সুতাকাটা ঘুড়ির মতো একজোড়া পাখি পুকুরের পানিতে পড়ি পড়ি করে আবার উল্টো দিকে উড়ে গেল। ওড়ার সময় ধাঁধিয়ে গেল বড় সাদা ডানা চোখ। সোনালি-বাদামি ঘাড় আর গলার দুই পাশে লম্বা কালো রেখা। বুকে কালো ব্যান্ড, সবুজ পা ও লেজের লম্বা কালো পালক দেখে যে কারও নজর এড়ানো দায়। পাখিটির নাম জলময়ূর বা নেউ-পিপি। খানিক বাদেই দূর থেকে পুরুষ পাখিটির ডাক এল নে-উ-ইউ, নে-উ-ইউ, নে-উ-ইউ...।
গত বুধবার সন্ধ্যার কিছুক্ষণ আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম রোকেয়া হল ও রহমতুন্নেসা হলের পাশে পুকুরে জলময়ূরের এমন সংসার দেখা গেল। পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে পাখিদের মুগ্ধতার গল্প বলছিলেন বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হক। সঙ্গে ছিলেন ক্লাবের সাবেক সহসভাপতি ও পর্যটক তারেক অণু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এ এম সালেহ রেজা ও রাজশাহী নগরের লক্ষ্মীপুর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ফারুক হোসেন।
পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে জলময়ূরের লেজ নিয়ে কথা উঠল। ইনাম আল হক বললেন, ‘এই লেজ শুধু তাদের প্রজনন মৌসুমে থাকে। মে থেকে সেপ্টেম্বর প্রজনন মৌসুম। তারপর ঝরে যায়। শুনে অবাক লাগলেও স্ত্রী-পুরুষ উভয় পাখিরই প্রজনন মৌসুমে লম্বা লেজ গজায়। শীতের সময় এই লেজ আর থাকে না। ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটানোর কাজটি শুধু পুরুষ পাখিদের। পানিতে ভাসমান পদ্মপাতা, শাপলাপাতা বা জলজ লতাপাতা দিয়ে পুরুষ পাখিটা বাসা বানিয়ে অপেক্ষা করে। স্ত্রী পাখির দেখে পছন্দ হলে তার সঙ্গে সংসার পাতে।’
স্ত্রী পাখিরা ডিম দিয়েই খালাস। তারপর কয়েক দিন ভালোমতো খাওয়াদাওয়া করে ডিম দেওয়ার ধকল কাটিয়ে আরেকটি পুরুষ পাখির সঙ্গে বন্ধুত্ব করে। পরে তার ঘরে আবার চারটি ডিম দেয়। তাড়াতাড়ি ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটানোর জন্য তারা ডিমগুলোকে বড় করার চেষ্টা করে। এর কারণও ব্যাখ্যা করলেন ইনাম আল হক। তিনি বলেন, এই পাখিদের চারদিকে শত্রু। ডিম থেকে বেরোনোর পর থেকেই ছানারা জলজ উদ্ভিদের ওপর হেঁটে হেঁটে খাবার খুঁটে খায়। খোলা আকাশের নিচে দিন কাটে বলে ছানার জীবনে বিপদের শেষ নেই। পানিতে আছে সাপ, গুইসাপ। আকাশে চিল-বাজসহ নানা শত্রু।
পাখিবিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক আরও বলেন, একটি প্রজনন মৌসুমে মাত্র চারটি ছানা দিলে বছরের শেষে একটিকেও খুঁজে পাওয়া যেত না। এ জন্য প্রতি মৌসুমে দুই কিংবা তিনটি পুরুষ পাখি খুঁজে নিয়ে তাদের বাসায় ডিম দিয়ে যায় স্ত্রী জলময়ূর। বছরে চারটির বদলে ৮ কিংবা ১২টি ছানা হলে আশা থাকে অন্তত একটি বাঁচবে। পুরুষ জলময়ূর অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও পরিশ্রমী; হাবাগোবা কিংবা স্ত্রীর একান্ত অনুগত নয়। প্রণয়ের কাল অপর্যাপ্ত মনে হলে কোনো পুরুষ পাখি ডিমে তা দিতে বসে না। সারা পৃথিবীতে এমন প্রজাতির আট ধরনের পাখি আছে। এর মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে দল-পিপি নামের আরেকটি ধরন পাওয়া যায়। তবে তাদের এখানে প্রজনন করতে দেখা যায় না।
ইতিমধ্যে দিনের আলো ফুরিয়ে এসেছে। ‘ওয়াক, ওয়াক’ করে গলায় তা দিচ্ছে নিশিবক। পাতিসরালি শিস দেওয়ার মতো করে ডেকে যাচ্ছে। এরই মধ্যে পুকুরের দক্ষিণ পাশের বটগাছ থেকে ছোট্ট ডানায় উড়াল দিয়ে নেমে এল নিশিবকের ছানা। কিছুক্ষণ হাঁটল মায়ের সঙ্গে। মধ্যে কোনো এক গাছের উঁচু ডালে বসে কুহু কুহু স্বরে ডেকে উঠল কোকিল।
অধ্যাপক সালেহ রেজা জানালেন, পুকুরটি সংরক্ষিত ঘোষণার কারণে শীতের সময় প্রচুর পাখি আসে। তা ছাড়া সারা বছরই অনেক পাখি থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও দুটি পুকুর আছে। তুতবাগানের পাশের পুকুরটি ফিশারিজ বিভাগের, তারা সেটা নিজেদের মতো করে ব্যবহার করে। অন্যটি শহীদ হবিবুর রহমান হলের পাশের। সেটি ইজারা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পুকুরটি ইজারা না দিয়ে সংরক্ষণ করলে আরও পাখি আসবে।
পর্যটক তারেক অণু বললেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে সবাই আলাদা করে চেনেন। পাখির জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ও এই পরিচিতি পেতে পারে।






