১৯৯১ সালের ২১ জুন মুক্তি পেয়েছিল একটি সাধারণ প্রেমের ছবি—‘প্রেম কয়েদি’। সেই ছবির নায়িকা ছিলেন মাত্র ১৬ বছরের এক কিশোরী। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে সদ্য কলেজে পা রাখা সেই মেয়েটি হয়তো তখনো জানতেন না, একদিন তিনি বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকায় পরিণত হবেন। সেই মেয়েটি আর কেউ নন, কারিশমা কাপুর। আজ এ নায়িকার জন্মদিন।
২০২৬ সালে তাঁর অভিষেক চলচ্চিত্রের ৩৫ বছর পূর্ণ হলো। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তিনি শুধু তারকা হননি, বদলে দিয়েছেন বলিউডের নায়িকাদের অবস্থান, জনপ্রিয়তার সংজ্ঞা এবং অভিনয়ের ধরনও। বাণিজ্যিক ছবি থেকে সমালোচকদের প্রশংসা পাওয়া চরিত্র—সব ক্ষেত্রেই নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি।

কাপুর পরিবারের নিয়মভাঙার গল্প
ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী চলচ্চিত্র পরিবার কাপুর পরিবার। কিন্তু মজার বিষয় হলো, একসময় এই পরিবারের মেয়েদের অভিনয়ে আসা নিরুৎসাহিত করা হতো। সেই অলিখিত নিয়ম ভেঙে প্রথম বড় তারকা হিসেবে আবির্ভূত হন কারিশমা।
তাঁর বাবা রণধীর কাপুর এবং মা ববিতা—দুজনই অভিনয়শিল্পী ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই সিনেমার পরিবেশে বেড়ে ওঠা কারিশমা অভিনয়ের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। তবে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বলিউডে নায়িকাদের ক্যারিয়ার দীর্ঘ হতো না। তাই সুযোগ এলে তা হাতছাড়া করতে চাননি তিনি।

মূলত ‘বারসাত’ ছবির মাধ্যমে তাঁর অভিষেক হওয়ার কথা ছিল। ছবিটিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন ববি দেওল। কিন্তু নানা কারণে ছবিটির কাজ পিছিয়ে যায়। অপেক্ষা না করে কারিশমা ‘প্রেম কয়েদি’ দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। পরে দেখা যায়, সেই সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

.

সিনেমাটিতে অভিনয়ের স্মৃতিচারণা করে অভিনেত্রী বলেন, ‘আমার প্রথম ছবি মুক্তি পেয়েছিল ১৭তম জন্মদিনের মাত্র চার দিন আগে। স্কুল শেষ করেই আমি সরাসরি ছবির সেটে চলে গিয়েছিলাম। কয়েক দিন কলেজে গিয়েছিলাম, তারপর শুরু হয় শুটিং। এখন মনে হয়, সময় যেন অবিশ্বাস্য দ্রুত চলে গেছে।’

‘প্রেম কয়েদি’ থেকে তারকাখ্যাতি
অভিষেকের সময় কারিশমাকে নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছিল। তাঁর সাজপোশাক, চেহারা, এমনকি অভিনয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়েই একের পর এক হিট ছবি তাঁকে তারকাখ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়। ‘রাজা হিন্দুস্তানি’, ‘রাজা বাবু’, ‘কুলি নম্বর ওয়ান’, ‘সাজন চলে শ্বশুরাল’, ‘জুড়ওয়া’, ‘হিরো নম্বর ওয়ান’, ‘হাসিনা মান যায়েগি’ কিংবা ‘বিবি নম্বর ওয়ান’—সব ছবিতেই তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতি দর্শকদের মুগ্ধ করে।

বিশেষ করে কমেডি ঘরানার ছবিতে তাঁর টাইমিং ছিল অসাধারণ। অনেক সমালোচকের মতে, নব্বইয়ের দশকে বলিউডের পুরুষপ্রধান কমেডি ছবিগুলোয় নায়িকারা সাধারণত অলংকারের মতো থাকতেন। কিন্তু কারিশমা নিজের ব্যক্তিত্ব ও অভিনয় দিয়ে আলাদা পরিচয় গড়ে তোলেন।

.

