লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৬ সালের ৭ জুলাই মুক্তকণ্ঠর ‘সাহিত্য সাময়িকী’তে। তখনো মুক্তকণ্ঠ অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়নি, তাই এটি এত দিন শুধু ছাপা পত্রিকার পাতাজুড়েই ছিল। লেখাটি আজ প্রথমবারের মতো ‘অন্য আলো’র অনলাইন পাঠকের জন্য উপস্থাপন করা হলো।
.‘চৈত্র মাসের শেষে একদিন ফুটবল খেলিতে খেলিতে অপুর হাঁটুটা কিভাবে মচকাইয়া গিয়া সে মাঠে পড়িয়া গেল।...’ অপুর হাঁটু মচকানোর জন্য নয়, সম্ভবত বাহুল্যবোধে অপুর ফুটবল খেলার আর কোনো বিবরণ বিভূতিভূষণ ‘অপরাজিত’তে দেননি। কারণ অপুর দেওয়ানপুর গভর্নমেন্ট মডেল ইনস্টিটিউশনে কেবল নয়, ফুটবল তখন গোটা বাংলাদেশের স্কুলে স্কুলে সুপরিচিত সাধারণ খেলা। বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামের অপুরা তখন ফুটবল না পেলে বাতাবিলেবু দিয়েও ফুটবলচর্চা করে চলেছে। তখন তো শিল্ডের যুগ, শিল্ড বিজয়ী স্কুলের গেম টিচারের ‘থ্রি চিয়ার্স ফর’ এবং সঙ্গে ছাত্রদের ধুয়ো-‘হিপ হিপ হুররে’র হল্লা তখন শুধু শহরের স্কুলে নয়, গ্রামের স্কুলেও।
বাংলাদেশে ফুটবল এসেছে উনিশ শতকের শেষের দিকে। এ দেশের ফুটবল বিশারদদের মতে, উপমহাদেশে বাঙালিরাই ফুটবলচর্চার পথিকৃত। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকেই বাঙালি ফুটবলপাগল হয়ে উঠতে শুরু করে। প্রথমে পাগলামি শুরু হয় নিজেদের খেলা নিয়ে। তারপর দীর্ঘদিন বাদে এখন বাঙালি পাগল অন্যের ফুটবল খেলা দেখে। বিশ্বকাপের খেলা এলেই খবরের কাগজে শিরোনাম বেরোয় সারা দুনিয়ার সঙ্গে ফুটবলজ্বরে কাঁপছে বাংলাদেশ। ‘ফুটবলজ্বর’ হাল আমলের জার্নেলিজ শব্দ। তবে বেশ জুতসই। বাঙালি আগে প্রাণঘাতী ম্যালেরিয়ায় কাঁপত বলে তখনকার সাংবাদিকদের মাথায় ফুটবলজ্বর কথাটা আসেনি। অথবা মাথায় এলেও মর্মান্তিক রসিকতা হয়ে যাবে ভেবে কথাটা নিয়ে তাদের রিজার্ভেশন ছিল। তারা উত্তেজনা, উন্মাদনা ইত্যাদি শব্দ দিয়ে বাঙালির দুর্বার ফুটবলভাব প্রকাশ করতেন।
বাঙালির ফুটবলজ্বর হোমিওপ্যাথিক পরিভাষায় ‘ক্রনিক’ অর্থাৎ পুরোনো ও জটিল। বাঙালির বিশ্বকাপ-দর্শন তো সেদিনের ঘটনা। ফুটবলজ্বরের শুরু তারও আগে থেকে। এখন যেমন জার্মানি, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ইত্যাদি আগে ছিল মোহামেডান, ইস্ট বেঙ্গল, মোহনবাগান প্রভৃতি। নিজেদের খেলা নিয়ে এ দেশে ফুটবলজ্বরের সর্বশেষ প্রকোপ দেখা দিয়েছিল সম্ভবত আবাহনী-মোহামেডান-ব্রাদার্সের সময়ে। তারপর থেকে জ্বর কমে আসতে শুরু করে ক্রিকেটের চাপে। এখন বাঙালির ফুটবলজ্বর মোটামুটি চার বছর পর পর। অন্য সময়টাতে স্রেফ গা-গরম। তবু সব মিলিয়ে বাঙালি ফুটবলপাগল, জ্বরের কম বেশি যা-ই হোক না কেন।
