মেয়ের কলেজে হোস্টেলের সিট বরাদ্দ দেওয়া হবে। এ জন্য বাবা আরিফুর রহমান চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থেকে রওনা দিয়েছিলেন মেয়ের কলেজের উদ্দেশে। কক্সবাজারের চকরিয়ায় নানাবাড়ি থেকে মেয়ে সুমাইয়াও রওনা দিয়েছিলেন কলেজের পথে। রাঙ্গুনিয়া থেকে বাসে উঠে মেয়ে কত দূর এসেছে, তা জানতে মুঠোফোনে কল করেন বাবা। ফোন ধরেন অচেনা এক তরুণ। বলেন, মুঠোফোনের মালিক বেঁচে নেই।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বারান্দায় দাঁড়িয়ে এ কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন আরিফুর রহমান। বলেন, ‘আমার মাথায় তখন আকাশ ভেঙে পড়ল। কী শুনলাম আমি। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ও তো সুমাইয়ার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। তারপর শুনলাম এই খবর। আমি অসুস্থ মানুষ। এই শোক কীভাবে বইব? মেয়ে স্বপ্ন দেখত, পড়াশোনা শেষ করে চাকরি নিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়াবে, কিন্তু মেয়েটিই এখন নেই। এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।’

.

গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন আরিফুর রহমানের কলেজপড়ুয়া মেয়ে সুমাইয়া জান্নাত (২০)। উপজেলার চুনতি বাজার এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে এ ঘটনা ঘটে।

.

চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়ার বাড়ি বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি ইউনিয়নের আরব শাহ ঘোনাপাড়া জমিদারবাড়ি এলাকায়। বাবা আরিফুর রহমান পেশায় মসজিদের ইমাম। মা ও ভাইবোনদের নিয়ে সুমাইয়ারা থাকতেন কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার মালুমঘাট এলাকায় নানার বাড়িতে। আর বাবা কাজের সূত্রে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায়। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সুমাইয়া সবার বড়।

.
গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন আরিফুর রহমানের কলেজপড়ুয়া মেয়ে সুমাইয়া জান্নাত (২০)। উপজেলার চুনতি বাজার এলাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে এ ঘটনা ঘটে।
.

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে হাইওয়ে পুলিশ জানায়, লোহাগাড়ার চুনতি বাজার এলাকায় কক্সবাজারগামী ইম্পিরিয়াল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে এবং চট্টগ্রামগামী পূরবী পরিবহনের অন্য একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় বাসের সামনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েকজন যাত্রী আহত হন। এর মধ্যে গুরুতর আহত হন সুমাইয়া জান্নাত। লোহাগাড়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

.

গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, মেয়ের লাশের সামনে আহাজারি করছেন মা ইয়াছমিন আক্তার। পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন বাবা আরিফুর রহমান। কান্না করতে করতে ইয়াছমিন আক্তার বলছিলেন, ‘কলেজের হোস্টেলে আজ (গতকাল) সিট বরাদ্দ দেওয়ার কথা ছিল। নোটিশ দিয়ে জানানো হয়েছিল, অভিভাবক নিয়ে যেতে হবে। এ জন্য সুমাইয়ার বাবা রাঙ্গুনিয়া থেকে কলেজে আসছিলেন। তিনি অপেক্ষা করবেন বলে মেয়েটি সকাল সাতটায় ভাত খেয়ে তাড়াহুড়া করে বাড়ি থেকে বের গেল। যাওয়ার সময় বলেছিলাম, এত তাড়া কিসের? পাঁচ মিনিট পর বের হও, কিন্তু মেয়ে কথা শোনেনি।’ ইয়াছমিন আক্তারের আক্ষেপ, ‘পাঁচ মিনিট পর বের হলে হয়তো আমার মেয়েটা বেঁচে যেত।’

দোহাজারী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহ উদ্দিন চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং দুর্ঘটনাকবলিত বাস দুটি জব্দ করে। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কলেজছাত্রীর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই দুই বাসের চালক পালিয়ে গেছেন। এ ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।