গোবিন্দর সঙ্গে জুটি: এক সোনালি অধ্যায়
কারিশমার ক্যারিয়ার নিয়ে কথা বলতে গেলে গোবিন্দর সঙ্গে তাঁর জুটির কথা আলাদাভাবে বলতে হয়।

গোবিন্দ ও কারিশমা একসঙ্গে এমন একাধিক ছবি উপহার দিয়েছেন, যেগুলো এখনো দর্শকদের কাছে বিনোদনের অন্যতম উৎস। তাঁদের নাচ, কমেডি এবং পর্দার রসায়ন ছিল অনন্য।

‘কুলি নম্বর ওয়ান’, ‘হিরো নম্বর ওয়ান’, ‘সাজন চলে শ্বশুরাল’, ‘হাসিনা মান যায়েগি’—এসব ছবি শুধু ব্যবসাসফল হয়নি, জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে।
অনেকের মতে, নব্বইয়ের দশকে বলিউডে সবচেয়ে সফল জুটিগুলোর একটি ছিল গোবিন্দা-কারিশমা জুটি।

.

‘রাজা হিন্দুস্তানি’: ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরানো সাফল্য
১৯৯৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘রাজা হিন্দুস্তানি’ কারিশমার ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করে।

আমির খানের বিপরীতে অভিনীত এই ছবিতে তিনি শুধু গ্ল্যামারাস নায়িকা ছিলেন না; আবেগঘন চরিত্রেও নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন। ছবিটি ব্যাপক ব্যবসাসফল হয় এবং তাঁকে এনে দেয় সেরা অভিনেত্রীর ফিল্মফেয়ার পুরস্কার।
এই ছবির পর কারিশমা আর শুধু জনপ্রিয় নায়িকা নন, দক্ষ অভিনেত্রী হিসেবেও স্বীকৃতি পান।

.

‘দিল তো পাগল হ্যায়’: অভিনয়ের নতুন স্বীকৃতি
১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ তাঁর ক্যারিয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। মাধুরী দীক্ষিত ও শাহরুখ খানের মতো তারকার উপস্থিতির মধ্যেও কারিশমা নিজের অবস্থান স্পষ্টভাবে জানান দেন। নীশা চরিত্রে তাঁর অভিনয় এতটাই প্রশংসিত হয় যে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব–অভিনেত্রীর সম্মান অর্জন করেন।

এই ছবিই প্রমাণ করে, তিনি শুধু বাণিজ্যিক তারকা নন; অভিনয়দক্ষতাতেও তিনি সমান শক্তিশালী।

.৩০ বছর পর হঠাৎ ভাইরাল সেই অভিনেত্রী.

অনেকের মতে, কারিশমার ক্যারিয়ারের সেরা অভিনয় এসেছে ‘জুবেইদা’ ছবিতে।
খ্যাতিমান নির্মাতা শ্যাম বেনেগালের পরিচালনায় নির্মিত এই ছবিতে তিনি এমন এক চরিত্রে অভিনয় করেন, যা তাঁর আগের ইমেজের সঙ্গে পুরোপুরি ভিন্ন ছিল।
একজন জটিল, স্বপ্নবিলাসী এবং ট্র্যাজিক নারীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় সমালোচকদের মুগ্ধ করে। ছবিটি তাঁকে নতুন মর্যাদা দেয় এবং প্রমাণ করে, তিনি চাইলে যেকোনো ধরনের চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন।

পরে এক সাক্ষাৎকারে কারিশমা বলেন, শ্যাম বেনেগালের সঙ্গে কাজ করা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বড় শিক্ষার অভিজ্ঞতা।

ব্যক্তিগত জীবনের বাঁক
২০০৩ সালে ব্যবসায়ী সঞ্জয় কাপুরকে বিয়ে করার পর অভিনয় থেকে অনেকটাই দূরে সরে যান কারিশমা।
সন্তান, পরিবার এবং ব্যক্তিজীবনকে সময় দিতে ক্যারিয়ারে বিরতি নেন কারিশমা। কিন্তু সেই সংসার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে জীবনের কঠিন এক সময় পার করতে হয় তাঁকে।
তবে তিনি ভেঙে পড়েননি; বরং নতুনভাবে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছেন। মুম্বাইয়ে ফিরে এসে আবার কাজ শুরু করেন।

নতুন যুগে নতুন কারিশমা
ডিজিটাল যুগে নব্বইয়ের অনেক তারকা হারিয়ে গেলেও কারিশমা নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন। ওয়েব সিরিজ ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে তাঁর উপস্থিতি নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে তাঁকে আবার পরিচিত করে তুলেছে।
‘মেন্টালহুড’, ‘মার্ডার মুবারক’ কিংবা ‘ব্রাউন’-এর মতো প্রজেক্টে তিনি দেখিয়েছেন, বয়স বা সময় কোনো শিল্পীর সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে না।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে