১৯১০ সালে যক্ষ্মা বিষয়ে যুগান্তকারী অবদানের জন্য চিকিৎসক রবার্ট কোচকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। সে সময়ে তিনি বলেছিলেন: ‘মানুষকে একদিন শব্দ-দূষণের মোকাবিলা করতে হবে কলেরা ও প্লেগ ঠেকানোর মতো সমান গুরুত্বের সঙ্গে।’ তখন কে ভেবেছিল তাঁর সেই ভবিষ্যদ্বাণী একদিন বাস্তবের ভয়ঙ্কর সত্য হয়ে উঠবে?
অতিরিক্ত শব্দের প্রভাবে দেশের লাখো মানুষ ইতোমধ্যে কানে কম শোনেন। একই সঙ্গে দেখা দিচ্ছে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং ফুসফুসজনিত জটিলতা, মস্তিষ্ক বিকৃতি, স্মরণশক্তি হ্রাস, মানসিক চাপসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যা। এ অবস্থায় শিশু ও প্রবীণরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানুষের শব্দ গ্রহণের স্বাভাবিক মাত্রা ৪০-৫০ ডেসিবল। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক জরিপে দেখা যায়, দেশের বিভাগীয় শহরগুলোয় শব্দের মানমাত্রা ১৩০ ডেসিবল ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে আড়াই থেকে তিনগুন বেশি।
ভবনের নির্মাণকাজ, কল কারখানা, মাইকিং, যানবাহনের হর্ন—এসব শব্দ দূষণের বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে শহরাঞ্চলের বাসিন্দারা জানেন, যানবাহনের হর্নই কানের জন্য সবচেয়ে বড় বিভীষিকা। এর বাইরে আছে রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উচ্চস্বরে মাইক বাজানো। এসব অনুষ্ঠানের সময় কয়েক মাইল জুড়ে মাইক লাগানো হয়। আয়োজকরা একবারও ভাবেন না, ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এক কিলোমিটারের মধ্যে কত শত অসুস্থ, প্রবীণ ও শিশু বসবাস করে।
এমন বাস্তবতায় দেখা যায়, সৌদি আরবের মতো দেশে মসজিদের লাউডস্পিকারের শব্দসীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। মাত্রা হতে পারবে সর্বোচ্চ সাউন্ডের তিনভাগের এক ভাগ।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর অধীনে ২০০৬ সালে শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। এই বিধিমালার ৯ ধারায় উচ্চস্বরে গান বাজানোসহ বিভিন্ন ধরনের শব্দ দূষণের বিষয়ে বলা আছে।
ঢাকার বেশ কিছু জায়গায় ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারলাম, হর্ন দেওয়ার জন্য মামলা করার বিষয়টি তাঁদের মনস্তত্ত্বেই নেই। কারণ, এখনো মানুষ শব্দদূষণকে অপরাধই মনে করে না। আইন করে বসে না থেকে দয়া করে এর প্রয়োগ করুন
এ আইনের ১৮ ধারায় বলা আছে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবাসিক এলাকায় শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্র বাজালে বা আইন অমান্য করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা এবং এক মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ ছাড়া পরে একই ধরনের অপরাধ করলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৬ মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
বাস্তবতা দেখে মনে হয়, শব্দদূষণকে আমরা মেনেই নিয়েছি। আইন থাকার পরও হর্ন বাজানোর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। অথচ ২০২৫ সালের শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা অনুযায়ী এখন ট্রাফিক পুলিশকে মামলা করার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে।
আইন থাকলেও কোনো ধরনের তৎপরতা না থাকলে তা অপরাধের স্বাভাবিকীকরণ ছাড়া আর কী হতে পারে। যখন মানুষ অপরাধকে আর অপরাধই মনে করে না, তখন কীভাবে বদলাবে—সেটাই প্রশ্ন।
একদিন বাইকের পেছনে চড়ে অফিসে আসার পথে হোটেল সোনারগাওঁয়ের সিগনালে আটকে পড়লাম। সব গাড়ি স্থবির। কিন্তু ঠিক পেছনে একজন মটরসাইকেল চালক কোনো কারণ ছাড়াই হর্ন বাজাচ্ছেন। জিজ্ঞেস করলাম হর্ন কেন দিচ্ছেন। সে অবাক হয়ে উত্তর দিল, ‘হর্ন বাজাইলাম কই!’ অর্থাৎ মনের অজান্তেই তিনি হর্ন বাজাচ্ছিলেন। এই যদি হয় পরিস্থিতি, তাহলে তিনি এটাকে অপরাধ হিসেবে ভাববেন কোন দুঃখে?
