মগবাজার আউটার সার্কুলার রোডের মাঝামাঝি সেন্টারটির অবস্থান। নিচতলায় পোশাকের দোকান, ক্রেতার ভিড় আর শহরের চেনা কোলাহল। সিঁড়ি বেয়ে তিনতলার ছাদে উঠতেই যেন খুলে গেল অন্য এক জগৎ। খোলা আকাশ, লণ্ঠনের মৃদু আলো, দেয়ালজুড়ে আঁকা নানা কারুকাজ—সব মিলিয়ে নান্দনিক পরিবেশ। কয়েকজন শিল্পী মহড়ায় ব্যস্ত, কেউ আলো ঠিক করছেন, কেউ সাজিয়ে রাখছেন দর্শকের চেয়ার। প্রথম দেখায় মনে হলো, কোনো মিলনায়তনে নয়; পরিচিত কারও ছাদের আড্ডায় বসে নাটক দেখার প্রস্তুতি চলছে। জানা গেল, এমন ঘরোয়া পরিবেশেই দর্শকদের জন্য নতুন নাট্য-অভিজ্ঞতা তৈরি করতে চায় পালাকার। দীর্ঘ বিরতির পর এই ছাদ থেকেই নতুন যাত্রা শুরু করছে দেশের অন্যতম নাট্যদলটি। আজ শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় উদ্বোধন হবে তাদের নতুন নাট্যাঙ্গন ‘পালাকার রুফটপ স্টুডিও’। উদ্বোধন করবেন নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ। একই সন্ধ্যায় মঞ্চস্থ হবে দলের নতুন প্রযোজনা ‘হাজার চুরাশি’।

শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বড় মিলনায়তনের ঝলমলে আলো নয়, বরং দর্শকের একেবারে কাছাকাছি গিয়ে নাটক পরিবেশনের নতুন পথ খুঁজছিল পালাকার। রাজধানীতে নাটক মঞ্চায়নের উপযোগী মিলনায়তন হাতে গোনা। সরকারি মিলনায়তন পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, বেসরকারি মিলনায়তনের ভাড়া অনেক দলের সাধ্যের বাইরে। আবার বড় মঞ্চ পেলেও সব সময় পর্যাপ্ত দর্শক মেলে না, টিকিট বিক্রি করে শোর খরচও উঠে আসে না। এই বাস্তবতায় ছোট পরিসরের স্টুডিও থিয়েটারই হয়ে উঠছে নতুন সম্ভাবনা। সেই ভাবনা থেকেই দর্শক ও শিল্পীর দূরত্ব ঘুচিয়ে ছাদের আঙিনায় গড়ে উঠেছে ‘পালাকার রুফটপ স্টুডিও’।

অবশ্য স্টুডিও থিয়েটার পালাকারের জন্য নতুন নয়। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মগবাজারের দিলু রোড ও বেইলি রোডে ‘পালাকার স্টুডিও’ নামে নিয়মিত নিরীক্ষাধর্মী নাটক মঞ্চস্থ করত দলটি। প্রতি শুক্র ও শনিবার ঘরোয়া পরিবেশে তারা উপস্থাপন করেছে ‘প্রজেক্ট হান্ড্রেড প্লাস’, ‘ডেথ নকস’, ‘টাইমস্কোপ’, ‘মৃত্তিকাকুমারী’, ‘ডাকঘর’-এর মতো প্রযোজনা।

পালাকারের প্রধান আমিনুর রহমান বলেন, ‘নানা সংকটে ২০১০ সালের পর থেকে নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। অনেক স্বপ্ন নিয়ে আমরা বিশাল সেন্টারের ছাদকে কেন্দ্র করে “পালাকার রুফটপ স্টুডিও” চালু করেছি। আমাদের বিশ্বাস যান্ত্রিক শহরের কংক্রিটের ভিড়ে খোলা আকাশ, লণ্ঠনের আলো ও বিশেষ দেয়ালচিত্রের সমন্বয়ে নির্মিত এই স্টুডিও দর্শকদের জন্য একেবারেই ভিন্ন ধরনের অন্তরঙ্গ নাট্য-অভিজ্ঞতা তৈরি করবে। এখানে দর্শক ও অভিনয়শিল্পীর দূরত্ব থাকবে খুব কম। নাটকের প্রয়োজন অনুযায়ী দর্শকসংখ্যা ও পারফরম্যান্স এরিয়া সাজিয়ে নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে। আমরা চাই, ঢাকার আরও নাট্যদল এমন উদ্যোগ নিক। যত বেশি বিকল্প মঞ্চ তৈরি হবে, নাট্যচর্চাও তত বিস্তৃত হবে।’

