একটা সময় ছিল, যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় ছিল পরাশক্তির দিকে তাকানো। ওয়াশিংটন কী বলছে, মস্কো কী করছে, পরে বেইজিং কী ভাবছে—এসবের মধ্যেই যেন বিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতো। ছোট ও মাঝারি দেশগুলোর ভূমিকা ছিল অনেকটাই মূল্যহীন। তারা ইতিহাসের নির্মাতা নয়, ইতিহাসের দর্শকমাত্র, কখনো ফলভোগী।
আজ সেই বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি। চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি। ভারত দ্রুত উত্থানশীল একটি বৈশ্বিক শক্তি।
কিন্তু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সম্ভবত অন্য কোথাও। পরিবর্তনটি হচ্ছে বিশ্ব ক্রমে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে শুধু পরাশক্তিরাই আর নিয়ম তৈরি করছে না; বরং মাঝারি শক্তির দেশগুলোও নিজেদের কৌশলগত অবস্থান দিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। বৈশ্বিক রাজনীতির ইতিহাসে এসবই নতুনতর ঘটনা। এই পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের ওপরও পড়ছে।
.সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র তার স্বাধীনতার ২৫০তম বছর পূর্ণ করেছে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—দেশটি দুর্বল হয়ে পড়েনি, কিন্তু তার বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন বিশ্বাস করত, বিশ্বায়ন এবং মুক্তবাণিজ্যই আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি। কিন্তু এখন সেই ধারণার জায়গায় এসেছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এবং কৌশলগত শিল্পের প্রশ্ন।
অনেকে এই পরিবর্তনের শুরু ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে খুঁজে পান। বাস্তবে ট্রাম্প এই পরিবর্তনের সূচনা করেননি; বরং এই প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট ও দ্রুত করেছেন, যা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছিল। আজ যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কনীতি শুধু বাণিজ্যের প্রশ্ন নয়, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও। প্রযুক্তি শুধু উদ্ভাবনের বিষয় নয়, ভূরাজনীতির অংশ। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় অর্থনীতি এবং কূটনীতির মধ্যকার পুরোনো বিভাজন ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এই পরিবর্তনের অন্য প্রান্তে রয়েছে চীন। গত দুই দশকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান শুধু একটি দেশের উন্নয়নের গল্প নয়; এটি আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যেও বড় পরিবর্তনে সূচনা করেছে। উৎপাদন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগে চীনের বিস্তার উন্নয়নশীল বিশ্বের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশও সেই বাস্তবতার অংশ। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং বাণিজ্যে চীনের ভূমিকা এখন অস্বীকার করার উপায় নেই।
.জাতীয় স্বার্থের কূটনীতি ও বাংলাদেশের নতুন যাত্রা.অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারগুলোর একটি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রধান ক্রেতা। জাপান বড় উন্নয়ন অংশীদার। ভারত ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বাস্তবতা। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের অন্যতম ভিত্তি। অর্থাৎ বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প কোনো একক অংশীদারের গল্প নয়; এটি বহুমাত্রিক অংশীদারত্বের গল্প।
এই বাস্তবতাই বাংলাদেশের সামনে নতুন প্রশ্ন তুলে ধরছে। বাংলাদেশ কি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে যাবে, নাকি চীনের দিকে? না, বিষয়টি এমন নয়, বরং প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশ কি এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকবে?
এই প্রশ্ন শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নয়। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক অনেক দেশই আজ একই ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি। তারা কেউই একটি মাত্র শক্তির ওপর নির্ভর করতে চায় না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রেখেও তারা চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করছে। আবার চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রেখেও পশ্চিমা বিশ্বের প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে।
.এই প্রবণতাকে অনেক বিশ্লেষক ‘স্ট্র্যাটেজিক হেজিং’ বা কৌশলগত বহুমুখিতা বলে অভিহিত করছেন। এটি স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার জোটনিরপেক্ষ নীতির পুনরাবৃত্তি নয়। তখন লক্ষ্য ছিল দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী শিবির থেকে সমদূরত্ব বজায় রাখা। এখন লক্ষ্য হচ্ছে সব পক্ষের সঙ্গে কাজ করা, কিন্তু কোনো এক পক্ষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে পড়া। আজকের বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য এ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা যত বাড়বে, ততই বিভিন্ন শক্তি তাদের অংশীদারদের কাছ থেকে আরও স্পষ্ট অবস্থান প্রত্যাশা করবে। বন্দর, টেলিযোগাযোগ, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কিংবা বাণিজ্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভূরাজনৈতিক বিবেচনা বাড়বে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা।
তবে কৌশলগত ভারসাম্য কোনো দুর্বল রাষ্ট্রের কৌশল নয়। এটি সফল হয় তখনই, যখন একটি রাষ্ট্র তার জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখে এবং সেই স্বার্থ রক্ষার মতো অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অর্জন করে। এখানেই অর্থনীতির প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্ববাণিজ্যের নিয়মও বদলে যাচ্ছে।
আগে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো উৎপাদনের স্থান নির্ধারণ করত প্রধানত শ্রমের খরচ বিবেচনা করে। এখন তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল, সরবরাহব্যবস্থার বৈচিত্র্য কিংবা নতুন বাণিজ্যচুক্তিগুলো এই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
.প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে ‘কৌশলগত স্বাধীনতার’ বার্তা.বাংলাদেশের জন্য এটি একটি সুযোগ। কিন্তু সুযোগ তখনই সাফল্যে রূপ নেবে, যদি আমরা শুধু কম খরচের উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে না থেকে উচ্চ মূল্য সংযোজিত শিল্প, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং উদ্ভাবনের দিকে এগোতে পারি।
আগামী দশকে প্রতিযোগিতা হবে শুধু পণ্যমূল্যের ভিত্তিতে নয়; প্রতিযোগিতা হবে দক্ষতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং উদ্ভাবনের। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতিকে তাই আলাদা করে দেখার সুযোগ দ্রুতই কমে আসছে। রপ্তানি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা এবং কূটনীতি—সবই এখন একই সমীকরণের অংশ।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই কোনো একটি পক্ষকে সন্তুষ্ট করা নয়; বরং এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া, যার সঙ্গে সবাই কাজ করতে আগ্রহী। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী অর্থনীতি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, দক্ষ কূটনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা।
বিশ্ব এখন আর স্নায়ুযুদ্ধের যুগে নেই। আবার একক পরাশক্তির যুগেও নেই। এটি এমন এক সময়, যেখানে প্রতিযোগিতা যেমন বাড়ছে, তেমনি বিকল্পও বাড়ছে। এই নতুন বাস্তবতায় যে দেশ যত বেশি বিকল্প তৈরি করতে পারবে, সে দেশ তত বেশি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। বাংলাদেশের সামনে আজ সেই সুযোগ রয়েছে।
.বিশ্বব্যবস্থা বদলাচ্ছে। শক্তির সংজ্ঞাও বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে যদি আমরা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখি, তাহলে পুরো ছবিটা দেখা হবে না। আসল পরিবর্তন হচ্ছে যেসব দেশ জাতীয় স্বার্থ স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে পারছে, তারা ক্রমেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠছে।.
আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো একটি পরাশক্তির ঘনিষ্ঠতা নয়। আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি, যা বহুমুখী সম্পর্ককে জাতীয় স্বার্থের আলোকে পরিচালিত করবে; এমন একটি অর্থনীতি, যা পরিবর্তিত বিশ্ববাণিজ্যের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারবে; এবং এমন একটি রাষ্ট্র, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাকে সংকট নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে সক্ষম হবে।
বিশ্বব্যবস্থার এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগও। সেই সুযোগগুলো সহযোগিতায় রূপান্তর করতে পারলে ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশ আর কেবল অন্যদের সিদ্ধান্তে প্রভাবিত থাকবে না; বরং নিজের অবস্থান, সক্ষমতা এবং কৌশলের মাধ্যমে নিজস্ব প্রভাবও সৃষ্টি করতে পারবে।
আমাদের দরকার একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান। এ ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রনীতিতে স্বতন্ত্রতা বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি হবে অধিকতর যুক্তিযুক্ত।
আজ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি নতুন শব্দ ক্রমেই বেশি শোনা যাচ্ছে ‘স্ট্র্যাটেজিক হেজিং’ বা কৌশলগত বহুমুখিতা। শব্দটি হয়তো নতুন, কিন্তু এর পেছনের বাস্তবতা খুবই স্পষ্ট। এর অর্থ হলো, একটি দেশ তার সব সম্ভাবনার দরজা খোলা রাখবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য করবে, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো গড়বে, জাপান থেকে প্রযুক্তি নেবে, ইউরোপের সঙ্গে বাজার সম্প্রসারণ করবে, সংযোগ বাড়াবে ভারতের সঙ্গেও। কিন্তু কোনো একটিমাত্র সম্পর্কের ওপর নিজের ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল করে তুলবে না।
.এটি স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার জোটনিরপেক্ষ নীতির পুনরাবৃত্তি নয়। তখন দুটি আদর্শিক শিবিরের বাইরে থাকার চেষ্টা ছিল মূল লক্ষ্য। আজকের পৃথিবীতে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন অধিকাংশ দেশই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার, আবার অন্য কোনো ক্ষেত্রে চীনেরও অংশীদার। কেউই সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় না। কারণ, তারা বুঝে গেছে, বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা এবং কূটনীতি একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি টিকিয়ে রাখা কঠিন।
আজকের আন্তসংযুক্ত বিশ্বব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তনের অভিঘাত কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব সর্বত্র। এই বাস্তবতা সামনে রেখে ভবিষ্যতের রূপরেখা নির্ধারণ করতে হবে।
ভিয়েতনামের দিকে তাকানো যাক। যে দেশটি একসময় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধ করেছে, সেই দেশই আজ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। আবার একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে তার বাণিজ্যও ব্যাপক। ইন্দোনেশিয়া যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া সবার সঙ্গে কাজ করছে। সৌদি আরব নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছে, আবার অর্থনৈতিক সহযোগিতায় চীনের সঙ্গে এগোচ্ছে। ভারতও আজ ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’-এর কথা বলছে।
.এই উদাহরণগুলো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমাদের অবস্থানও ক্রমেই একই ধরনের বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। একসময় বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মূলত উন্নয়ন সহযোগিতার প্রাপক হিসেবে দেখা হতো। আজ সেই চিত্র বদলেছে।
দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান, দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি, বৃহৎ শ্রমশক্তি, তৈরি পোশাকশিল্পে বৈশ্বিক অবস্থান, সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক সংযোগের কেন্দ্র হিসেবে এর গুরুত্ব সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন শুধু একটি উন্নয়নশীল দেশ নয়; বরং একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বপরিসরে হাজির।
এ কারণেই আজ ওয়াশিংটন, বেইজিং, নয়াদিল্লি, টোকিও কিংবা ব্রাসেলস সবাই বাংলাদেশকে নতুনভাবে দেখছে। এটি বাংলাদেশের জন্য প্রথাগত ধারণার বিপরীতে ভিন্ন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে। অনেকে এটিকে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখেন। কিন্তু আমি বিষয়টিকে আরেকভাবে দেখি।
বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়েছে বলে এই প্রতিযোগিতা নয়; বরং বিশ্বব্যবস্থা বদলেছে বলেই বাংলাদেশের গুরুত্ব আরও দৃশ্যমান হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথ, সরবরাহব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং উৎপাদনকেন্দ্রের বৈচিত্র্য—এসব পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ নতুন এক ভূমিকায় এসেছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্কও গভীর।
.একসময় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর প্রধান বিবেচনা ছিল কোথায় সবচেয়ে কম খরচে পণ্য উৎপাদন করা যাবে। এখন সেই প্রশ্নের সঙ্গে আরও কয়েকটি প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে, দেশটি কি রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল? সরবরাহব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য? দক্ষ জনশক্তি আছে কি? নীতিগত ধারাবাহিকতা রয়েছে কি? প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কতটা? অর্থাৎ প্রতিযোগিতার মানদণ্ডে অনেক বিষয় যোগ হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এটি যেমন সুযোগ, তেমনি সতর্কবার্তাও। শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে আগামী দশকের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না। আমাদের শিক্ষা, দক্ষতা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, বন্দরব্যবস্থা, জ্বালানিনিরাপত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কারণ, ভবিষ্যতের বিশ্বে প্রতিযোগিতা শুধু পণ্যের নয়; প্রতিযোগিতা হবে বিশ্বাসযোগ্যতারও।
এই জায়গায় এসে পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতিকে আর আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। একটি বাণিজ্যচুক্তি কেবল শুল্কের বিষয় নয়; এটি প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, সরবরাহব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কেরও অংশ। একটি সমুদ্রবন্দর কেবল অবকাঠামো নয়; এটি আঞ্চলিক সংযোগ ও নিরাপত্তারও অংশ। একটি প্রযুক্তি কোম্পানির বিনিয়োগ কেবল ব্যবসা নয়; এটি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সক্ষমতারও অংশ। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনো একটি শক্তির প্রভাববলয়ে ঢুকে যাওয়া নয়।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া, যার সঙ্গে সবাই কাজ করতে আগ্রহী এবং যে রাষ্ট্র নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। কোনো একক বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে অসম সম্পর্ক কখনো স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না, উল্টো তা ধ্বংস, বিভেদ, বিপর্যয় ঢেকে আনে। ইতিহাসে এ ধরনের নজির অনেক।
.আমরা প্রায়ই স্বাধীনতার কথা বলি। কিন্তু স্বাধীনতার অর্থও সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার অর্থ ছিল একটি রাষ্ট্রের জন্ম। আজ স্বাধীনতার আরেকটি অর্থ আছে—জাতীয় স্বার্থকে অন্যের চাপের কাছে সমর্পণ না করে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। এ কারণেই আমার মনে হয়, আগামী দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে কোনো একটি পরাশক্তির সমর্থন নয়। সবচেয়ে বড় শক্তি হবে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি, দক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা, বিশ্বাসযোগ্য কূটনীতি এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব।
বিশ্বব্যবস্থা বদলাচ্ছে। শক্তির সংজ্ঞাও বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে যদি আমরা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখি, তাহলে পুরো ছবিটা দেখা হবে না। আসল পরিবর্তন হচ্ছে যেসব দেশ জাতীয় স্বার্থ স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে পারছে, তারা ক্রমেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের সামনেও সেই সুযোগ রয়েছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু পরিবর্তনকে দেখব, নাকি পরিবর্তনের সুযোগকে কাজে লাগাতে শিখব? ভবিষ্যতের ইতিহাস সম্ভবত সেই দেশগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দেবে, যারা অন্যের ছায়ায় দাঁড়ায়নি; বরং পরিবর্তিত বিশ্বের বাস্তবতা বুঝে নিজেদের পথ নিজেরাই তৈরি করেছে।
জিল্লুর রহমান রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর সভাপতি। তিনি চ্যানেল আইয়ের জনপ্রিয় সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘তৃতীয় মাত্রা’-এর উপস্থাপক।
*মতামত লেখকের নিজস্ব