‘আমার এই ‘ভবঘুরে’ জীবনের অপরাহ্ন বেলায় দাঁড়াইয়া ইহারই একটা অধ্যায় বলিতে বসিয়া আজ কত কথাই না মনে পড়িতেছে!’ শরত্চন্দ্র তাঁর শ্রীকান্ত উপন্যাস এভাবেই শুরু করেছেন। যাঁদের মনে পড়ছে না তাঁদের জন্য ধারাবিবরণীর মতো করে আমি খানিকটা উদ্ধৃত করছি।
‘কিন্তু কি করিয়া ‘ভবঘুরে’ হইয়া পড়িলাম, সে কথা বলিতে গেলে প্রভাত জীবনে এ নেশায় কে মাতাইয়া দিয়াছিল, তাহার একটু পরিচয় দেওয়া আবশ্যক। তাহার নাম ইন্দ্রনাথ। আমাদের প্রথম আলাপ একটা ‘ফুটবল ম্যাচে’।...উঃ সে দিনটি কি মনেই পড়ে।’
ফুটবল জ্বর, জ্বরের ঘোর ও বিকার এ-কালের মতো সে-কালেও ছিল। ফুটবল খেলা নিয়ে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েনি বাংলাদেশে এমন গ্রাম বেশ দুর্লভ। গ্রামে হায়ারে খেলতে গিয়ে প্রাণ বাঁচানোর স্মৃতি মফঃস্বল শহরের অনেক ফুটবলারের দেহ-মনে এখনো জাগরূক। আমি অবশ্য স্মরণ করাচ্ছি গত শতকের পাঁচ ও ছয়ের দশকের কথা। মারামারির শুরু কিন্তু সেই শ্রীকান্ত-যুগেই।
.সাগরময় ঘোষ তাঁর বইয়ের একটা পরিচ্ছেদজুড়ে শান্তিনিকেতনের এক অনবদ্য ফুটবল ম্যাচের অনুপম বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর বর্ণনার কেন্দ্রে রয়েছেন এক ইংরেজির অধ্যাপক, যিনি তাঁর আবেদনপত্রে ‘অতিরিক্ত গুণাবলীর মধ্যে বিশেষ জোর দিয়েছিলেন এই বলে যে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন তিনি ওয়াইএমসিএ ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন ছিলেন একাধিক বৎসর এবং তাঁর অধিনায়কত্বে একাধিকবার তাঁর দল টুর্নামেন্টে শিল্ড ও কাপ বিজয়ী হয়েছে।’.
‘স্কুলের মাঠে বাঙালি ও মুসলমান ছাত্রদের ‘ফুটবল ম্যাচ’। সন্ধ্যা হয় হয়। মগ্ন হইয়া দেখিতেছি। আনন্দের সীমা নাই। হঠাৎ ওরে বাবা—এ কি রে! চটাপট শব্দ এবং মারো শালাকে ধরো শালাকে! কি রকম যেন বিহ্বল হইয়া গেলাম।... ঠাহর পাইলাম ভালো করিয়া তখন, যখন পিঠের উপর একটা আস্ত ছাতির বাঁট পটাশ করিয়া ভাঙিল এবং আরো গোটা দুই তিন মাথার উপর, পিঠের উপর উদ্যত দেখিলাম।...
আরও একটা ছাতার বাঁট—আরো একটা। ঠিক সেই মুহূর্তে যে মানুষটি বাহির হইতে বিদ্যুৎ গতিতে ব্যুহভেদ করিয়া আমাকে আগলাইয়া দাঁড়াইল—সেই ইন্দ্রনাথ।’
শ্রীকান্ত এবং দুঃসাহসী ইন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটাতে গিয়ে শরত্চন্দ্র ‘ফুটবল ম্যাচ’ না মারামারি কোনটাকে অনুঘটক হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন, তার বিচার না করেও ভাবা যেতে পারে ফুটবল খেলা দেখার অভিজ্ঞতা তাঁর ভালো মতোই ছিল।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ছেলেবেলাতে বলেছেন, ‘মাঠ জোড়া ফুটবল খেলার লম্ফঝম্ফ তখনও ছিল সমুদ্র পাড়ে।...’ ছেলেবেলায় ফুটবল খেলা তাঁর কাছে লম্ফঝম্ফ মনে হলেও তিনি যখন শান্তিনিকেতন গড়লেন, তখন কিন্তু ঠিকই শান্তিনিকেতনের মাঠে সেই সমুদ্র পারের ফুটবল চালু করলেন। ব্যাপারটা কীভাবে যে সম্ভব হয়েছিল, এর মধ্যে কতখানি ছিল ফুটবলের প্রতি রবীন্দ্রনাথের নবসৃষ্ট অনুরাগ, আর কতটা ছিল ফুটবলের জনপ্রিয়তার গুণ তার সংবাদ অবশ্য কেউ দেননি। তবে শান্তিনিকেতনে ফুটবল যে ভালো মতোই চালু হয়েছিল এবং শান্তিনিকেতন থেকে যে কেবলি সংগীত শিল্পী এবং নৃত্যশিল্পীরাই বের হতেন না, ফার্স্ট ডিভিশনে খেলার যোগ্য ফুটবলাররাও বের হতেন সে-সংবাদ দিয়েছেন বিখ্যাত আশ্রমিক সাগরময় ঘোষ। তিনি তাঁর সম্পাদকের বৈঠকে বইয়ে বলেছেন—
‘...তখনকার দিনে শান্তিনিকেতন ফুটবল টিম গড়ে উঠেছিল অধ্যাপক, কর্মী ও ছাত্রদের মধ্যে বাছাই করা খেলোয়াড়দের নিয়ে এবং বাইরের কোনো দলের সঙ্গে যখনই খেলা থাকত তখন শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন ছাত্রদের মধ্যে যাঁরা নামকরা খেলোয়াড় ছিলেন তাঁদের কলকাতা থেকে বিশেষ আমন্ত্রণে ডেকে আনা হতো। তাঁদের মধ্যে অনেকেই কলকাতার ফার্স্ট ডিভিশন লীগের খেলোয়াড় ছিলেন...’
সাগরময় ঘোষ তাঁর বইয়ের একটা পরিচ্ছেদজুড়ে শান্তিনিকেতনের এক অনবদ্য ফুটবল ম্যাচের অনুপম বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর বর্ণনার কেন্দ্রে রয়েছেন এক ইংরেজির অধ্যাপক, যিনি তাঁর আবেদনপত্রে ‘অতিরিক্ত গুণাবলীর মধ্যে বিশেষ জোর দিয়েছিলেন এই বলে যে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন তিনি ওয়াইএমসিএ ফুটবল দলের ক্যাপ্টেন ছিলেন একাধিক বৎসর এবং তাঁর অধিনায়কত্বে একাধিকবার তাঁর দল টুর্নামেন্টে শিল্ড ও কাপ বিজয়ী হয়েছে।’ সাগরময় ঘোষ বর্ণিত এ ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৩১ সালে, যখন তিনি ম্যাট্রিক পাস করে শান্তিনিকেতন কলেজে ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র। তাঁর বর্ণিত ফুটবল ম্যাচটি ড্র হয়েছিল এবং তাতে অংশ নিয়েছিলেন সেই বিখ্যাত খেলোয়াড় অধ্যাপক। তবে তিনি ছিলেন খেলা না খেলা খেলোয়াড়।
.সুতরাং খেলার মাঠ থেকে সোজা শেয়ালদা এসে ঢাকার ট্রেন ধরল তিনজন। দীনেশ রঞ্জন, নজরুল আর নৃপেন। সোজা বুদ্ধদেবের বাড়ি। বুদ্ধদেব বসুর ফুটবলপ্রেম ছিল না মোটেও। অচিন্ত্যকুমারের সঙ্গে সম্ভবত জীবনে একবারই কলকাতার মাঠে ফুটবল দেখতে গিয়েছিলেন। অচিন্ত্যকুমার জানাচ্ছেন, বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, ‘কর্নার আবার কাকে বলে?’ কল্লোল গোষ্ঠীর প্রায় সবাই ফুটবলভক্ত ছিলেন। কল্লোল পত্রিকাতে যাঁরা নিয়মিত লিখতেন তাঁদেরও ফুটবলভক্তি কম ছিল না। নিয়মিত লেখক ও কবিদের একজন ছিলেন জসীমউদ্দীন।.
চাকরি পাওয়ার আশায় নিজের ব্যাপারে বানিয়ে কথা লিখেছিলেন। তাই সাগরময় ঘোষ বলেছেন, ‘কিন্তু অধ্যাপকের সেদিনের খেলার নমুনা দেখে আমরা অন্তত এটুকু বুঝে ফেলেছিলাম যে তিনি কস্মিনকালে ফুটবল মাঠে নামেননি, পা দিয়ে কোনো দিন বল ছুঁয়েছেন কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।’ অধ্যাপক অবশ্য পরদিন প্রাতে সকলের অগোচরে শান্তিনিকেতন ত্যাগ করেছিলেন। সাগরময় ঘোষের বর্ণনাভঙ্গি অসাধারণ সরস ও বিশদ। বর্ণনার মধ্যে সবই আছে। নেই শুধু রবীন্দ্রনাথ। ধারণা করা যেতে পারে, ফুটবলের প্রয়োজনীয়তা বুঝলেও ফুটবলের প্রতি রবীন্দ্রনাথের প্রীতি কখনো জাগ্রত হয়নি।
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর কল্লোল যুগ-এ লিখছেন—
‘কোনো এক গোরা টিমকে ছ’ছটা গোল দিলে মোহনবাগান। রবি বোস নামে নতুন এক খেলোয়াড় এসেছে ঢাকা থেকে—এ তারই কারুকার্য। সেইবার কি? না, যেবার মনা দত্ত পরপর তিনটে কর্নার শট থেকে হেড করে পর পর তিন তিনটে গোল দিলে ডি সি এল আইকে? মোট কথা ঢাকার লোক যখন এমন একটা অসাধ্য সাধন করল তখন মাঠ থেকে সিধে ঢাকায় চলে না যাওয়ার কোনো মানে হয় না। যে দেশে এমন খেলোয়াড় পাওয়া যায়, সে দেশটা কেমন দেখে আসা দরকার।’
সুতরাং খেলার মাঠ থেকে সোজা শেয়ালদা এসে ঢাকার ট্রেন ধরল তিনজন। দীনেশ রঞ্জন, নজরুল আর নৃপেন। সোজা বুদ্ধদেবের বাড়ি। বুদ্ধদেব বসুর ফুটবলপ্রেম ছিল না মোটেও। অচিন্ত্যকুমারের সঙ্গে সম্ভবত জীবনে একবারই কলকাতার মাঠে ফুটবল দেখতে গিয়েছিলেন। অচিন্ত্যকুমার জানাচ্ছেন, বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, ‘কর্নার আবার কাকে বলে?’
