বাংলাদেশে শিশুশ্রম নিরসনে নানা আইনি পদক্ষেপ ও উদ্যোগ সত্ত্বেও এখনো ১৭ লাখ ৮০ হাজার শিশু শ্রমের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু কাজ করছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে, যা তাদের জীবনের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। বিভাগীয় পর্যায়ে শিশুশ্রমের এই হার সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রামে।
‘বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আজ সোমবার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এ উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরা হয়। ‘শিশুশ্রমকে না বলি, শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করি’—এই বৈশ্বিক প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে যৌথভাবে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, চাইল্ড লেবার ইলিমিনেশন প্ল্যাটফর্ম (সিএলইপি) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশে শিশুশ্রম নির্মূলে অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামে উপস্থাপনা দেওয়া হয়।
.বিভাগ শীর্ষে চট্টগ্রাম, জেলা শীর্ষে কুড়িগ্রাম
উপস্থাপনায় বলা হয়, দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা সর্বোচ্চ, যা প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে ৩ লাখ ৪০ হাজার শিশু শ্রমের সঙ্গে যুক্ত। অন্য বিভাগগুলোর মধ্যে রাজশাহীতে ২ লাখ ৪০ হাজার, রংপুরে ২ লাখ ২০ হাজার, সিলেটে ১ লাখ ৪০ হাজার, খুলনায় ১ লাখ ৩০ হাজার এবং ময়মনসিংহে ৯০ হাজার শিশু শ্রমিক রয়েছে। বরিশাল বিভাগে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা সবচেয়ে কম—৭০ হাজার। তবে জেলার হিসাবে দেশের মধ্যে কুড়িগ্রাম জেলায় শিশু শ্রমিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বলে সভায় জানানো হয়।
.বৈশ্বিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপট
শিশু শ্রমিকদের মধ্যে ছেলের সংখ্যাই বেশি—প্রায় ১৩ লাখ ৭০ হাজার এবং মেয়ের সংখ্যা ৪ লাখ। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে জানানো হয়, সারা বিশ্বে বর্তমানে ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু শ্রমে নিয়োজিত, যার মধ্যে ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। ২০১৫ সালে জাতিসংঘ ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি। বরং এখনো বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রম একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
.তিনটি খাতে শিশু শ্রমিক বেশি
উপস্থাপিত প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়, বাংলাদেশে শিশুরা প্রধানত তিনটি খাতে কাজ করছে—শিল্প, সেবা ও কৃষি। এর মধ্যে শিল্প খাতে সর্বোচ্চ ৭ লাখ ৯০ হাজার, সেবা খাতে (গৃহকর্মী, হোটেল কর্মী, ফুড ডেলিভারি, পরিবহন ও কুরিয়ার সার্ভিস, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতো কাজগুলো) ৫ লাখ ৬০ হাজার এবং কৃষি খাতে ৪ লাখ ২০ হাজার শিশু নিয়োজিত। সরকার ইতিমধ্যে ৪৩টি কাজকে শিশুদের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যালুমিনিয়াম ও কাচ কারখানা, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে কাজ করা, বাস–ট্রাক–টেম্পোতে সহকারী হিসেবে কাজ করা, ব্যাটারি রিচার্জিং, ইট ভাঙা, ইলেকট্রিক মেশিন ওয়ার্ক, প্লাস্টিকের পণ্য তৈরি, ভাটা, ওয়েল্ডিং, জাহাজভাঙা শিল্প আবর্জনা ব্যবস্থাপনা।
.আইন ও শাস্তির বিধান
সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ (২০২৬ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী কাজে যোগদানের সর্বনিম্ন বয়স ১৪ বছর। এই আইন অমান্য করে কোনো শিশু বা কিশোরকে কাজে নিয়োগ দিলে সংশ্লিষ্ট মালিককে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া কোনো অভিভাবক যদি শিশুকে কাজে দেওয়ার জন্য অবৈধ চুক্তিতে লিপ্ত হন, তবে এ জন্য ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে।
.চ্যালেঞ্জ
আলোচনা সভায় বক্তারা শিশুশ্রমের মূল কারণ হিসেবে দারিদ্র্য, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, আইন ও নীতিমালার দুর্বল বাস্তবায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও বাস্তুচ্যুতি, অভিবাসন ও নগরায়ণের চাপ এবং সচেতনতার ঘাটতিকে চিহ্নিত করেন।
