খুলনার কয়রা উপজেলার দশহালিয়া গ্রামে উপকূল রক্ষার বেড়িবাঁধ নিয়ে ফের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বারবার সংস্কারের পরও বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, যে বাঁধে কাজ চলছে, সেই বাঁধই কেটে বসানো হচ্ছে চিংড়িঘেরে লোনাপানি নেওয়ার পাইপ—ফলে সংস্কারকাজের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

চার বছর আগের সেই দুর্যোগের স্মৃতি এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় দশহালিয়া গ্রামের বাসিন্দাদের। ২০২১ সালে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের পর কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। ওই সময় দেখতে এসে এলাকাবাসীর ক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য (এমপি)। পরে সরকারি অর্থায়নে বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হয় এবং নদীতীরে হাজার হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হয়।

স্থানীয়ভাবে প্রত্যাশা ছিল, সংস্কারের পর অন্তত কয়েক বছর উপকূল কিছুটা নিশ্চিন্ত থাকবে। কিন্তু চার বছরের মধ্যেই আবার বাঁধে ধসের ঘটনা ঘটেছে। নতুন করে সংস্কারকাজও শুরু হয়েছে। তবে বাঁধ কর্তন করে লোনাপানি নেওয়ার পাইপ বসানোর অভিযোগ ওঠায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা বলছেন, কাজ শুরুর আগে তাঁরা বাঁধে থাকা সব অবৈধ পাইপ অপসারণ করেছিলেন। তবে ঘেরের মালিকেরা আবার পাইপ বসিয়েছেন—এমন অবস্থায় নতুন করে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বলছেন তাঁরা। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বক্তব্য, বাঁধ ছিদ্র করে পাইপ বসানোর সুযোগ নেই এবং এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পাউবো সূত্রে জানা যায়, দশহালিয়া লঞ্চঘাটসংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধে জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের জন্য দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ৭৫ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২২ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ নদীতীরে ফেলা হবে। একই সঙ্গে পাশের ২৪০ মিটার বাঁধ সংস্কার, মাটি ভরাট ও জিও ব্যাগ বসানোর জন্য ২৫ লাখ টাকার আরেকটি প্রকল্পের কাজ চলছে। দরপত্রের মাধ্যমে ‘আমিন অ্যান্ড কোম্পানি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি পেয়েছে।

গত শনিবার দশহালিয়া গ্রামে সরেজমিন দেখা যায়, প্রায় ৩০০ মিটার এলাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ নদীতে ধসে পড়েছে। আরও প্রায় ২০০ মিটার বাঁধ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে স্থানীয়দের পর্যবেক্ষণ। কোথাও জিও ব্যাগ নদীতে বিলীন হওয়া এবং কোথাও নদীর স্রোত সরাসরি বাঁধে আঘাত করার চিত্রও দেখা গেছে। ২৪০ মিটার অংশে সংস্কারকাজ চললেও কাজ শেষ হওয়ার আগেই কয়েকটি স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। নতুন মাটি ফেলে বাঁধ উঁচু করা হয়েছে, পাশে জিও ব্যাগ রাখা হয়েছে—তবুও ঝুঁকি কাটছে না।

