দেশে হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশ হাম-রুবেলার কোনো টিকা পায়নি। মারা যাওয়া শিশুদের ২৬ শতাংশের বয়স ৯ মাসের নিচে।
হামে শিশুমৃত্যুর এই তথ্য দেওয়া হয়েছে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের হাম-রুবেলাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের সভায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিশুদের হাম প্রতিরোধক্ষমতার কমতি ও টিকা কার্যক্রমে নজরদারির ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি এমন হয়েছে।
গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এ বছর ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে হামে ৭০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৬১৫ জন এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৯৩ জনের। রোগতত্ত্ববিদেরা বলেন, প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গ নিয়ে যত মৃত্যু হচ্ছে, তার সবই হামে মৃত্যু বলে বিবেচনা করা হয়।
হাম-রুবেলা কতটা নির্মূল হলো, তা যাচাইয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) আঞ্চলিক কমিশন কলম্বোতে ওই সম্মেলনের আয়োজন করে। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত এই কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করে। একটি দেশ হাম নির্মূলে কতটা অগ্রসর হয়েছে, তা সদস্যদেশের কাছ থেকে প্রতিবেদন পাওয়ার পর সেগুলোর মূল্যায়ন করে এই কমিশন।
.গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এ বছর ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে হামে ৭০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৬১৫ জন এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৯৩ জনের। রোগতত্ত্ববিদেরা বলেন, প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গ নিয়ে যত মৃত্যু হচ্ছে, তার সবই হামে মৃত্যু বলে বিবেচনা করা হয়।.
ওই সভায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরেন হাম ও রুবেলা নির্মূল কার্যক্রম যাচাইয়ের জাতীয় কমিটির (এনভিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান। তিনি সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালকও।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক কমিশনকে প্রতিবেদন দেয় সংশ্লিষ্ট দেশের এনভিসি। এনভিসি সদস্যদেশগুলোর হাম-রুবেলা পরিস্থিতির ওপর নজরদারি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিটি দেশে এনভিসি আছে।
২২-২৩ জুন অনুষ্ঠিত ওই সভায় অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান ছাড়াও বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন সহকারী সচিব, ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের একজন সহকারী অধ্যাপক এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ের রোগ প্রতিরোধবিষয়ক কর্মকর্তা।
দেশের প্রতিটি জেলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক একজন করে মেডিক্যাল কর্মকর্তা আছেন। রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্য তাঁরা অন্যান্য রোগের মতো হাম-রুবেলার তথ্য সংগ্রহ করেন। এসব তথ্যের সাপ্তাহিক বিশ্লেষণের একটি ব্যবস্থা আছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার।
গতকাল মাহমুদুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কলম্বোতে উপস্থাপন করা তথ্য জুন মাসের প্রথমার্ধের। তাতে দেখা গেছে, মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশ হাম-রুবেলার টিকা পায়নি। কিন্তু আমি মনে করি জুনের শেষ সপ্তাহে মৃত্যু বেড়ে যে সাত শর বেশি হওয়ার কথা আমরা জেনেছি, সে ক্ষেত্রেও টিকা না পাওয়ার হার একই হবে।’
.হাম সব বয়সী মানুষের হতে পারে, তবে শিশুরাই হামে বেশি আক্রান্ত হয়। শিশু নয় এমন অনেক মানুষ এ বছরও হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে মুক্তকণ্ঠের একাধিক প্রতিবেদনে ছাপা হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের তথ্যে শিশুদের বয়স, লৈঙ্গিক পরিচয়, আক্রান্ত হওয়ার কত পরে মানুষ হাসপাতালে আসছে, হাসপাতালে আসার কত পরে মৃত্যু ঘটছে, যাদের মৃত্যু হচ্ছে তাদের আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) রাখা হয়েছিল কি না—এ ধরনের কোনো তথ্য থাকে না। কিন্তু মানুষ তা জানতে চায়।
বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে গণমাধ্যমকর্মীরা এসব তথ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেছেন। জনস্বাস্থ্যবিদেরাও এসব তথ্য চেয়ে পাচ্ছেন না। তবে কলম্বোতে কিছু তথ্য বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
টিকা হাম ও রুবেলা থেকে সুরক্ষা দেয়। দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় শিশুর ৯ মাস বয়সে। একই টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় শিশুর ১৫ মাস বয়সে। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, মারা যাওয়া শিশুদের মাত্র ৮ শতাংশ টিকা পেয়েছিল।
.স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের তথ্যে শিশুদের বয়স, লৈঙ্গিক পরিচয়, আক্রান্ত হওয়ার কত পরে মানুষ হাসপাতালে আসছে, হাসপাতালে আসার কত পরে মৃত্যু ঘটছে, যাদের মৃত্যু হচ্ছে তাদের আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) রাখা হয়েছিল কি না—এ ধরনের কোনো তথ্য থাকে না। কিন্তু মানুষ তা জানতে চায়।.
কলম্বোর সভায় উপস্থাপিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ২৬ শতাংশ শিশু মারা গেছে বয়স ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই। ৯ থেকে ১১ মাস বয়সী ১৪ শতাংশ, এক বছর থেকে দুই বছর বয়সী ১৩ শতাংশ, দুই বছর থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১৮ শতাংশ, ৫ থেকে ৯ বছর বয়সী ১৩ শতাংশ এবং ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৪ শতাংশ শিশু। বাকি ১২ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের বেশি। এই পরিসংখ্যান থেকে এটা পরিষ্কার যে খুব ছোট শিশু ছাড়াও বয়স্ক মানুষ হামে আক্রান্ত হচ্ছেন ও মারা যাচ্ছেন।
এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রচার করা হয় টিকার কাভারেজ ভালো, বাস্তবে ভালো না। বহু শিশুকে টিকা না দিয়েই বলা হয়েছে টিকা পেয়েছে, টিকার সাফল্যের কথা গাওয়া হয়েছে। সব পরিসংখ্যান ছিল বানোয়াট। তথ্য-উপাত্তে কারচুপি করা হয়েছে। নজরদারির কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ছিল না কোনো জবাবদিহি। এত সব অনাচারের মূল্য দিতে হলো শিশুদের।
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৮ হাজার ২৬৬ জন হাসপাতালে এসেছে চিকিৎসা নিতে। এই সময় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৫৯৪ জনের। হামের চিকিৎসায় মানুষ ভালোও হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৭৮ হাজার ২৮৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
.প্রচার করা হয় টিকার কাভারেজ ভালো, বাস্তবে ভালো না। বহু শিশুকে টিকা না দিয়েই বলা হয়েছে টিকা পেয়েছে, টিকার সাফল্যের কথা গাওয়া হয়েছে। সব পরিসংখ্যান ছিল বানোয়াট।জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল
এ বছর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড ও মালদ্বীপে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। কলম্বোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কমিশনের সভায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পায় বলে সেখানে উপস্থিত একাধিক প্রতিনিধি মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছেন। তবে বেশি গুরুত্ব পায় শিশুদের টিকা না পাওয়ার বিষয়টি।
২৫ জুন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কলম্বোতে বিশেষজ্ঞরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হামের বিরুদ্ধে জরুরি ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি জানা-বোঝার জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিনিধিদল পাঠানোর অনুরোধও জানানো হয়েছে।






