সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতক ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অসংখ্য মানুষ এটি শেয়ার করছেন। কেউ বিস্ময় প্রকাশ করছেন, কেউ প্রশংসা করছেন, আবার কেউ বলছেন, ‘পরীক্ষার প্রশ্নও এত সুন্দর হতে পারে!’
প্রশ্নপত্রটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয়, এটি কেবল একটি ভর্তি পরীক্ষা নয়; বরং একজন শিক্ষক তাঁর সামনে বসা একজন তরুণকে বলছেন, ‘এসো, তোমার মতো করে পৃথিবীটাকে আমাকে বোঝাও।’
প্রশ্নগুলোর ধরন লক্ষ্য করার মতো। সেখানে জানতে চাওয়া হয়েছে— ‘সাহিত্যে পড়া বা সিনেমায় দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী নারী চরিত্র।’, ‘তোমার ছোটবেলার ইচ্ছেগুলো, থমকে যাওয়াগুলো।’, ‘ঈশ্বরকে যদি পাঁচটি প্রশ্ন করার সুযোগ পেতে...’, ‘যে বইটি তোমার প্রিয়জনকে উপহার দিতে চাও।’, ‘প্রিয় সাহিত্যিকের উদ্দেশে লেখা তোমার খোলা চিঠি।’ এবং ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সুখের কথা, ভয়ের কথা।’
একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কী জানা প্রয়োজন, তার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত এই প্রশ্নপত্র। এখানে কোনো কবিতার রচনাকাল, লেখকের জন্মসাল, বইয়ের প্রকাশকাল কিংবা সংজ্ঞার হুবহু মুখস্থ বিদ্যার কথা জিজ্ঞেস করা হয়নি। বরং প্রশ্নগুলো জানতে চেয়েছে— তুমি কী ভাবো? তুমি কী অনুভব করো? তোমার ভাষা কতটা জীবন্ত? তুমি পৃথিবীকে কীভাবে দেখো?
বিশ্ববিদ্যালয় কেবল তথ্য শেখার জায়গা নয়, বরং প্রশ্ন করতে শেখার স্থান। তাই ভর্তি পরীক্ষা হওয়া উচিত একজন মানুষের কৌতূহল, ভাষাবোধ, কল্পনাশক্তি ও যুক্তিবোধ যাচাইয়ের একটি প্রবেশদ্বার। তবে দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সেখানে সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায় তথ্যের মুখস্থিকরণ। কোন সালে কী ঘটেছে বা কোন সংজ্ঞার নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে— শিক্ষার্থীর চিন্তার চেয়ে স্মৃতিশক্তিকে এখানে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মৌলিক জ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য ও ব্যাকরণ অবশ্যই জরুরি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় যদি কেবল মুখস্থ করার ক্ষমতাই যাচাই করে, তবে সৃজনশীল মানুষগুলো কোথায় নিজেদের প্রকাশ করবে? যাদবপুরের প্রশ্নপত্রের বিশেষত্ব হলো, এখানে কোনো একটিমাত্র সঠিক উত্তর নেই; বরং রয়েছে অসংখ্য সম্ভাব্য উত্তর। একই বিষয়ে একশ জন শিক্ষার্থী লিখলে একশটি ভিন্ন লেখা পাওয়া যাবে। আর এখানেই একজন লেখক, গবেষক বা চিন্তাশীল মানুষের জন্মের ইঙ্গিত লুকিয়ে থাকে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘকাল ধরে এমন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে যেখানে আমরা উত্তর মুখস্থ করি, কিন্তু প্রশ্ন করতে শিখি না। ফলে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেলেও নিজের মত প্রকাশে আমরা দ্বিধাবোধ করি। অথচ বিশ্বের নামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন মানুষই খোঁজে, যারা নতুনভাবে ভাবতে পারে, প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং একটি বই পড়ে নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে পারে।
একটি উদাহরণ দেওয়া যায়— একজন শিক্ষার্থীকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ‘তোমার ছোটবেলার ইচ্ছেগুলো কোথায় হারিয়ে গেল?’, তবে সে নিজের জীবনের গল্প বলবে, যেখানে ভাষার সৌন্দর্য ও সাহিত্যবোধ থাকবে। সেখানে পরীক্ষক একজন মানুষকে চিনতে পারবেন। কিন্তু ‘অমুক গ্রন্থের প্রকাশকাল কত?’— এমন প্রশ্নে কেবল একটি তথ্য পাওয়া যাবে। বর্তমান যুগে একটি মুঠোফোনই কয়েক সেকেন্ডে সব তথ্য দিতে পারে, কিন্তু মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি বা সুন্দর বাক্য কোনো সার্চ ইঞ্জিন তৈরি করতে পারে না।
তবে এই তুলনার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্ন এক নয়, অনেক বিভাগেই সৃজনশীল প্রশ্ন করার চেষ্টা করা হয়। তেমনি ভারতের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নও যাদবপুরের মতো নয়। এটি মূলত দুটি ভিন্ন শিক্ষাদর্শনের পার্থক্য। একটি বিশ্বাস করে স্মৃতিশক্তিই বড় যোগ্যতা, অন্যটি মনে করে চিন্তার ক্ষমতাই সবচেয়ে বড় সম্পদ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে তথ্যের অভাব নেই, বরং নতুনভাবে ভাবতে পারা এবং সৃজনশীলভাবে নিজেকে প্রকাশ করার ক্ষমতাই সবচেয়ে মূল্যবান। তাই আগামী দিনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিতে হবে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও যেন ধীরে ধীরে এমন প্রশ্ন তৈরির দিকে এগিয়ে যায়, যেখানে শিক্ষার্থীকে কেবল তথ্যের ভান্ডার হিসেবে নয়, বরং একজন চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে দেখা হবে। এমন প্রশ্ন, যার উত্তর দিতে বইয়ের পাশাপাশি নিজের জীবন ও অনুভূতির প্রয়োজন হবে এবং যার কোনো গাইডবই থাকবে না। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় যদি কৌতূহলী মানুষ তৈরি করতে না পারে, তবে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
যাদবপুরের প্রশ্নপত্রটি কেবল তার ভিন্নতার জন্য ভাইরাল হয়নি, বরং এটি মনে করিয়ে দিয়েছে যে পরীক্ষাও সুন্দর হতে পারে, প্রশ্নও সাহিত্য হতে পারে। এটি একজন তরুণকে ভাবতে ও নিজের ভেতরের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে উৎসাহিত করে। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ভবিষ্যতের নাগরিক নয়, বরং ভবিষ্যতের চিন্তক তৈরি করে, আর একজন চিন্তকের জন্ম শুরু হয় একটি ভালো প্রশ্ন থেকে।
শিক্ষা মানে শুধু উত্তর জানা নয়, বরং এমন প্রশ্নের সামনে দাঁড়ানো যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে। যাদবপুরের এই প্রশ্নপত্র আমাদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করেছে— আমরা কি এখনো এমন শিক্ষা চাই যেখানে মুখস্থ করা মানুষ বেশি দরকার, নাকি এমন শিক্ষা চাই যেখানে ভাবতে জানা মানুষ বেশি দরকার?
আশা করা যায়, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও একদিন এমন প্রশ্ন করবে, যখন ভর্তি পরীক্ষা কেবল প্রবেশের দরজা হবে না, বরং স্বাধীনভাবে ভাবতে শেখার প্রথম পাঠ হয়ে উঠবে।
(লেখক: মো. আব্বাস, বর্তমানে করপোরেট কমিউনিকেশনে কর্মরত। মতামত লেখকের নিজস্ব।)






