মৌসুমি নিম্নচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলোতে ভারী ও অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে সাতজন এবং রাঙামাটিতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আগামী এক সপ্তাহ এই বৃষ্টির প্রবণতা বজায় থাকতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট যে, টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসসহ বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা থাকে। তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
মুক্তকণ্ঠের খবর অনুযায়ী, রোববার দিবাগত রাতে কক্সবাজারের পৌর এলাকা এবং উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং ও জামতলি আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বালুখালী ও জামতলি আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসে দুই পরিবারের সাত সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছেন মিয়ানমারের রাখাইন থেকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। ২০১৭ সালের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে আশ্রয় নেওয়া এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বর্তমানে ১৪ লাখ ছাড়িয়েছে। পাহাড় কাটা এবং বনভূমি ধ্বংস করে বসতি গড়ে তোলার ফলে রোহিঙ্গা শিবিরে পাহাড়ধস ও মৃত্যু প্রতিবছরের নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে সেখানে পাহাড়ধসে ১১৩ জন মারা গেছেন।
বর্তমানে ৩৩টি রোহিঙ্গা শিবিরে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ এক হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হলেও, ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ঝুঁকিতে থাকা বাকি সবাইকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।
দুর্যোগের প্রভাব শুধু রোহিঙ্গা শিবিরে সীমাবদ্ধ নয়; কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য জেলাগুলোতেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে এবং কক্সবাজারের ৩৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পার্বত্য তিন জেলায় নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে শাহ আমানত বিমানবন্দরে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট অবতরণ করতে পারেনি। খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের একাধিক স্থান তলিয়ে যাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে এবং বান্দরবানে পর্যটকেরা আটকা পড়েছেন।
নির্বিচার পাহাড় কাটা এবং প্রাকৃতিক বন উজাড় করাকে পাহাড়ধসের প্রধান দুটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থানীয় প্রজাতির গাছ কেটে সেগুনসহ বিভিন্ন বনজ ও ফলদ গাছের বাগান করার ফলে পাহাড়ের মাটি ক্ষয় হয়েছে এবং পাহাড়গুলো নাজুক হয়ে পড়েছে। ফলে ভারী বৃষ্টি হলেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েক দিন ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে, তাই এই মুহূর্তে সমন্বিত প্রস্তুতি ও আগাম সতর্কতা অত্যন্ত জরুরি। গত দুই দশকে পাহাড়ধসের বড় মানবিক বিপর্যয়গুলোর সিংহভাগই ঘটেছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলায়। এর মধ্যে ২০০৭ সালে ১০৭ জন এবং ২০১৭ সালে প্রায় ১৬০ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল।
প্রশাসনের আগাম সতর্কতায় পাহাড়ধসে প্রাণহানির সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই কেবল মাইকিং করে সতর্ক করা যথেষ্ট নয়, বরং বাধ্যতামূলকভাবে নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি বন্যা ও বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনের বিষয়েও সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া উচিত।