কল্লোল গোষ্ঠীর প্রায় সবাই ফুটবলভক্ত ছিলেন। কল্লোল পত্রিকাতে যাঁরা নিয়মিত লিখতেন তাঁদেরও ফুটবলভক্তি কম ছিল না। নিয়মিত লেখক ও কবিদের একজন ছিলেন জসীমউদ্দীন। তাঁর ‘কবর’ কবিতা কল্লোল পত্রিকাতেই প্রথম বেরিয়েছিল। জসীমউদ্দীনের ফুটবলভক্তি প্রকাশ পেয়েছে তাঁর ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ কবিতায়। সম্ভবত প্রায় নিয়মিত ফুটবল খেলা দেখেছেন তিনি। তখনকার ফুটবল চিত্র তাঁর এই কবিতাতে চমত্কারভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর কবিতার খেলোয়াড়ের নাম ইমদাদ—
‘সন্ধ্যাবেলায় খেলার মাঠেতে চেয়ে দেখি বিস্ময়ে
মোদের মেসের ইমদাদ হক আগে ছোটে বল লয়ে!
বাম পায়ে বল ড্রিবলিং করে ডান পায়ে মারে ঠেলা,
ভাঙা কয়খানা হাতে পায়ে তার বজ্র করিছে খেলা
চালাও চালাও আরও আগে যাও বাতাসের মতো ধাও
মারো জোরে মারো—গোলের ভেতরে বলেরে ছুঁড়িয়া দাও।’
গত শতকের অন্তত পাঁচের দশক পর্যন্ত যাঁরা মফস্বলে কাটিয়েছেন তাঁদের কাছেও জসীমউদ্দীনের কবিতার এই বর্ণনা সুপরিচিত। গ্রামের লোকের কাছে ড্রিবলিং শব্দটি অপরিচিত ছিল। তাঁরা বলতেন ‘কেরি’ করা। বল নিয়ে যখন কেউ কেরি অর্থাৎ ড্রিবলিং করে সামনের দিকে ছুটতেন তখনই তাঁর নামে আওয়াজ উঠত চালাও...। তখন গ্রামাঞ্চলে আরেকটা উল্লেখযোগ্য শব্দ ছিল ‘প্লান্টি’, অতিরিক্ত শুদ্ধ করে কেউ বলতেন ‘প্লান্টিক’। বলাবাহুল্য, শব্দদুটি পেনাল্টির অপভ্রংশ।
.মানুষের খেয়ালের অন্ত নেই। খেয়ালের সঙ্গে গোয়ার্তুমি মিশলে তা হয় খামখেয়াল, যদি যুক্ত হয় শৌখিনতা তা হলে তা হয় শখ। জ্ঞান এবং কাণ্ডজ্ঞান এক কথা নয়। খেয়াল থেকে এর যেকোনোটা ঝরে গেলে তা হয় বাতিক। তো ফুটবল নিয়ে বাঙালিকে দেখা গেছে তারা শুধু ফুটবলজ্বরেই ভোগে না, বাতিকেও ভোগে। এমন বাতিকের অবাক করা বর্ণনা দিয়েছেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত।.