আরেকদিন সিএনজিতে পুরান ঢাকায় যাচ্ছি। সিএনজিচালক অযথা হর্ন বাজিয়েই যাচ্ছেন। পথিমধ্যে একজন অতীষ্ট হয়ে অশ্লীল ভাষায় বেশ কিছু গালি নির্গমন করলেন। আমাদের সিএনজিওয়ালা মুখ টিপে হাসছেন। আমি যখনই জিজ্ঞেস করলাম অযথা হর্ন কেন দিচ্ছেন? উত্তের বলল ‘মামা, হর্ন দিয়া আরেক গাড়িতে লাগাইয়া দিলেও কোন সমস্যা নাই। কিন্তু হর্ন না দিলে কইবো, হর্ন কেন দিলি না! তাই হুদাই হর্ন বাজাই।’
এমন অসুস্থ সংস্কৃতির মধ্যেই আমরা বসবাস করছি। অথচ আইন করে বসে আছি, যার প্রয়োগ হতে দেখা যায় না।
তবে আইনের প্রয়োগ হলে প্রভাব পড়বেই—এটার উদাহরণ মটরসাইকেলে হেলমেটের ব্যবহার। ২০১৮ সালের সড়ক আন্দোলনের পর এ বিষয়টি বেশ ভালভাবেই পোক্ত হয়েছে। হেলমেটের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও হেলমেট পড়ার ক্ষেত্রে মানুষের অভ্যস্ত হয়ে ওঠা সন্দেহাতীত।
এ ছাড়া এখন ঢাকা শহরের বহু জায়গায় এআই ক্যামেরার সাহায্যে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে জরিমানা করা হচ্ছে। ফলে সেসব এলাকায় মানুষ তুলনামূলকভাবে সিগনাল মেনে চলছেন। এ বছর ৫ জুন পরিবেশ দিবসের এক অনুষ্ঠানে ডিএনসিসির প্রশাসক অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন এআই ক্যামেরা দিয়ে শব্দদূষণকারীও সনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শব্দদূষণ নাকি শব্দসন্ত্রাস—এই নতুন ‘মাথাব্যথার’ ওষুধ কী? ইউরোপ, আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বে ট্রাফিক আইন মেনে চলার অন্যতম কারণ উচ্চ হারে জরিমানা। দীর্ঘদিনের এ চর্চার মাধ্যমেই মানুষ অভ্যস্ত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও বলি।
ফ্রান্সের এক ছোট্ট শহর লিল। বেলজিয়ামের সীমান্তঘেঁষা এই শহরে বৃষ্টির মধ্যে একা হাঁটছিলাম। রাস্তায় তেমন কোনো গাড়িঘোড়া নেই। এক মোড়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে ফোনে কিছু একটা দেখছিলাম। এমন সময় একটা মেয়ে প্রাইভেট কার চালিয়ে সেই মোড়ে এসে থামল। আমি ভেবেছিল সিগনালের কারণে থেমেছে। একটু পর ফোন থেকে মাথা তুলে দেখি সেখানে কোনো স্বয়ংক্রিয় সিগনাল ব্যবস্থা বা ট্রাফিক পুলিশ নেই। মেয়েটির গাড়ির চাকা সামান্য কিছুটা জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর পড়ে ছিল। তিনি ব্যাক গিয়ারে গিয়ে গাড়ি জেব্রা ক্রসিং থেকে সরিয়ে নিলেন।
যদিও যেটুকু চাকা এসেছিল, তাতে চলাচলের বিন্দুমাত্র অসুবিধা হচ্ছিল না। আমি হাত দিয়ে তাকে ইশারা করতেই তিনি গাড়ি নিয়ে রাস্তা পার হলেন। অথচ সেখানে ছিল না কোনো স্বয়ংক্রিয় সিগনাল, ছিল না কোনো ট্রাফিক পুলিশ বা ক্যামেরা। এটা সম্ভব হয়েছে দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে। এর পেছনে বড় কারণ মোটা অংকের জরিমানা।
এত দূরেও যেতে হয় না। পাশের দেশ ভারতের কলকাতায় ট্যাক্সি নিয়েছি। সেখানে বেশিরভাগ রাস্তাই দেখলাম একদিকে চলাচল। তবে মজার ব্যাপার হলো একই রাস্তা সকালে একদিকে, বিকেলে আরেকদিকে। আমরা তো সাধারণ চলাচলই ঠিক রাখতে পারিনা। তাই স্বাভাবিকভাবেই ট্যাক্সিচালককে প্রশ্ন করলাম কী করে সবার মনে থাকে কোন রাস্তা কখন কোন দিকে চলাচল। এক লাইনে তিনি জবাব দিলেন, ‘দাদা, একবার ৩ হাজার রুপি জরিমানা দিলে অটোমেটিক মনে থাকে।’
আইন ঠিকভাবে প্রয়োগ করলে যে কাজ হয়—তার প্রমাণ তো আমাদের দেশেই আছে। তা না হলে যানবাহনের চালকরা শহরের অন্য কোথাও আইন মানুক না মানুক, ক্যান্টনমেন্টের ভেতর কেন মানে?
পৃথিবীর অনেক দেশে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে শহরের নকশা পর্যন্ত পাল্টে ফেলা হচ্ছে। প্রযুক্তির সহায়তায় স্থাপত্যবিদরাও সেসব করছেন। আর আমরা এখনো অকারণে হর্ন বাজানোর জন্য জরিমানা পর্যন্ত করতে পারছি না।
ঢাকার বেশ কিছু জায়গায় ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারলাম, হর্ন দেওয়ার জন্য মামলা করার বিষয়টি তাঁদের মনস্তত্ত্বেই নেই। কারণ, এখনো মানুষ শব্দদূষণকে অপরাধই মনে করে না। তাই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে এ বিষয়ে কড়া নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন। আইন করে বসে না থেকে দয়া করে এর প্রয়োগ করুন।
খলিলউল্লাহ্ লেখক ও সাংবাদিক






