান (মঞ্জু)। বক্তব্য দেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম প্রমুখ।






