সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোজ কত–কী দেখি আমরা! প্রতিটি স্ক্রল মানেই নতুন নতুন স্ট্যাটাস কিংবা ভিডিও। এত তথ্য একের পর এক সামনে ভেসে আসে যে অনেক সময় মগজে থামে কেবল ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা—মনে হয় মুহূর্তেই মরে যায়, পরের স্ক্রলেই মিলিয়ে যায়। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে অনলাইনের স্মৃতির আয়ু যে খুবই কম, তা বলাই বাহুল্য।
তবে কিছু দৃশ্য মানুষ সহজে ভুলতে পারে না। যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বাগেরহাটের খানজাহান আলীর মাজারের কাছে একটি কুমিরকে জীবন্ত কুকুর খাওয়ানোর দৃশ্য। কুকুরটি অসহায়ের মতো ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে—এ সময় মানুষ বাধা দেয়নি; বরং উল্লাসের সঙ্গে দেখেছে। এমন নিষ্ঠুরতার দৃশ্য আশপাশের মানুষদের চোখে পড়েনি বলা যায়, কিন্তু তা নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছে।
এর বাইরে আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কুকুরের লেজে ইট বেঁধে পানিতে ফেলা হয়েছে। পানিতে ফেলার পর কুকুরটি বাঁচার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। কিন্তু তার বেঁচে ওঠার চেষ্টা অনেকের কাছে কেবল বিনোদন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাদের উচিত ছিল বাঁচানো, তারা বাঁচানোর বদলে কুকুরটির ছটফট করা দেখেই নিজেদের উত্তেজনাকে খুশিতে পরিণত করতে বেশি ব্যস্ত ছিল। এখানে আরেকটি লক্ষণীয় দিকও থাকে—এই কাজটি করার সময় কুকুরটি মানুষকে বাধা দেয়নি। কুকুরটি মানুষের প্রতি বিশ্বাস রেখেছিল; পরম বিশ্বাসে ইট বাঁধতে দিয়েছে। আঘাত করে পালিয়ে যেতে চায়নি, দৌড়ে সরে যায়নি।
এই ভিডিওগুলো দেখার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—কীভাবে একজন মানুষ এমন করতে পারে? আরও বড় প্রশ্ন, যারা এসব দৃশ্য দেখে আনন্দ পায়, ভিডিও ধারণ করে বা নীরবে থাকে—তাদের ভেতর থেকে মানবিকতার জায়গা কি ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে না? এবং সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো, তারা তো আমাদেরই আশপাশের মানুষ; তাদের সঙ্গে সহাবস্থান কতটা নিরাপদ?
যেদিন পানিতে ডুবে কুকুরটি মারা গিয়েছিল, সেদিন শুধু একটি প্রাণী মারা যায়নি—যেন আমাদের ভেতরের মানুষটাও আরও একটু শূন্যতার দিকে হেঁটে যায়। একের পর এক এমন ঘটনা আমাদের ভেতরে মানবিকতার সামান্য অংশও আর ধরে রাখতে পারবে না—এই আশঙ্কা জাগে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা এসব ঘটনার আলোচনা থামে না। বাস্তব জীবনেও প্রাণীর প্রতি নৃশংসতার প্রসঙ্গ উঠে আসে। প্রাণীর প্রতি সহিংসতার আলাপে আমাদের অনেকেরই থাকে এক ধরনের অজুহাত—‘এটা তো শুধু একটা প্রাণী।’ আবার কেউ কেউ এটাকে আরও ছোট করে দেখে, ‘ইতর প্রাণী’ বলে। কিন্তু পৃথিবীতে ‘শুধু’ বলে কোনো কিছু আছে কি? যে পাখিটি আকাশে উড়ে, যে কুকুরটি রাস্তায় ঘুমায়, যে বিড়ালটি খাবারের আশায় মানুষের দিকে তাকায়, যে গাছটি আমাদের নিশ্বাসের জন্য অক্সিজেন তৈরি করে—সবাই এই পৃথিবীর একজন বাসিন্দা।
আমরা জমি কিনে রেজিস্ট্রেশন করে আকাশ-বাতাস কিনে নিতে পারি না; সবকিছুর ওপর শতভাগ অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হয় না। ঠিক এভাবেই প্রাণীদেরও অধিকার আছে। যে সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, একই সৃষ্টিকর্তারই সৃষ্টি তারা।
প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা মূলত প্রাণীদের বিরুদ্ধে নয়—এটা দুর্বলের বিরুদ্ধে। ক্ষুধার জ্বালায় কুকুর চিৎকার করলে তার খাবারের ব্যবস্থা না করে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা হয়, যেন ঝামেলাই শেষ হয়ে যায়। রাস্তার ‘দুর্বল’ কুকুরই তো। কিন্তু একই সমাজে এলাকার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সারা রাত লাউডস্পিকারে গান বাজালে আমাদের সহ্য করা ছাড়া উপায় থাকে না—কারণ তিনি ক্ষমতাবান। প্রতিবাদ করার সক্ষমতাই যেন থাকে না।
