যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সন্দেহ ও ভয়ের মাত্রা দ্রুত বাড়ছে। চ্যাটবটের ব্যবহার যত বাড়ছে, তার চেয়েও দ্রুত গতিতে বাড়ছে এই উদ্বেগ। পিউ রিসার্চ সেন্টারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে মার্কিন নাগরিকদের ৩৭ শতাংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উচ্ছ্বাসের চেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ শতাংশে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তবয়স্কদের একটি বড় অংশ মনে করেন, এআই তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন এবং সামগ্রিক সমাজের ওপর ইতিবাচক প্রভাবের চেয়ে নেতিবাচক প্রভাব বেশি ফেলবে।

ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো কোম্পানিগুলো শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করলেও তারা এখনো নগদ প্রবাহের দিক থেকে লাভজনক নয়। এক ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি মূল্যায়নকে যুক্তিযুক্ত করতে হলে তাদের ব্যবহারকারী ও আয় বাড়াতে হবে এবং সরকারি সংস্থা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের পণ্য গ্রহণে রাজি করাতে হবে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত বেশি অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনের অংশ হবে, ততই জনমতের গুরুত্ব বাড়বে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়লে তারা কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি তোলেন। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর ব্যাংক খাত এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিল। আবার ২০১১ সালে ফুকুশিমা পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর জনবিরোধিতার মুখে জার্মানি তার সব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে জীবপ্রযুক্তির প্রতি আস্থা থাকলেও দশকের শেষে ইউরোপের দেশগুলো জিনগতভাবে পরিবর্তিত খাদ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা বিবেচনা করে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৪ সালে ৩৭ শতাংশ মানুষ এসব খাদ্য নিরাপদ মনে করলেও ২০২০ সালে তা নেমে আসে ২৭ শতাংশে। অথচ আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সে জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৮৮ শতাংশ বিজ্ঞানী এসব খাদ্যকে নিরাপদ বলেছেন।

টিকার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ২০০১ সালে ৬৪ শতাংশ মার্কিন নাগরিক টিকাকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ মনে করলেও ২০২৪ সালে এই হার নেমে এসেছে ৪০ শতাংশে। এটি প্রমাণ করে যে, মানুষের বিশ্বাস শুধু বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর নয়, বরং প্রযুক্তিটি কতটা নিরাপদ এবং দায়িত্বশীলভাবে ব্যবস্থাপিত হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে। অনেক টিকা-সন্দেহবাদী মনে করেন, ওষুধ কোম্পানিগুলো নিরাপত্তার চেয়ে মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেয় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো শিল্প খাতের প্রভাবাধীন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও এখন একই ধরনের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সাধারণ মানুষ বড় ভাষা মডেলের কার্যপদ্ধতি বা মেশিন লার্নিংয়ের নিরাপত্তা দাবি যাচাই করতে না পারলেও তাঁদের ভয়, এই প্রযুক্তি চাকরি কেড়ে নেবে, নজরদারির কাজে ব্যবহৃত হবে এবং এর সুফল কেবল ক্ষমতাবানদের হাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এই আশঙ্কাগুলো অমূলক নয়, কারণ এআই-এর বড় প্রতিশ্রুতি দক্ষতা বৃদ্ধি, যার অর্থ অনেক ক্ষেত্রে কর্মী ছাঁটাই। পাশাপাশি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনায় অভিভাবকদের মামলার অভিযোগও উঠেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এআই সম্পর্কে মানুষের মনোভাব নির্ভর করে সরকার, নিয়োগকর্তা এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দায়িত্বশীলতার ওপর। যারা শাসনব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখেন, তারা বিশেষজ্ঞদের মতামত ও নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বেশি আগ্রহী হন। এ কারণেই দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, নাইজেরিয়া ও সুইডেনের মতো দেশে মানুষ এই প্রযুক্তি নিয়ে বেশি আশাবাদী। ২০২৬ সালের এডেলম্যান ট্রাস্ট ব্যারোমিটারের তথ্য অনুযায়ী, এসব দেশের অন্তত অর্ধেক মানুষ বিশ্বাস করেন যে তাঁদের সরকার সঠিক কাজ করবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে এই আস্থা মাত্র ৩৯ শতাংশ।

নাগরিকেরা সরকারের ওপর আস্থা হারালে তারা রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর দিকে ঝুঁকে পড়েন, যা কোভিড-১৯ মহামারির সময় স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। এই বিভাজন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করে। তাই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর উচিত নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে মিলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণকাঠামো তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কিছু কোম্পানি উল্টো প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।

এর একটি উদাহরণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগের সরাসরি কর ফাইলিং ব্যবস্থা বাতিল করা। "এ ব্যবস্থার মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকেরা বিনা খরচে অনলাইনে কর জমা দিতে পারতেন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীন সরকারি দক্ষতা বিভাগ এটি বাতিল করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিভাজন যতই তীব্র হোক, করব্যবস্থার জটিলতা নিয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই পক্ষের মধ্যেই অসন্তোষ রয়েছে।"

বেসরকারি কর প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষায় এই উদ্যোগ সরকারের প্রতি মানুষের আস্থাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যেখানে সাবেক প্রধান ইলন মাস্কের ভূমিকা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এখন এই ব্যক্তিরাই মার্কিন নাগরিকদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছেন। তবে তাঁরা হয়তো বুঝতে পারবেন, সরকারের প্রতি আস্থা দুর্বল করে তারা নিজেরাই এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছেন, যেখানে মানুষ এআই-এর প্রতি আরও বেশি প্রতিরোধী হয়ে উঠছে।

(নাইরি উডস, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লাভাটনিক স্কুল অব গভর্নমেন্টের ডিন। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ)