টানা ভারী বৃষ্টিপাত এবং পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলে কক্সবাজার জেলার ৯টি উপজেলার অন্তত ৩৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এর ফলে রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় হাজারো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে পাহাড়ধস ও ঘরধসের ঘটনায় আট রোহিঙ্গাসহ ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, মঙ্গলবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত preceding ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে এবং বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে রামু ও চকরিয়ার অন্তত ১৪টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে, যেখানে কয়েক শ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার পৌরসভা, টেকনাফ, উখিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, ঈদগাঁও ও কুতুবদিয়ার নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে। রোববার দিবাগত রাতে একাধিক পাহাড়ধসের ঘটনায় আশ্রয়শিবিরে আটজন রোহিঙ্গা এবং কক্সবাজার শহরের এক বাসিন্দা নিহত হন। পাশাপাশি পেকুয়া উপজেলায় মাটির ঘর ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান গতকাল রাত সাড়ে নয়টায় মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "বৃষ্টি কমে আসায় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকি বিবেচনায় কক্সবাজার শহর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা থেকে অন্তত এক হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় মাইকিং ও প্রচারণার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হচ্ছে।"
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান সতর্ক করে জানিয়েছেন, আগামী দুই দিন আরও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে, যা পাহাড়ধস ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
বৃষ্টির প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে টেকনাফ উপজেলা। এখানকার হ্নীলা, হোয়াইক্যং, সদর, সাবরাং ও বাহারছড়া ইউনিয়নের একাধিক গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দী। হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আলী জানান, "ভারী বৃষ্টিতে ইউনিয়নের অন্তত ৪০০ ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে। অনেক সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি আংশিক বা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।"
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মো. অনীক চৌধুরী বলেন, "উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।"
এদিকে উত্তাল সাগর ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এর ফলে দ্বীপের দুই এইচএসসি পরীক্ষার্থী টেকনাফে এসে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। জেলা প্রশাসন তাঁদের পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানিয়েছে এবং কোস্টগার্ডের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, "টানা পাঁচ দিন ধরে দ্বীপের সঙ্গে টেকনাফের যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতির কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় খাদ্যসংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।"
পৌর এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে হোটেল-মোটেল জোন, কলাতলী, সুগন্ধা, বাজারঘাটা, কালুর দোকান, তারাবনিয়াছড়া, আলীরজাহাল, বাস টার্মিনাল ও বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন সড়কগুলো তলিয়ে যাওয়ায় পর্যটক ও স্থানীয়রা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। এছাড়া কুতুবদিয়া উপজেলার লেমশীখালী-কৈয়ারবিল সড়কের একটি জরাজীর্ণ সেতু ধসে পড়ায় দুই এলাকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কৈয়ারবিল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. ফারুক জানান, দীর্ঘদিন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা সেতুটি সকালে হঠাৎ ভেঙে পড়লেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, "আগামী কয়েক দিন আরও ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। তাই পাহাড়ধসে আর কোনো প্রাণহানি যেন না ঘটে, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।"






