শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদীর আজ জন্মদিন। এ উপলক্ষে আজ চ্যানেল আইয়ে প্রচারিত হবে শাইখ সিরাজের প্রামাণ্যচিত্র গল্প আছে এখানে। এ ছাড়া আজ বুধবার দুপুরে চ্যানেল আইয়ের বিশেষ তারকাকথন–এও অতিথি থাকছেন তিনি। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সৈয়দ আব্দুল হাদীর সঙ্গে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুর কাদের

.

‘গল্প আছে এখানে...’তে এমন কী গল্প আছে, যা দর্শকের জন্য বাড়তি পাওনা হবে?

.

সৈয়দ আব্দুল হাদী : আমার জীবন নিয়ে আগেও এক ঘণ্টার বেশি দৈর্ঘ্যের একটা তথ্যচিত্র বানিয়েছিল বাংলা ঢোল। আমার কাছে খুব ভালো লেগেছিল। তরুণ লেখক সাদাত হোসাইন বানিয়েছিল। লেখক মানুষ তো, সৃজনশীলতা ছিল। তার উপস্থাপন এবং নির্মাণটাও খুব সুন্দর ছিল। আর শাইখ সিরাজ তো টেলিভিশনের মানুষ, দীর্ঘ সময়ের কাজের অভিজ্ঞতা। এখনো এটি দেখিনি। আশা করি ভালোই হবে। শুটিংয়ের সময়ের অভিজ্ঞতা ভালো।

.

এতগুলো বছর পর নিজের জীবনের গল্প পর্দায় দেখলে কোন স্মৃতিটা সবচেয়ে বেশি আপ্লুত করে?

সৈয়দ আব্দুল হাদী : এ ধরনের অনুষ্ঠানে পিতা–মাতার কথা যখন বলি, খুব আবেগাপ্লুত হই। ছোটবেলার কথা, একেবারে শৈশবের কথা, আগরতলার দিনগুলোর কথা যখন মনে পড়ে, তখনো আবেগপ্রবণ হয়ে যাই। সংগীতজীবনেরও অনেক ঘটনা আছে—আমি ভাগ্যবান যে এই সমস্ত ঘটনা আমার জীবনে ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি আবেগাপ্লুত করে মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসা। আমি সব সময় বিশ্বাস করি, শুধু ভালোবাসা যথেষ্ট নয়। ভালোবাসার সঙ্গে শ্রদ্ধা থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি। যে ভালোবাসায় শ্রদ্ধা নেই, সে ভালোবাসা আমার কাছে অর্থহীন।

.জীবন থেকেই তো পালাবার চেষ্টা করেছি অনেকবার.

একজীবনে হাজারো গানে কণ্ঠ দিয়েছেন...

.

সৈয়দ আব্দুল হাদী : একজীবনে আমার গাওয়া গানের সংখ্যা কত, এটার উত্তর আমি কখনোই দিই না। এমনও দেখি, কাউকে জিজ্ঞেস করলে বলে দেয়—১০ হাজার, ১২ হাজার বা ২০ হাজারের বেশি গান গেয়েছি। কিন্তু ১০ হাজার, ১২ হাজার বা ২০ হাজার গান চাট্টিখানি কথা না। আমি নিজেকে এতটা ভাগ্যবান মনে করি না। আমি নিজেকে বলি, আমার গাওয়া গান পাঁচ শও হতে পারে, পাঁচ হাজারও। তবে কোনো গান গাইবার সময় কখনোই কিছুই ভাবিনি। আমার গাওয়া গান কতটা জনপ্রিয় হবে, কালজয়ী হবে কি না—এই সমস্ত চিন্তা করিনি। নিজের সাধ্যের মধ্যে শিল্পসম্মত করে গান গাইবার চেষ্টা করেছি।

.

এখন তো আর আগের সেই ব্যস্ততা নেই। সময় কাটে কীভাবে?

সৈয়দ আব্দুল হাদী : এখন তো আমি পেশাগত গানের ব্যস্ততা থেকে একেবারে দূরে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, পেশাদারভাবে গাই না বলে এখন প্রতিদিনই গান গাই। অর্থাৎ ভেতরে তো তৃষ্ণা রয়ে গেছে, এই জীবনে তো এই তৃষ্ণা যাবে না। সেই শৈশবকাল থেকেই তো গানের সঙ্গে আমার প্রেম। গান কী কী কারণে ছেড়েছি, তা ব্যাখ্যা করার দরকার নেই। তবে ভেতরে ভেতরে সারাক্ষণই গুনগুন করতে থাকি। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সুরের ধারণা আমার মধ্যে আসে। সারাক্ষণ আমার মধ্যে সুরের তোলপাড় হয়, উচ্চারিত হয় না। কেউ আমাকে খুব ভালো করে খেয়াল করলে বুঝতে পারবে, আওয়াজ বের না হলেও আমি গান গাইছি।

.

এই যে নতুন সুর, এগুলো রেকর্ডের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না?

.

সৈয়দ আব্দুল হাদী : আমি কিন্তু একসময় প্রচুর গানের সুর করেছি। অনেক জনপ্রিয় গানও আমার সুরে হয়েছে। ওই সব গানও কোনো পরিকল্পনা করে করিনি। আমি সুর করেছি মনের আনন্দে। সুরকার হিসেবে গান বানাতে হবে, সেটা ভেবে করিনি। আমার মন যখন বলেছে, তখনই সুর করেছি, গান বেঁধেছি। গত কয়েক দিন আমার মধ্যে বনি এম ভর করেছে, ইদানীং গুনগুন করছি তাঁর ‘রাসপুটিন’ গানটা। আবার হয়তো আরেকটু সুর মাথায় ঢুকবে—সেটাই হয়তো গুনগুন করবে মাথায়।

.

শিল্পী হিসেবে সংগ্রামের দিনগুলো থেকে আজকের এই সময়—এই যাত্রার সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা কী?

সৈয়দ আব্দুল হাদী : সেই সময়কার বিখ্যাত শিল্পী আব্দুল লতিফ ভাই আমাকে একদিন বলেছিলেন, ‘দেখ, কোনো দিন খ্যাতির পেছনে ছুটবি না, একদিন দেখবি খ্যাতিই তোর পেছনে ছুটবে।’ যখন রেডিওতে কাজ করি, বয়স ২৪–২৫ বছর হবে—তখন তিনি এ কথা বলেছিলেন। কথাটা তখনই আমার মনে গেঁথেছিল। জীবনের সর্বক্ষেত্রে পরিকল্পনা করে কিছু করিনি। এটা আমাকে অর্জন করতেই হবে, ওটা করতে হবে—এমনটা কখনো মাথায় আসেনি। স্বাভাবিকভাবে আমার কাছে যা এসেছে, সেটা সাদরে গ্রহণ করেছি। এত বড় শিল্পী হতে হবে, এটা–ওটা করতে হবে—এমনটা করিনি। শিল্পী হিসেবে আমি গান গেয়ে গেছি—আমার সাধ্যমতো, ক্ষমতা অনুযায়ী সব সময় সেরাটাই দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

.

যদি ২৫ বছরের তরুণ সৈয়দ আব্দুল হাদীর সঙ্গে দেখা হতো, তাহলে তাঁকে কী পরামর্শ দিতেন?

.

সৈয়দ আব্দুল হাদী : ওই যে বললাম, আমার জীবনে কোনো পরিকল্পনা ছিল না। উঠেপড়ে লাগা যেটা, সেটা করিনি। এটা আসলে এখন আমার মনে হয়, ভুল ছিল। মানুষের আকাঙ্ক্ষা থাকতে হয়। আকাঙ্ক্ষা ছাড়া মানুষের অর্জন হয় না। তাই জীবনের যত ভুল ছিল, সব সংশোধন করে নেওয়ার কথা বলতাম।

.

এই ভুলের জন্য আফসোস হয় কি?

সৈয়দ আব্দুল হাদী : ভুল তো সব মানুষের জীবনেই থাকে। কেউ সেটা উপলব্ধি করে, কেউ করে না। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের একটা গান আছে না, ‘ওগো, যা পেয়েছি/ সেইটুকুতেই খুশি আমার মন/ কেন একলা বসে হিসেবে কষে/ নিজেরে আর কাঁদাই অকারণ।’ তাই বলি, যা পেয়েছি এটাই বা কম কী। তাই কখনো আফসোস করি না।

.

আজ আপনার জন্মদিন। আপনার কাছে জীবনের মানে কী?

.

সৈয়দ আব্দুল হাদী : আজ আমার ৮৬তম জন্মদিন। জীবন আমার কাছে কী, এটা প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আত্মজীবনীমূলক বই জীবনের গান লিখতে গিয়ে শেক্সপিয়ারের কথাটাই উল্লেখ করেছি, ‘লাইফ ইজ আ টেল টোল্ড বাই অ্যান ইডিয়ট, ফুল অব সাউন্ড অ্যান্ড ফিউরি, সিগনিফাইয়িং নাথিং।’ আমি মনে করি, এটাই জীবনের আসল রূপ।