ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়নের মজুমদার বাড়ির উঠানে সারি সারি চেয়ার পাতা। সেখানে বসে ছিলেন দূর থেকে আসা স্বজনেরা। উঠান–সংলগ্ন দোতলা ঘরের পাশেই লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে কাফনে মোড়ানো দুটি মরদেহ। লাশবাহী ওই গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দোয়া ও দুরুদ পড়ছিলেন কয়েকজন নারী। থেকে থেকে কান্না ও আহাজারির শব্দ আসছিল বাড়ির ভেতর থেকে।

ফ্রিজিং গাড়িতে নিজ বাড়ির সামনেই রাখা হয়েছিল জাকিয়া আক্তার (৩৮) ও তাঁর মেয়ে ওয়াহিদা আক্তারকে (২০)। গতকাল শনিবার রাতে ফেনীর ফুলগাজীতে ক্যানসার আক্রান্ত এক স্বজনকে দেখে ফিরছিলেন তাঁরা। ফুলগাজী পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সামনে একটি পিকআপের সঙ্গে তাঁদের বহন করা অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে তাঁদের মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। এ ঘটনায় মোহাম্মদ কাউছার (৩২) নামের আরও একজন মারা যান। বাড়ির কাছাকাছি এসেও গতকাল রাতে ফিরতে পারেননি মা–মেয়ে। তবে আজ রোববার সকালে প্রায় ১০ ঘণ্টা পর নিথর দেহে বাড়ি ফেরেন তাঁরা। গোছানো সংসার ও ঘরদোর সবকিছুই যেন অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে আছে।

স্বজনেরা জানান, জাকিয়ার স্বামী নূরের সফা মজুমদার সোহেল সৌদি আরবপ্রবাসী। আর তাঁর মেয়ে ওয়াহিদা আক্তারের স্বামী কাজী আজাদ হোসেন ইতালিপ্রবাসী। দুর্ঘটনার সংবাদ শুনে তাঁরা রওনা দিয়েছেন দেশের পথে। তাঁরা ফিরলেই দুজনের দাফন হবে।

আজ সকালে ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়নের মজুমদার বাড়িতে গেলে দেখা মেলে শোকাবহ পরিবেশের। মা ও বোনকে হারিয়ে বাক্‌রুদ্ধ হয়ে পড়েছেন জাকিয়ার অপর দুই সন্তান। বড় সন্তান আশরাফুল ইসলাম ও ছোট সন্তান মেহজাবিন শোকে কথা বলতে পারছিলেন না। জাকিয়ার মা সত্তরোর্ধ্ব মোমেনা খাতুন সবাইকে চিনতে পারেন না। কিন্তু মেয়ে ও নাতনির নাম ধরে ডাকছিলেন তিনি। জোরে জোরে বিলাপ করছিলেন। মেয়ে জাকিয়া ও তিন নাতি–নাতনির সঙ্গেই থাকতেন মোমেনা খাতুন। সকাল, দুপুর ও রাত কাটত তাঁদের সঙ্গে। সংবাদ শোনার পর থেকে মোমেনা মুখে তোলেননি কিছু। কোনোভাবেই শান্ত করা যাচ্ছিল না তাঁকে।

একই বাড়িতে পাশের একটি ইউনিটে থাকেন জাকিয়া আক্তারের ভাশুর শাহ আলম মজুমদার। তিনি বলেন, পাশের গ্রাম দৌলতপুরে গিয়েছিলেন মা ও মেয়ে। সেখান থেকে ফেরার আগে রাতে বাড়িতে ফোন করে ছেলের সঙ্গে কথাও বলেছেন জাকিয়া আক্তার। জানিয়েছিলেন, দ্রুতই ফিরবেন তাঁরা। কিন্তু আর ফেরা হলো না।

শাহ আলম মজুমদার বলেন, জাকিয়া আক্তারের স্বামী তাঁর ভাই নূরের সফা মজুমদার ১৯৯৪ সাল থেকে সৌদি আরবে আছেন। স্ত্রী–সন্তানের দাফনের জন্য আজ সকালে বিমানে উঠেছেন তিনি। কিছুদিন আগে নতুন বাড়ি করেছেন। ইতালিপ্রবাসী ছেলের সঙ্গে বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে সংসারে একটা পূর্ণতা এসেছিল। কিন্তু গতকালের দুর্ঘটনায় সেটা ভেঙে খানখান হয়ে গেছে।

নিহত জাকিয়ার বড় বোন দুবাইপ্রবাসী মনোয়ারা বেগম লাশবাহী গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছিলেন। তিনি বলেন, গত তিন দিন আগে তিনি দেশে ফিরেছেন। দু–এক দিনের মধ্যেই বোনের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। কিন্তু দেখা হলো না। এভাবে বোনকে দেখার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি বলেন, দুর্ঘটনায় বোন ও বোনের মেয়ের শরীরের বিভিন্ন স্থান থেঁতলে গেছে। এত কষ্ট পেয়ে তাঁদের মরতে হলো, এটা মেনে নিতে পারছেন না।

মনোয়ারা বেগম বলেন, আজ থেকে ১৪ বছর আগে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান এই বাড়ির আরেক নারী সুলতানা রাজীয়া। সুলতানা রাজীয়া সম্পর্কে জাকিয়া ও তাঁর ভাবি হন। ১৪ বছরের ব্যবধানে বাড়ির আরও দুই নারী একইভাবে নিহত হলেন। শোকের সেই পরিবেশ দ্বিগুণ হয়ে যেন ফিরে এল।