স্থানীয় বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘বাঁধ ভাঙলে কী দুর্ভোগে পড়তি হয়, আমরা বারবার দেখিছি। কিন্তু অবৈধভাবে বাঁধে পাইপ বসায়ে লোনাপানির ঘের করা ব্যক্তিরা সব সময়ই প্রভাবশালী।’ তাঁর অভিযোগ, প্রকল্প এলাকায় কাজের কোনো সাইনবোর্ডও নেই এবং কাজের মানও ভালো নয়। তিনি বলেন, বাঁধের ভোগান্তির কারণে মানুষ একসময় সংসদ সদস্যের দিকেও কাদা ছুড়ে মেরেছিলেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, সংস্কার চলা বাঁধের তিনটি স্থানে ছিদ্র করে বড় আকারের পাইপ বসানো হয়েছে। এসব পাইপ দিয়ে চিংড়িঘেরে লোনাপানি তোলা হচ্ছে বলে দেখা গেছে। একটি পাইপের ওপরের মাটি ধসে একটি খননযন্ত্র আটকে আছে। আরেকটি পাইপ মোটা রশি দিয়ে বাঁধা। তৃতীয় পাইপটির ওপর দিয়েই জিও ব্যাগসহ বাঁধের একটি অংশ নদীতে ধসে পড়েছে। ভাঙন ঠেকাতে বাঁশের খুঁটি পোঁতা হলেও তাতে কাজ হয়নি বলে স্থানীয়দের বক্তব্য।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল বাকী বলেন, সম্প্রতি প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে বাঁধ ছিদ্র না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, এবার তাঁরা কঠোর অবস্থানে যেতে চান এবং যাঁরা অবৈধভাবে বাঁধ কেটে লোনাপানি তুলছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাতীয় চিংড়ি নীতিমালা-২০১৪ অনুযায়ী, বেড়িবাঁধ কেটে বা ছিদ্র করে যত্রতত্র লোনাপানি প্রবেশ করানো যাবে না। নির্ধারিত কাঠামোর মাধ্যমে পানি নিতে হবে এবং ঘেরমালিকদেরই বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও দশহালিয়ায় বছরের পর বছর অবৈধভাবে বাঁধে পাইপ বসিয়ে লোনাপানি তোলার অভিযোগ উঠেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ঘেরমালিক বলেন, বাঁধসংলগ্ন লবণাক্ত জমিতে বেশির ভাগ সময় ফসল হয় না। মিঠাপানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় চিংড়ি চাষই তাঁদের প্রধান আয়ের উৎস। তাই ঘেরে নদীর লোনাপানি আনতে তাঁরা বাঁধে পাইপ বসাতে বাধ্য হন।

দশহালিয়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বাঁধের যে জাগায় পাইপ থাকবে, সে জাগায় ধস নামবেই। কাজ শেষ হবার আগেই যেভাবে এখন ফাটল দেখা যাতিছে, তাতে অল্প সময়ের মধ্যেই আরও বড় অংশ নদীতে চইলে যাবেনে।’

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মো. পলাশ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বাঁধের নিচে বসানো পাইপ অপসারণ না করায় টেকসইভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। পাইপের কারণে বাঁধের ঢাল বারবার ধসে পড়ছে এবং জিও ব্যাগও বসে যাচ্ছে। এ ছাড়া বাঁধের এক পাশে নদী, অন্য পাশে চিংড়িঘের থাকায় মাটির সংকটও আছে। বৃষ্টিতেও নতুন মাটি বসে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁরা সেগুলো নিয়মিত সংস্কার করছেন।

কাজ শুরুর আগে বাঁধের সব অবৈধ পাইপ অপসারণ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন দশহালিয়া বেড়িবাঁধের দায়িত্বে থাকা পাউবোর খুলনার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সোলাইমান হোসেন। তিনি বলেন, সংস্কারকাজ কিছুটা শেষ হওয়ার পর ঘেরের মালিকেরা আবার বাঁধ কেটে পাইপ বসিয়ে লোনাপানি ঢোকাচ্ছেন। ২৪০ মিটার বাঁধের সংস্কারকাজ ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, দশহালিয়া লঞ্চঘাটসংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আরেকটি প্রকল্পের আওতায় দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলা হবে। গত শুক্রবার দুপুরে অভিযান চালিয়ে কয়েকটি অবৈধ পাইপ অপসারণ করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট পাইপগুলোও পর্যায়ক্রমে অপসারণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি বিদেশ রঞ্জন মৃধা বলেন, অবৈধ পাইপ অপসারণের ঘোষণা বহুবার এলেও বাস্তবে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে প্রতিবছর সরকারি অর্থে বাঁধ সংস্কার হলেও ঘেরমালিকেরা নির্বিঘ্নে আবার পাইপ বসাচ্ছেন—এতে ভাঙনের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।