দুর্বলের ওপর হামলা চালাতে গিয়ে আমরা ভাবি না—আমরাও তো কোনো না কোনো সময় কারও কাছে দুর্বল হয়ে পড়ি। আজ রাস্তার কুকুরটি আমার চেয়ে দুর্বল, তাই দয়া-ভরসার দিকে তাকিয়ে থাকে সে। আগামীকাল হয়তো একই জায়গায় থাকবে একজন পথশিশু, একজন বৃদ্ধ বাবা, একজন অসুস্থ মা, একজন প্রতিবন্ধী মানুষ কিংবা একজন দরিদ্র ভিক্ষুক। আবার একদিন হয়তো আমিও বা আপনি—কারও না কারও কাছে দুর্বল অবস্থায় থাকব। দুর্বল হলেই সবল কর্তৃক অত্যাচারের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকবে—এমন রীতির শিকার আমরা নিজেরাও হই। আমাদের সমাজে তার চিহ্ন নিয়মিতভাবেই দেখা যায়।
নিষ্ঠুরতা কখনো এক দিনে জন্মায় না। এটি শুরু হয় খুব ছোট একটি জায়গা থেকে, অনেক সময় নিজের অজান্তেই। যখন একটি শিশু দেখে, বড়রা একটি কুকুরকে লাথি মারছে, একটি বিড়ালকে পাথর ছুড়ে আঘাত করছে, একটি পাখির ডানা ভেঙে হাসছে, তখন সে শুধু একটি ঘটনা দেখে না; সে একটি শিক্ষা পায়, ‘যে দুর্বল, তাকে আঘাত করা যায়। এমনকি এটি আনন্দের, উপভোগের বিষয়।’
দুর্বল হওয়া কোনো অপরাধ নয়। অপরাধ হয় দুর্বলকে কষ্ট দিয়ে নিজের শক্তি প্রমাণ করতে গেলে। দুর্বলকে নির্যাতন করে আমরা অনেক সময় আসলে আমাদের অন্তর্নিহিত দুর্বলতাকেই সামনে আনছি—এ কথা বোঝা জরুরি।
নিষ্ঠুরতা কখনো এক দিনে জন্মায় না। এটি শুরু হয় খুব ছোট একটি জায়গা থেকে, অনেক সময় নিজের অজান্তেই। যখন একটি শিশু দেখে, বড়রা একটি কুকুরকে লাথি মারছে, একটি বিড়ালকে পাথর ছুঁড়ে আঘাত করছে, একটি পাখির ডানা ভেঙে হাসছে, তখন সে শুধু একটি ঘটনা দেখে না; সে একটি শিক্ষা পায়, ‘যে দুর্বল, তাকে আঘাত করা যায়। এমনকি এটি আনন্দের, উপভোগের বিষয়।’
এই শিক্ষাই পরে স্কুলের তুলনামূলক শান্ত-ভদ্র ছাত্র বা মেয়েেদের প্রতি বুলিংয়ের মতো আচরণে ফিরে আসে। তারা বড় হয়ে পরিবারে পারিবারিক সহিংসতা সৃষ্টি করতে পারে; সমাজে ক্ষমতার অপব্যবহারও দেখা দিতে পারে; রাষ্ট্রে অন্যায়ও জায়গা পেতে পারে। কারণ—
নিষ্ঠুরতার ভাষা একটাই—শুধু শিকারের মুখ বদলে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও নেতিবাচক বিষয় ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তির এই যুগে অমানবিকতার চর্চা যত বাড়ছে, মানবিকতার চর্চা তত বাড়ছে না—এ বাস্তবতা সামনে আসে। তবু দিন শেষে মানুষ পাশের মানুষকেই মানবিক অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ হিসেবেই দেখতে চায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই বার্তাই দেয়, প্রতিদিন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল একটি ভিডিও নিয়ে প্রথমে তথ্যগত ভ্রান্তি ছিল—শুরুতে মানুষ মনে করেছিল ভিডিওটা বাংলাদেশের, কিন্তু পরে জানা গেল এটি শ্রীলঙ্কার। গ্রামে জমির আল ধরে একটি বাচ্চা মেয়ে একটি বিড়াল কোলে নিয়ে মনের আনন্দে হাঁটছে আর তার পেছনে হাঁটছে একটি শজারু।
দুটি প্রাণীর সঙ্গে একটি মানবশিশুর এই অসাধারণ সম্পর্ক দেখে ভীষণ আপ্লুত হলো দেশের নেটিজেনরা। বিশ্বাস করা হচ্ছে, এই ভিডিও শ্রীলঙ্কার হলেও শুরুতেই এটা জানা থাকলে মানুষ একইভাবেই আপ্লুত হতো। শুধু সেটাই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই পৃথিবীর নানা দেশে মানুষের সঙ্গে প্রাণীর সখ্য, প্রাণীর প্রতি মানবিক আচরণের ভিডিও এই দেশের অসংখ্য মানুষ দেখে, শেয়ার করে।
এটা পরিবেশের বিষয়, চর্চার বিষয়। সেই পরিবেশ কীভাবে তৈরি করা যায়, কী কী চর্চা বাড়িয়ে দিতে হবে—এসব নিয়ে আলোচনা চলতে পারে। দিন শেষে আমরা কেউই বিচ্ছিন্ন নই। বিচ্ছিন্ন থেকে যা ইচ্ছা তা–ই করার মাশুল কী হতে পারে—সেটাই এর মধ্যেই ভালোভাবে দেখা গেছে। নিজেদের স্বার্থে হলেও এই পৃথিবীতে সবাইকে নিয়েই আমাদের থাকতে হবে; দেয়ার ইজ নো প্ল্যানেট বি।
ড. ফারজানা আলম শিক্ষক, প্রশিক্ষক, উদ্যোক্তা
মতামত লেখকের নিজস্ব