শিশুশ্রম নির্মূলে নেওয়া কিছু পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরা হয় উপস্থাপনায়। সেখানে বলা হয়, জাতীয় নীতিগত কাঠামো গঠন করার পাশাপাশি আটটি খাতকে শিশুশ্রমমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আইএলওর কনভেনশন ১৩৮ ও ১৮২ অনুসমর্থন করা হয়েছে। ৪৩ ধরনের কাজকে শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিকর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কেরানীগঞ্জের অনানুষ্ঠানিক তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত থেকে শিশুশ্রম নির্মূলে খাতভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো কেরানীগঞ্জকে দেশের প্রথম খাতভিত্তিক শিশুশ্রমমুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা এবং সেখানে শিশুশ্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করা। পাশাপাশি শিশুশ্রমমুক্ত এলাকা গড়ে তুলতে ‘ঠাকুরগাঁও মডেল’ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এখন এ ধরনের সফল পাইলট প্রকল্পগুলো সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে শিশুশ্রমমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।
.শিশুশ্রম নির্মূলে সুপারিশ
২০৩০ সাল পর্যন্ত শিশুশ্রম–সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য শিশুশ্রম ইউনিটের অধীন নির্দিষ্ট জনবল নিয়োগ এবং জাতীয় কর্মপরিকল্পনার আওতায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন; বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি; কেন্দ্রীয় শিশুশ্রম পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সরকার ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা; শিশুশ্রমবিরোধী জাতীয় প্রচার চালানো, শ্রম আইন বাস্তবায়ন; অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক শিক্ষা: ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকা সম্প্রসারণ; দরিদ্র পরিবারের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করা; শিশুদের পুনর্বাসন; জলবায়ু সহনশীলতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলের সঙ্গে শিশুশ্রম নির্মূল কার্যক্রমকে সমন্বিত করা।
.শিশুশ্রম নিজের ঘর থেকে বন্ধ করতে হবে
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘শুধু সেমিনারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবসম্মত ও টেকসই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশ থেকে শিশুশ্রম নির্মূল করতে হবে। আর শিশুশ্রম নির্মূলের কাজ শুরু হতে হবে নিজের ঘর থেকে। বস্তি এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সচেতনতা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আরও কাজ করতে হবে। একটি শিশু সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে কি না, তা নিশ্চিত করা আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা।’
মানবসম্পদ দেশের সবচেয়ে বড় নিয়ামত এবং এই সম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো সবার নৈতিক দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন শ্রমমন্ত্রী। তিনি আগামী এক বছরের মধ্যে টেকসই ও ফলপ্রসূ পাইলট প্রোগ্রাম ডিজাইন করে তা বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। মন্ত্রী বলেন, ‘পরের বছর আমি দেখতে চাই, পাইলট প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমরা কত শতাংশ শিশুকে শ্রম থেকে ফিরিয়ে এনে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিতে পেরেছি। বক্তৃতায় যা বলব, তা যেন কাজে বাস্তবায়ন করতে পারি—এটাই আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ।’
.শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরির জন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি মসজিদে জুমার খুতবায় শিশুশ্রমের কুফল এবং এ বিষয়ে ধর্মীয় নির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। একইভাবে রামকৃষ্ণ মিশন, বৌদ্ধবিহার, চার্চসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয় ও ধর্মীয় সভাকে এই সচেতনতা তৈরিতে কাজে লাগাতে হবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্যে এডুকো বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আবদুল হামিদ শিশুশ্রম নিরসনে খাতভিত্তিক পদ্ধতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং এ বিষয়ে সিএলইপির যৌথ উদ্যোগসমূহ তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব জনাব মো. আবদুর রহমান তারফদার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনন। এ ছাড়া ‘বাংলাদেশে শিশুশ্রম নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ ও সবার যৌথ দায়িত্ব’ শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনায় সরকারি কর্মকর্তা, নিয়োগকর্তা, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং আইএলওর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুরা।