বিকল্প আঙিনার প্রয়োজন

রাজধানীতে ধীরে ধীরে বিকল্প স্টুডিও থিয়েটারের চর্চা বাড়ছে। সেগুনবাগিচায় অনুস্বর স্টুডিও নিজেদের প্রযোজনা মঞ্চায়নের পাশাপাশি অন্য দলগুলোর মহড়ার জন্যও জায়গা দিচ্ছে। এখানে ভালো সাড়াও পাচ্ছে অনুস্বর। শহরের উপকণ্ঠে দনিয়া এলাকায় দনিয়া স্টুডিও থিয়েটার অনিয়মিতভাবে নাটক ও নাট্যোৎসব আয়োজন করছে। বেশ কয়েকটি সফল উৎসবের আয়োজন করেছে তারা। নাট্যদল তাড়ুয়া মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে নিজেদের স্টুডিও থিয়েটার চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ বছরই হয়তো তারা পুরোদমে নাটক মঞ্চায়ন শুরু করতে পারবে। অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদের উদ্যোগে রাজধানীর গুলশান-২-এর স্পর্ধা অ্যাটেলিয়ারে নিয়মিত কাজ করছে ‘স্পর্ধা: ইনডিপেনডেন্ট থিয়েটার কালেকটিভ’।

নাট্যকর্মীদের মতে, বড় মিলনায়তনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দর্শকের কাছাকাছি ছোট আকারের এমন মঞ্চই ভবিষ্যতের নাট্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পালাকারের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক বলেই মনে করছেন নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ। তাঁর ভাষ্যে, ‘আমাদের সব সময় এমন অল্টারনেট স্পেস বা বিকল্প আঙিনা খুঁজতে হবে, যেখানে দর্শক ও শিল্পীরা খুব কাছাকাছি থেকে অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারবেন। শিল্পকলা একাডেমি বা মহিলা সমিতি সব নাটকের জন্য উপযুক্ত জায়গা নয়। অল্প দর্শকের সামনে ছোট জায়গায় নাটক করার স্টুডিও থিয়েটার ভাবনাটা সময়োপযোগী।’ স্মৃতিচারণা করে তিনি জানান, ১৯৯১ সালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একটি ছোট হলকে ব্যবহার করে ‘বাংলা থিয়েটার’ নামে এমন একটি স্টুডিও থিয়েটারের উদ্যোগ তিনিই প্রথম নিয়েছিলেন।

তিন দিনের প্রদর্শনী

আজকের দিনটি পালাকারের কাছে আরেকটি কারণে বিশেষ, নতুন নাটক দিয়েই তারা যাত্রা করছে নতুন মঞ্চের। উদ্বোধনী প্রযোজনা ‘হাজার চুরাশি’ নির্মিত হয়েছে কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর কালজয়ী উপন্যাস ‘হাজার চুরাশির মা’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। নাট্যরূপ ও নির্দেশনা দিয়েছেন শামীম সাগর। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র শুভ। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার এই তরুণের মরদেহ একটি সরকারি হাসপাতালের মর্গে ১০৮৪ নম্বর ট্যাগ নিয়ে পড়ে থাকে। সন্তানের লাশ শনাক্ত করতে এসে মা রাহেলা বেগম শুধু ব্যক্তিগত শোকের মুখোমুখি হন না; প্রত্যক্ষ করেন ক্ষমতার পালাবদল, সুবিধাবাদ এবং সমাজের নির্মম বাস্তবতাও। একদিকে প্রতিবাদের গল্প, অন্যদিকে তথাকথিত সুশীল সমাজের মুখোশ উন্মোচনের প্রয়াস—এই দুই স্রোতেই এগিয়েছে নাটকটি।

নাটকটি প্রসঙ্গে শামীম সাগর বলেন, ‘মহাশ্বেতা দেবীর কালজয়ী উপন্যাস হাজার চুরাশির মা সব সময়ই অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক জোরালো প্রতিবাদ এবং মানবিকতার অনন্য দলিল। সেই অনুভূতি থেকেই এই নাট্যরূপ। এখানে লাশের কোনো নাম নেই, আছে শুধু একটি সংখ্যা—হাজার চুরাশি। একজন নাট্যকর্মী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, থিয়েটারের কাজ শুধু চলমান সময়কে আয়নায় দেখানো নয়; বরং সময়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্ষতগুলোকে স্পর্শ করা। এই প্রযোজনায় ক্ষমতার পালাবদলের পাশাপাশি তথাকথিত সুশীল সমাজের ভণ্ডামি ও সুবিধাবাদকেও নাট্যভাষায় ধরার চেষ্টা করেছি।’

পালাকার জানিয়েছে, আজ থেকে টানা তিন দিন প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় ‘হাজার চুরাশি’ মঞ্চস্থ হবে। উদ্বোধনী দিনের প্রদর্শনী শুধু আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। পরবর্তী দুই দিনের প্রদর্শনী সাধারণ দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত। বর্তমানে স্টুডিওতে প্রায় ৩০ জন দর্শকের বসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে নাটকের নকশা ও মঞ্চায়নের ধরন অনুযায়ী ভবিষ্যতে আসনসংখ্যা কম–বেশি করা হবে বলে জানিয়েছেন পালাকারের প্রধান আমিনুর রহমান।