ফিরে আসি পুনরায় কল্লোল যুগে। অচিন্ত্যকুমার লিখছেন—
‘প্রায়ই আমরা একসঙ্গে যেতাম কল্লোল-আফিস থেকে দীনেশদা, সোমনাথ, গোরা, নৃপেন, প্রেমেন, সুধীন আর আমি। কোনো কোনো দিন আশু ঘোষ সঙ্গে জুটত। আরও কিছু পরে প্রবোধ সান্যাল।...নজরুল আরও পরে ঢোকে খেলার মাঠে এবং তখন সে বেশ সম্ভ্রান্ত ও খ্যাতি চিহ্নিত।’
নজরুল খেলা দেখতেন প্রায়ই। ফুটবল খেলা তিনি বেশ পছন্দ করতেন। জীবনানন্দ দাশের ফুটবলভক্তি ছিল কি না জানা যায় না। এমনিতেই নিভৃতচারী ছিলেন, ফুটবলের হট্টগোল তাঁর পছন্দ হওয়ার কথা নয়। তিনি টেনিসকে টেনে এনেছেন কবিতায়—কখনো ফুটবলকে নয়।
‘এখুনি টেনিসে যেতে হবে তবু,
ফিরে এসে রাতে ক্লাবে;
কখন সময় হবে।’
সৈয়দ মুজতবা আলীর ফুটবলপ্রেম ছিল। ফুটবল নামে একটি রচনা লিখে তিনি তাঁর ফুটবলপ্রেমের প্রমাণ রেখে গেছেন। অসাধারণ ফুটবলভক্তি ছিল শিবরাম চক্রবর্তীর। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত জানাচ্ছেন—
‘মাঠে ফুটবল খেলা হচ্ছে, আর শিবরামের মুখে চলছে শব্দের খেলা। কুমার হয়তো একটা ভুল পাস দিলে, অমনি বলে উঠল: ‘কু-মার’ কিংবা গোষ্ঠর সঙ্গে প্রবল ধাক্কা লেগে ছিটকে পড়ল বিপক্ষের খেলোয়াড়, অমনি বলে উঠল, এ বাবা শুধু গোষ্ঠ নয়—গোস্ত। গোষ্ঠ পাল ছিলেন বিখ্যাত রাইটব্যাক। তখন তাঁকে চেনে না এমন বাঙালি বিরল। ঔপন্যাসিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় মাঠে বসে এই গোষ্ঠ পাল সম্পর্কে জানতে চাইলেন—গোষ্ঠ পাল কোনজন? অচিন্ত্যকুমার বলেছেন, শৈলজা এরপর আর মাঠমুখো হয়নি।
মানুষের খেয়ালের অন্ত নেই। খেয়ালের সঙ্গে গোয়ার্তুমি মিশলে তা হয় খামখেয়াল, যদি যুক্ত হয় শৌখিনতা তা হলে তা হয় শখ। জ্ঞান এবং কাণ্ডজ্ঞান এক কথা নয়। খেয়াল থেকে এর যেকোনোটা ঝরে গেলে তা হয় বাতিক। তো ফুটবল নিয়ে বাঙালিকে দেখা গেছে তারা শুধু ফুটবলজ্বরেই ভোগে না, বাতিকেও ভোগে। এমন বাতিকের অবাক করা বর্ণনা দিয়েছেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত। মোহনবাগান ক্লাবের কতিপয় সদস্য, মোহনবাগানের খেলায় মাঠে ঢুকতেন না। বাইরে বসে থাকতেন। এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে একজন যা বলেছিলেন তা অচিন্ত্যকুমারের ভাষায়—
‘আমরা তো বাই মাঠে ঢুকি না, বাইরেই বসে থাকি চিরদিন। আমরা non seeing মেম্বর।’ তার মানে? তার মানে আমরা অপয়া, অনামুখো, অলুক্ষণে, আমরা মাঠে ঢুকলেই মোহনবাগান নির্ঘাৎ হেরে যায়, মেম্বর হয়েও আমরা খেলা দেখি না, বাইরে বসে দাঁতে ঘাস কাটি আর চিত্কার শুনি।’
অচিন্ত্যকুমার বলেছেন, ‘এই অপূর্ব স্বার্থশূন্যতার কথা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার যোগ্য।’ ফুটবল নিয়ে দেশে দেশে নানা কথা আছে। কিন্তু এমন ত্যাগের কথা বাঙালি ছাড়া অন্য কোনো জাতির ইতিহাসে নেই। গত শতকের দ্বিতীয় থেকে অন্তত ষষ্ঠ দশক পর্যন্ত বাঙালিরা ফুটবলকে এভাবেই ভালোবেসেছে।






