একসময় বাংলাদেশের বাজেটের আগে একটি পরিচিত দৃশ্য প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছিল। অর্থমন্ত্রী বিদেশে যেতেন, বিশেষ করে প্যারিসের দাতা সম্মেলনে, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠক করতেন এবং দেশে ফিরে এসে বলা হতো—বাংলাদেশের জন্য কত সহায়তা পাওয়া গেল, কোন খাতে কত ঋণ বা অনুদান আসবে এবং সেই অর্থ বাজেট বাস্তবায়নে কতটা সহায়ক হবে। তখন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কূটনীতি অনেকটাই ছিল সহায়তা সংগ্রহের কূটনীতি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় এটি ছিল দর-কষাকষি, কিন্তু তার কেন্দ্রে ছিল প্রয়োজন, মর্যাদা নয়, বরং নির্ভরতার বাস্তবতা।

আজকের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বাংলাদেশ আর সেই বাংলাদেশ নেই, যে কেবল বাজেটের ঘাটতি পূরণের জন্য দাতাদের দরজায় দাঁড়াবে। অর্থনীতি জটিল হয়েছে, জনসংখ্যা শক্তিতে পরিণত হয়েছে, প্রবাসী আয় অর্থনীতির একটি প্রধান স্তম্ভ হয়েছে, তৈরি পোশাক বিশ্ববাজারে দেশকে দৃশ্যমান করেছে, অবকাঠামো উন্নয়ন রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষাকে বড় করেছে এবং ভূরাজনীতি বাংলাদেশকে নতুন গুরুত্ব দিয়েছে।

.প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে ‘কৌশলগত স্বাধীনতার’ বার্তা.

ফলে সরকার-টু-সরকার আলোচনার অর্থও বদলে গেছে। এখন বৈঠক মানে শুধু অর্থ পাওয়া নয়, বাজার পাওয়া, শ্রমবাজার সুরক্ষা, বিনিয়োগ আনা, প্রযুক্তি সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, পানি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা সংলাপ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান নির্মাণ।

এই পরিবর্তন বোঝা জরুরি। কারণ, পুরোনো চোখে নতুন কূটনীতি দেখা হলে ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হয়। কেউ ভাবতে পারেন, বিদেশ সফর মানেই সাহায্য চাওয়া। কেউ ভাবতে পারেন, একটি দেশে আগে যাওয়া মানেই আরেক দেশকে অগ্রাহ্য করা। কেউ আবার ভাবতে পারেন, বড় প্রতিবেশীকে পাশ কাটিয়ে অন্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো মানেই কৌশলগত ঝুঁকি। বাস্তবতা এত সরল নয়। আধুনিক কূটনীতি সরলরেখায় চলে না, চলে বহুস্তরে, বহুস্বার্থে, বহু দিগন্তে।

বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা আরও সংবেদনশীল। কারণ, ভারত আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভূগোলের সম্পর্ক, ইতিহাসের সম্পর্ক, নদীর সম্পর্ক, সীমান্তের সম্পর্ক, নিরাপত্তার সম্পর্ক, বাণিজ্যের সম্পর্ক এবং মানুষের সম্পর্ক। কোনো সরকার, কোনো দল, কোনো মতাদর্শ এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারে না।

.
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো কূটনীতিকে অভ্যন্তরীণ বৈধতার সঙ্গে যুক্ত করা। বাইরে সম্মান পেতে হলে ভেতরে রাষ্ট্রকে বিশ্বাসযোগ্য হতে হয়। নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন, জবাবদিহি, অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা এবং ন্যায্য রাজনৈতিক পরিবেশ কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এগুলো পররাষ্ট্রনীতিরও সম্পদ।
.

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতকে এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়, আবার ভারতকেন্দ্রিক হয়ে থাকাও দীর্ঘ মেয়াদে যথেষ্ট নয়। কারণ, একটি রাষ্ট্রের কূটনীতি কেবল প্রতিবেশীনির্ভর হলে তার কৌশলগত পরিসর সংকুচিত হয়; আবার প্রতিবেশীকে অস্বীকার করলে তার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়ে।

গত এক দশকের অভিজ্ঞতা আমাদের একটি শিক্ষা দিয়েছে। অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা দলকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রকে কখনো কখনো বন্ধুহীনতার দিকে ঠেলে দেয়। কোনো একটি শক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা যদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বদলে রাজনৈতিক টিকে থাকার উপকরণে পরিণত হয়, তবে অন্য অংশীদারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

আবার অভ্যন্তরীণ বৈধতার সংকট থাকলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কও দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর দৃঢ় শোনালেও তার নৈতিক ও কূটনৈতিক ভিত্তি ভঙ্গুর থাকে। পররাষ্ট্রনীতি তখন রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের বদলে ক্ষমতার তাৎক্ষণিক রক্ষাকবচে পরিণত হয়। এর ফল হয় দ্বিমুখী—বাইরে অবিশ্বাস, ভেতরে সন্দেহ।

.প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ও সামনের কূটনীতি.

