ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। মহাসড়কের পাশে খালের পানিতে ভাসছিল একটি স্যুটকেস। সেটা দেখে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে কৌতূহল শুরু হয়। খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই স্যুটকেস উদ্ধার করে পাড়ে আনে পুলিশ। ততক্ষণে চারপাশে কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমে গেছে।

স্যুটকেস খুলতেই দেখা যায়, ভেতরে একটি বড় বস্তা। বস্তার মুখ খোলার পর বেরিয়ে আসে এক তরুণীর মরদেহ। সঙ্গে ছিল পাঁচটি ইট। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছিল আঘাতের চিহ্ন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে স্যুটকেসে ভরে খালে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

.
স্যুটকেসটি খোলার পর দেখা যায়, ভেতরে বড়সড় একটি বস্তা রাখা। বস্তার মুখ খুলতেই বেরিয়ে আসে এক তরুণীর মরদেহ। সঙ্গে রাখা ছিল পাঁচটি ইট। তরুণীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছিল আঘাতের চিহ্ন। প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়, পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর মরদেহ গুম করতে স্যুটকেসে ভরে খালে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
.

ঘটনাটি ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর ভোরের। ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের গৌরীপুরের গঙ্গাশ্রম এলাকার ওই খাল থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহটির পরিচয় তখন অজানা। কে এই তরুণী, কেন তাঁকে হত্যা করা হয়েছে, কীভাবে তাঁর মরদেহ সেখানে এল—কোনো প্রশ্নের উত্তরই ছিল না তদন্তকারীদের কাছে।

তদন্তের শুরুতে দেশের বিভিন্ন থানায় তালিকাভুক্ত নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য যাচাই করে মরদেহের পরিচয় খোঁজার চেষ্টা করে পুলিশ। কিন্তু কোনো মিল পাওয়া যায়নি। পরে মামলার তদন্তভার যায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে হত্যার নেপথ্যের গল্প।

.

তদন্ত শুরুর পর পিবিআইয়ের কর্মকর্তাদের নজরে আসে স্যুটকেসের ভেতরে পাওয়া কয়েকটি পুরোনো প্রেসক্রিপশন। শুরুতে এগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত বলে মনে করা হয়নি। কিন্তু তদন্ত যত আগায়, প্রেসক্রিপশনের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। প্রেসক্রিপশনের তথ্য যাচাই করতে গিয়ে ঘুরে যায় তদন্তের মোড়।

.

এ পর্যায়ে তদন্তকারীরা একটি নাম–ঠিকানা খুঁজে পান। সেটার সূত্র ধরে তদন্ত দল ময়মনসিংহ শহরের একটি আবাসিক ভবনের একটি ফ্ল্যাটে গিয়ে পৌঁছায়। সেখানেই মেলে খুনের প্রকৃত কারণ, নিহত ব্যক্তির নাম–পরিচয়।

পিবিআইয়ের তদন্তে জানা যায়, নিহত তরুণীর নাম সাবিনা। বয়স ২১ বছর। বাড়ি ময়মনসিংহে। তিনি শহরের ওই ফ্ল্যাটে গৃহকর্মীর কাজ করতেন। ফ্ল্যাটটির বাসিন্দা ছিলেন আবুল খায়ের জাকির হোসেন ও তাঁর স্ত্রী রিফাত জেসমিন জেসি।

কয়েক বছর ধরে সাবিনা ওই বাসায় কাজ করতেন। তদন্তে উঠে আসে, জাকির–রিফাত দম্পতি তাঁকে হত্যা করেন। পরে মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে বস্তা ও স্যুটকেসে ভরে খালে ফেলে আসেন। সিসিটিভি ফুটেজ, মুঠোফোনের অবস্থানের তথ্য–উপাত্ত এবং উদ্ধার হওয়া আলামতের তথ্য মিলিয়ে তদন্তকারীরা এ বিষয়ে নিশ্চিত হন।

পর্যাপ্ত তথ্য–প্রমাণ পাওয়ার পর ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি জাকির-রিফাত দম্পতিকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। এরপর ওই দম্পতি সাবিনা হত্যার পেছনের গল্প পুলিশকে জানান।

.
গৃহকর্মী সাবিনার মরদেহ গুম করতে চেয়েছিলেন খুনিরা। এ জন্য বস্তায় মরদেহ ভরে ইট রাখা হয়েছিল, যাতে বস্তাটি পানিতে ডুবে থাকে। কিন্তু মরদেহ ভরা স্যুটকেসে কয়েকটি পুরোনো প্রেসক্রিপশন রয়ে গিয়েছিল। প্রেসক্রিপশন ও প্রযুক্তিগত আলামত খুনিদের শনাক্তে পুলিশকে সহায়তা করেছে।
মোস্তফা কামাল, পিবিআইয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক
.

তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর সকালে অসুস্থতার কারণে সময়মতো ঘুম থেকে উঠতে পারেননি সাবিনা। এতে ক্ষুব্ধ হন গৃহকর্ত্রী রিফাত। তিনি সাবিনাকে মারধর করেন। চুল ধরে টানাহেঁচড়া করেন। একপর্যায়ে সাবিনার মাথা ঘরের দেয়ালে ঠুকে দেন রিফাত। নির্যাতনের একপর্যায়ে সাবিনার মৃত্যু হয়।

ঘটনার সময় জাকির বাসায় ছিলেন না। পরে বাসায় ফিরে স্ত্রী রিফাতের কাছ থেকে পুরো ঘটনা শোনেন। এরপর দুজন মিলে হত্যার ঘটনা গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নেন। একই সঙ্গে মরদেহ গুম করার পরিকল্পনাও করেন।

পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, সাবিনার মরদেহ শুরুতে একটি বস্তার ভরে রাখা হয়। পানিতে ফেলে দেওয়ার পর মরদেহ যাতে ভেসে না ওঠে, এ জন্য ওই বস্তায় পাঁচটি ইট ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। পরে মরদেহ ভরা বস্তাটি একটি পুরোনো স্যুটকেসে রাখা হয়।

.‘ফাঁদে’ ফেলে কলেজছাত্রকে হত্যা, নেপথ্যে প্রেম, বিচ্ছেদ, ব্ল্যাকমেল: পিবিআই.

হত্যার দিন রাতে ওই আবাসিক ভবনের সিসিটিভিতে একটি দৃশ্য ধরা পড়ে। সেখানে দেখা যায়, লিফটে করে একটি ভারী স্যুটকেস নামানো হয়। বাইরে থেকে দেখতে সাধারণ একটি স্যুটকেসের মতো ছিল। ভেতরে যে একজন মানুষের মরদেহ আছে, তা বোঝার কোনো উপায় ছিল না। পরে স্যুটকেসটি একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে তোলা হয়।

মুঠোফোনের অবস্থানের তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, গাড়িটি শুরুতে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়ক ধরে যায়। কয়েক ঘণ্টা পর গাড়ি গৌরীপুরের গঙ্গাশ্রম এলাকায় পৌঁছায়। গাড়ি থামিয়ে খালের পানিতে ফেলে দেওয়া হয় মরদেহ ভরা স্যুটকেসটি। জাকির-রিফাত দম্পতির ধারণা ছিল, এর মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যাবে সাবিনা হত্যার সব প্রমাণ।

পিবিআইয়ের তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, সাবিনাকে নিয়মিত খাবার দেওয়া হতো না। বাসার বাইরে যেতে দেওয়াও হতো না। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল সীমিত। অনেক সময় তাঁকে বাসার একটি কক্ষে আটকে রাখা হতো। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও নির্যাতনের কারণে সাবিনা শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন।

.এআই দিয়ে আসামি শনাক্ত, নথি পোড়াতে বিয়াম ভবনে আগুন লাগানো হয়: পিবিআই.

সাবিনা যে আর বেঁচে নেই—সেটা তাঁর পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়নি। ফোন করলে পরিবারের সদস্যদের বলা হতো, সাবিনা ভালো আছে। আগের মতোই কাজ করছে। দেখা করতে চাইলে বিভিন্ন অজুহাতে এড়িয়ে যেতেন জাকির ও রিফাত। এমনকি সাবিনার পরিবারকে নিয়মিত টাকাও পাঠাতেন তাঁরা।

এসব কারণে সাবিনার পরিবারের সদস্যরাও সন্দেহ করেনি। তাঁদের ধারণা ছিল, সাবিনা বেঁচে আছেন। আগের মতোই ময়মনসিংহে কাজ করছেন। পরে পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা তাঁদের জানান, সাবিনা বেঁচে নেই। তাঁকে খুন করা হয়েছে। মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

পিবিআইয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, গৃহকর্মী সাবিনার মরদেহ গুম করতে চেয়েছিলেন খুনিরা। এ জন্য বস্তায় মরদেহ ভরে ইট রাখা হয়েছিল, যাতে বস্তাটি পানিতে ডুবে থাকে। কিন্তু মরদেহ ভরা স্যুটকেসে কয়েকটি পুরোনো প্রেসক্রিপশন রয়ে গিয়েছিল। প্রেসক্রিপশন ও প্রযুক্তিগত আলামত খুনিদের শনাক্তে পুলিশকে সহায়তা করেছে।

.মামলা তদন্তের দক্ষতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে পিবিআই: আইজিপি