অটোরিকশাচালক আলমগীর হোসেন এমন ‘বেসামাল’ গরম আগে কখনো দেখেছেন কি না, স্মরণ করতে পারেন না। বিশেষ করে এই বর্ষার সময়। নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার আলমগীর (৪৮) ঢাকা শহরে আছেন প্রায় ২০ বছর ধরে। তাঁর সঙ্গে কথা হয় গতকাল সোমবার সকালে। তখন রাজধানীর আকাশ কিছুটা মেঘলা ছিল। সেই মেঘ দেখে আলমগীর বলছিলেন, ‘কয়েক দিন পর অ্যামন আকাশ দ্যাখলাম। কয়দিন ধইরা তো মুনে হয় ফকফকা আকাশ। আর সূর্যেরও যে ত্যাজ। খালি ঘামতেছি।’

আলমগীর হোসেনের মতো খেটে খাওয়া মানুষ তো বটেই, গরমে ভোগাচ্ছে রাজধানীর প্রায় সব মানুষকেই; আর শুধু রাজধানীই বলি কেন, আসলে গরম ভোগাচ্ছে দেশের সব এলাকার মানুষকেই। প্রায় সাত দিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। গত রোববার ঢাকাসহ ছয় জেলায় তাপপ্রবাহ ছিল। গতকাল তাপপ্রবাহ কমে গেলেও গরমের অনুভূতি কমেনি।

.
ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগ ছাড়া প্রায় সব বিভাগেই বৃষ্টি কম হয়েছে। বর্ষার এই মাস ক্রমে উষ্ণ হয়ে উঠছে।
কাজী জেবুন্নেছা, আবহাওয়াবিদ
.

বর্ষাকালের এ সময়ে যে গরম থাকবে না, এমনটা নয়; কিন্তু আষাঢ় কিংবা শ্রাবণের গরম কমে আসে বৃষ্টিতে। আজ শেষ হতে যাওয়া জুন মাসে সেই বৃষ্টিই কিন্তু কম হয়েছে; আর তাতেই এই গরম।

গতকাল পর্যন্ত এ মাসে বৃষ্টি কম হয়েছে ৩৭ শতাংশ। এ তথ্য জানিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা গতকাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগ ছাড়া প্রায় সব বিভাগেই বৃষ্টি কম হয়েছে। বর্ষার এই মাস ক্রমে উষ্ণ হয়ে উঠছে।

দেশে সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয় জুলাই মাসে। সাধারণত এ মাসের গড় বৃষ্টির পরিমাণ ৫২৩ মিলিমিটার; আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয় জুন মাসে, ৪৫৯ মিলিমিটার। সেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টির মাসে এবার এ পর্যন্ত বৃষ্টি কম।

তবে এ মাসে যে বৃষ্টি কম হতে পারে, তার পূর্বাভাস মিলেছিল মাসের শুরুর দিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে। তবে অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ গতকাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কিছু মডেল এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে জুলাই মাসে হয়তো স্বাভাবিক বৃষ্টি হতে পারে। কারণ, মাসের শুরুতে একটি নিম্নচাপ সৃষ্টির আশঙ্কা আছে।

.
মৌসুমি বায়ু ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের সীমান্তবর্তী এলাকায় আটকে আছে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে।
তরিফুল নেওয়াজ কবীর, আবহাওয়াবিদ
.

চলতি মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি কম হওয়া প্রসঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ব্যাখ্যা—দেশে মৌসুমি বায়ু দেরিতে প্রবেশ করা এবং তার সক্রিয়তার অভাব। সাধারণত ৩১ মের মধ্যে দেশের দক্ষিণ–পূর্ব এলাকা দিয়ে মৌসুমি বায়ুর প্রবেশ ঘটে। এবার জুন মাসের প্রথম সপ্তাহের শেষে বৃষ্টি–ঝরানো এ বায়ু প্রবেশ করেছে দেশে। মৌসুমি বায়ু যখন দেশে প্রবেশ করে, তখন ক্রিয়াশীল থাকে পশ্চিমা লঘুচাপ। দুটি বায়ুপ্রবাহের মধ্যে সংঘাত বা দ্বন্দ্ব অনিবার্য। নিয়ম হলো পশ্চিমা বায়ুকে ‘পরাভূত’ করে মৌসুমি বায়ু প্রাধান্যশীল হবে; কিন্তু এবার এখনো তা হয়নি।

আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবীর বলেন, মৌসুমি বায়ু ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের সীমান্তবর্তী এলাকায় আটকে আছে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে। এটি এখনো আটকে আছে।

.

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এ বছরের গ্রীষ্মে প্রশান্ত মহাসাগরীয় বায়ুপ্রবাহ এল নিনোর সক্রিয়তার কথা বলেছে। এর প্রভাবে কম বৃষ্টি এবং উচ্চ তাপের আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল সংস্থাটি। ইতিমধ্যে ইউরোপজুড়ে উচ্চ তাপপ্রবাহ এবং তাপজনিত মৃত্যু বেড়েছে। বাংলাদেশেও এল নিনোর প্রভাব রয়েছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদেরা।

তবে এই গরমের মধ্যে স্বস্তির কথা হলো গতকাল থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আজও দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হতে পারে। দুই দিন পর আবার বৃষ্টি কমে বাড়তে পারে তাপ। তবে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিকে সাগরের নিম্নচাপ আবার বৃষ্টি বাড়াতে পারে, জানিয়েছেন কাজী জেবুন্নেছা।