চট্টগ্রামের বাঁশখালী ইকোপার্কে এখনো ঘুরে বেড়ায় বুনো হাতি। রাত নামলে ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়ে মেছো বিড়াল, চিতা বিড়াল, গোর খোদক ও শজারুর মতো প্রাণী। জলাধারের ধারে দেখা মেলে জলপিপির। গাছের ডালে বসে ডাক দেয় বউকথা কও। সরীসৃপের মধ্যে রয়েছে তক্ষক, রামগাদি গুইসাপ ও রক্তচোষা।
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে এমনই এক সমৃদ্ধ বন্য প্রাণিজগতের চিত্র। জরিপে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের বাঁশখালী ইকোপার্কে অন্তত ১৭৩ প্রজাতির বন্য প্রাণীর উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে ২৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১২৬ প্রজাতির পাখি, ১৬ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী শনাক্ত করা হয়েছে।
‘বাঁশখালী ইকোপার্কে বন্য প্রাণীর বৈচিত্র্যের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন’ শীর্ষক জরিপটি ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৪-২৫ মেয়াদে পরিচালিত হয়। দিনের বেলা নির্দিষ্ট পথ ধরে সরেজমিন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আর নিশাচর প্রাণী শনাক্তে ব্যবহার করা হয় ক্যামেরা ট্র্যাপ। জরিপ প্রতিবেদনটি বিএফআরইয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে জমা দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে বাঁশখালী উপজেলার জলদী রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবস্থিত বাঁশখালী ইকোপার্ক। চুনতি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যের আওতাধীন জলদী বন বিটের প্রায় ১ হাজার হেক্টর এলাকা নিয়ে এর বিস্তৃতি।
বামেরছড়া ও ডানেরছড়ার বনভূমি, ছোট-বড় পাহাড়, ছড়া এবং কৃত্রিম জলাধার মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এর প্রাকৃতিক পরিবেশ। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, গবেষণা, পরিবেশ শিক্ষা ও ইকো-টু৵রিজমের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০৩-০৪ অর্থবছরে ইকোপার্কটির যাত্রা শুরু হয়।
.মহাবিপন্ন হাতির আবাস
জরিপে পাওয়া স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এশীয় হাতি। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, সারা বছরই ২০ থেকে ২৫টি হাতি ইকোপার্ক ও আশপাশের বনাঞ্চলে বিচরণ করে।
একসময় এই বনাঞ্চল হাতি, হরিণ, ভালুক, সাম্বার, চিতা বিড়াল ও উদ্বিড়ালের জন্য পরিচিত ছিল। দীর্ঘদিন বন উজাড়, দখল ও মানুষের চাপের কারণে অনেক প্রজাতি সংকটে পড়লেও হাতি এখনো এ বনাঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাসিন্দা।
.ইকোপার্কের জীববৈচিত্র্যের জন্য কয়েকটি বড় হুমকি রয়েছে। এর মধ্যে আছে ফলদ বৃক্ষের স্বল্পতা, মানুষ-বন্য প্রাণী দ্বন্দ্ব, পার্কের ভেতরে সবজি চাষ, জ্বালানিকাঠ সংগ্রহ এবং শীত মৌসুমে দর্শনার্থীদের কারণে জলচর পাখির আবাসস্থলে বিঘ্ন সৃষ্টিআনিসুর রহমান, জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা, বন গবেষণা ইনস্টিটিউট
জরিপে হাতির পাশাপাশি বানর, বাদামি কাঠবিড়ালি, বুনো শূকর, গোরখোদক, চিতা বিড়াল ও মেছো বিড়ালের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এসব প্রাণীর উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে বনটির খাদ্যশৃঙ্খল এখনো অনেকাংশে কার্যকর রয়েছে।
জরিপে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে পাখি। মোট ১২৬ প্রজাতির পাখি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা।
এর মধ্যে রয়েছে শামুকখোল, বড় পানকৌড়ি, বনমুরগি, বড়টিয়া, বেঘবৌ ও ছোট সরালি মতো প্রজাতি।
.বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তারা বলছেন, এত বিপুলসংখ্যক পাখির উপস্থিতি প্রমাণ করে যে ইকোপার্কের বন, জলাধার ও জলাভূমি এখনো নানা প্রজাতির পাখির জন্য উপযোগী আবাসস্থল হিসেবে টিকে আছে।
স্তন্যপায়ী ও পাখির পাশাপাশি সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীর উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। জরিপে ১৬ প্রজাতির সরীসৃপ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে রামগাদি গুইসাপ, তক্ষক, অঞ্জনী ও রক্তচোষা। উভচরের মধ্যে রয়েছে কুনোব্যাঙ, কটকটি ব্যাঙ, সোনাব্যাঙ ও গেছো ব্যাঙসহ ৮ প্রজাতি।
.গবেষকদের মতে, সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীর উপস্থিতি কোনো বনাঞ্চলের পরিবেশগত স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এ ধরনের প্রাণী সাধারণত পরিবেশের পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের প্রাণী জরিপে চুনতি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য এলাকায় ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৫৩ প্রজাতির পাখি, ৭ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৪ প্রজাতির উভচরের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল। দীর্ঘদিন পান চাষ, বন দখল এবং বৃক্ষনিধনের কারণে অনেক প্রজাতি সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল। তবে সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, বর্তমানে প্রজাতির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
.গবেষকদের মতে, সংরক্ষণ কার্যক্রম, বন পুনরুদ্ধার এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল টিকে থাকার ফলে জীববৈচিত্র্যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
তবে সবকিছুই যে আশাব্যঞ্জক, তা নয়। জরিপের কাজে নেতৃত্ব দেওয়া বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, ইকোপার্কের জীববৈচিত্র্যের জন্য কয়েকটি বড় হুমকি রয়েছে। এর মধ্যে আছে ফলদ বৃক্ষের স্বল্পতা, মানুষ-বন্য প্রাণী দ্বন্দ্ব, পার্কের ভেতরে সবজি চাষ, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ এবং শীত মৌসুমে দর্শনার্থীদের কারণে জলচর পাখির আবাসস্থলে বিঘ্ন সৃষ্টি।
আনিসুর রহমান বলেন, মহাবিপন্ন এশীয় হাতির জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যগাছ ও চারণ উদ্ভিদেরও ঘাটতি রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান করা না গেলে ভবিষ্যতে জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তবু দ্রুত নগরায়ণ ও বনভূমি সংকোচনের এ সময়ে বাঁশখালী ইকোপার্ক এখনো হাতি, মায়াহরিণ, চিতা বিড়াল, মেছো বিড়াল, শামুকখোল, কালো গুইসহ অসংখ্য বন্য প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয় হয়ে টিকে আছে।