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বন্ধুহীনতার অনুভূতি কাটিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতার পুনর্গঠন। এই পুনর্গঠন উচ্চকণ্ঠে হয় না; হয় সংযমে, নিয়মিত সংলাপে, নীতির ধারাবাহিকতায় এবং অংশীদারদের আশ্বস্ত করার মাধ্যমে। বাংলাদেশকে এখন বলতে হবে, আমরা কারও বিরুদ্ধে নই, আমরা আমাদের পক্ষে। আমরা কোনো বলয়ের অন্ধ অনুগামী নই, আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থের সচেতন রক্ষক।

আমাদের ভারতকে প্রয়োজন, চীনকেও প্রয়োজন, আসিয়ান-সংশ্লিষ্ট অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক চাই, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও শ্রমবাজারভিত্তিক সম্পর্ক চাই, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও গণতান্ত্রিক সহায়তার সম্পর্ক চাই। এই বহুমুখিতা কোনো দোদুল্যমানতা নয়; বরং ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রের পরিণত কৌশল।

এই জায়গা থেকেই বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ-চীন সফরকে দেখা যেতে পারে। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বন্ধুরাষ্ট্র নয়, এটি বাংলাদেশের শ্রমবাজার, প্রবাসীকল্যাণ, দক্ষতা রপ্তানি, শিক্ষা, হালাল অর্থনীতি, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা।

.গণ–অভ্যুত্থানের প্রধান দাবি প্রাণের অধিকারই উপেক্ষিত হল.

বাংলাদেশের লাখো শ্রমিকের জীবন, আয়, মর্যাদা ও নিরাপত্তা মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। ফলে মালয়েশিয়ার সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা কোনো প্রতীকী সফর নয়; এটি মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত কূটনীতি। যে কূটনীতি শ্রমিককে শুধু রেমিট্যান্স উৎপাদক হিসেবে দেখে না, বরং নাগরিক মর্যাদার বাহক হিসেবে দেখে, সেই কূটনীতিই আজ প্রয়োজন।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কও একইভাবে বাস্তবতার প্রশ্ন। চীন বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগী, অবকাঠামো অংশীদার, বাণিজ্যিক শক্তি এবং প্রযুক্তিগত সম্ভাবনার উৎস। কিন্তু চীনের সঙ্গে সম্পর্ক মানেই কোনো পক্ষ নেওয়া নয়।

বাংলাদেশের উচিত চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ, শিল্প, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, জলবায়ু অভিযোজন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং রপ্তানিবৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা, একই সঙ্গে ঋণের শর্ত, প্রকল্পের স্বচ্ছতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং অর্থনৈতিকভাবে কতটা টেকসই—এসব বিষয়ে সতর্ক থাকা। কূটনীতির ভাষায় বন্ধুত্ব মানে অন্ধ আস্থা নয়, বন্ধুত্ব মানে পারস্পরিক স্বার্থের পরিণত ব্যবস্থাপনা।

.ঢাকা-বেইজিং ঘনিষ্ঠতার সুযোগ ও ঝুঁকির হিসাব-নিকাশ.

এখানেই সরকার-টু-সরকার আলোচনার গুরুত্ব। রাষ্ট্রীয় আলোচনায় যা হয়, তা সব সময় দৃশ্যমান নয়। সংবাদমাধ্যমে হয়তো দেখা যায় হাসিমুখ, করমর্দন, যৌথ বিবৃতি, কয়েকটি সমঝোতা স্মারক। কিন্তু এর নিচে থাকে বহুস্তরীয় আলোচনার স্রোত।

শ্রমবাজারে নিয়োগ ব্যয় কমানো যায় কি না, ভিসা সহজ করা যায় কি না, রপ্তানি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো যায় কি না, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ রাখা যায় কি না, সীমান্তে উত্তেজনা কমানো যায় কি না, অভিবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় কি না, শিক্ষার্থী ও গবেষণা বিনিময় বাড়ানো যায় কি না, ঋণের শর্ত পুনর্বিবেচনা করা যায় কি না—এসবই সরকার-টু-সরকার আলাপের অংশ। একটি সফর কখনো শুধু একটি সফর নয়, এটি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের ভাষা।

তবে এই ভাষা ব্যবহারে সতর্কতা দরকার। বাংলাদেশ যদি মালয়েশিয়া বা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ায়, তা ভারতের বিরুদ্ধে বার্তা হিসেবে দেখানো উচিত নয়। আবার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নও চীন বা অন্য অংশীদারদের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হওয়া উচিত প্রতিযোগিতামূলক ভূরাজনীতিতে সংঘর্ষ নয়, সুবিধাজনক ভারসাম্য; নির্ভরতা নয়, পরিসর বৃদ্ধি; আবেগ নয়, বাস্তববাদ এবং গোপন আনুগত্য নয়, স্বচ্ছ জাতীয় স্বার্থ।

.

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো কূটনীতিকে অভ্যন্তরীণ বৈধতার সঙ্গে যুক্ত করা। বাইরে সম্মান পেতে হলে ভেতরে রাষ্ট্রকে বিশ্বাসযোগ্য হতে হয়। নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন, জবাবদিহি, অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা এবং ন্যায্য রাজনৈতিক পরিবেশ কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এগুলো পররাষ্ট্রনীতিরও সম্পদ। যে রাষ্ট্র ভেতরে আত্মবিশ্বাসী, সে বাইরে মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারে। যে রাষ্ট্র ভেতরে বিভক্ত ও অবিশ্বাসে আক্রান্ত, সে বাইরে প্রভাবশালী দেখালেও আলোচনার টেবিলে দুর্বল থাকে।

বাংলাদেশ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পুরোনো সাহায্যনির্ভর কূটনীতি থেকে বেরিয়ে এসে মর্যাদাভিত্তিক অংশীদারত্বের কূটনীতি গড়তে হবে। সংযত, বাস্তববাদী ও মর্যাদাপূর্ণ কূটনীতিই বাংলাদেশের আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

  • ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ ব্রুনেইয়ের ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালামের আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা ও অভিবাসন বিষয়ে অধ্যাপক

    [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব