হলিউড তারকা ক্রিস প্র্যাট আজ চেনা মুখ। কিন্তু বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা হওয়ার আগে তাঁকে কাটাতে হয়েছে বেকারত্ব, গৃহহীনতা ও অনিশ্চয়তার দিন। একসময় হাওয়াইয়ের সমুদ্রসৈকতে ভ্যানে রাত কাটানো যুবকই পরে হয়ে উঠেছেন মার্ভেল ও জুরাসিক ওয়ার্ল্ড ফ্র্যাঞ্চাইজির মুখ। ব্যক্তিগত জীবনে প্রেম, বিয়ে, বিচ্ছেদ এবং নতুন করে সংসার—সব মিলিয়ে ক্রিস প্র্যাটের জীবন যেন সিনেমার চেয়েও নাটকীয়। আজ ২১ জুন অভিনেতার জন্মদিন। এ উপলক্ষে আলো ফেলা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারে।
ছোট শহরের ছেলেটি
১৯৭৯ সালের ২১ জুন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের ভার্জিনিয়া শহরে জন্ম নেন ক্রিস্টোফার মাইকেল প্র্যাট। তাঁর বাবা ড্যানিয়েল প্র্যাট খনি ও নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আর মা ক্যাথলিন প্র্যাট কাজ করতেন সুপারমার্কেটে। শৈশবে পরিবার নিয়ে ওয়াশিংটনের লেক স্টিভেন্সে চলে যান তিনি।
ছোটবেলায় অভিনয়ের চেয়ে খেলাধুলার প্রতিই বেশি আগ্রহ ছিল প্র্যাটের। স্কুলে কুস্তিগির হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু পড়াশোনায় খুব একটা মন বসেনি। উচ্চমাধ্যমিকের পর কমিউনিটি কলেজে ভর্তি হলেও বেশি দিন টেকেননি। কয়েক মাসের মধ্যেই পড়াশোনা ছেড়ে দেন।
.গৃহহীনতার দিনগুলো
কলেজ ছাড়ার পর শুরু হয় অনিশ্চিত জীবন। কখনো ডিসকাউন্ট টিকিট বিক্রি করেছেন, কখনো ছোটখাটো কাজ করেছেন। পরে চলে যান হাওয়াইয়ের মাউই দ্বীপে। সেখানে অর্থাভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে অনেক সময় ভ্যানে কিংবা সমুদ্রসৈকতের তাঁবুতে রাত কাটাতে হয়েছে প্র্যাটকে।
পরে এক সাক্ষাৎকারে প্র্যাট বলেছিলেন, তখন তাঁর পকেটে টাকা কম ছিল, কিন্তু স্বাধীনতা ছিল অনেক। যদিও ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না, তবু তিনি বিশ্বাস করতেন একদিন বিখ্যাত হবেন। সেই সময় মাউইয়ের একটি রেস্তোরাঁয় ওয়েটারের কাজ করতেন তিনি। সেখানেই ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে। অভিনেত্রী ও পরিচালক রে ডন চং তাঁর মধ্যে অভিনয়ের সম্ভাবনা দেখতে পান এবং একটি ছবিতে সুযোগ দেন। সেখান থেকেই শুরু।
.টেলিভিশনে উত্থান
প্রথম দিকে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করলেও দর্শকের নজরে আসেন টিভি সিরিজ ‘এভারউড’-এ। এরপর ‘দ্য ও.সি’-তেও অভিনয় করেন। তবে প্র্যাটের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয় কমেডি সিরিজ ‘পার্কস অ্যান্ড রিক্রিয়েশন’।
অ্যান্ডি ডোয়্যার চরিত্রে তাঁর সহজাত হাস্যরস, সরলতা এবং পর্দা দখল করে নেওয়ার ক্ষমতা দর্শকদের মুগ্ধ করে। তখনো অবশ্য কেউ ভাবেনি এই হাস্যরসাত্মক অভিনেতাই একদিন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অ্যাকশন তারকাদের একজন হয়ে উঠবেন।
শরীর বদলে ভাগ্যবদল
২০১০-এর দশকের শুরুতে প্র্যাটকে বেশির ভাগ দর্শকই চিনতেন মোটাসোটা কমেডি অভিনেতা হিসেবে। কিন্তু তিনি নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে বড় ঝুঁকি নেন। মার্ভেলের ‘গার্ডিয়ানস অব দ্য গ্যালাক্সি’ ছবির জন্য তাঁকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ওজন কমাতে হয়। কঠোর ব্যায়াম ও খাদ্যনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তিনি নিজের শরীর পুরোপুরি বদলে ফেলেন। কয়েক মাসের মধ্যে এক নতুন ক্রিস প্র্যাটকে দেখল হলিউড। ২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলে। স্টার-লর্ড বা পিটার কুইল চরিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত করে।
মার্ভেল থেকে ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’
‘গার্ডিয়ানস অব দ্য গ্যালাক্সি’-র সাফল্যের পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। প্র্যাট যোগ দেন ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ইনফিনিটি ওয়ার’এবং ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’-এর মতো সুপারহিট ছবিতে। এর পাশাপাশি ২০১৫ সালে মুক্তি পায় ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড’। ‘ওয়েন গ্র্যাডি’ চরিত্রে তাঁর উপস্থিতি ছবিটিকে নতুন প্রাণ দেয়। ছবিটি বিশ্বব্যাপী বক্স অফিসে বিপুল সাফল্য পায় এবং প্র্যাটের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। পরে তিনি এর একাধিক সিক্যুয়েলেও অভিনয় করেন। ‘মার্ভেল’ ও ‘জুরাসিক’—দুটি বিশাল ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রধান মুখ হওয়া খুব কম অভিনেতার পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। ক্রিস প্র্যাট সেই বিরল কৃতিত্বের অধিকারী।
শুধু পর্দায় নয়, কণ্ঠ দিয়েও দর্শকদের মন জয় করেছেন প্র্যাট। ‘দ্য লেগো মুভি’–তে ও ‘দ্য সুপার মারিও ব্রস. মুভি’–তে কণ্ঠ দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছেও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
.সেদিনের ছোট্ট মেয়েটি এখন জনপ্রিয় নায়িকা, ১২০ কোটি টাকার মালিক.ব্যক্তিগত জীবনও শিরোনামে
২০০৭ সালে অভিনেত্রী আনা ফারিসের সঙ্গে পরিচয় হয় প্র্যাটের। দুজনের প্রেম দ্রুত গভীর হয় এবং ২০০৯ সালে বিয়ে করেন তাঁরা। হলিউডের জনপ্রিয় দম্পতিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই জুটি। ২০১২ সালে তাঁদের ছেলে জ্যাকের জন্ম হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়তে থাকে। অবশেষে ২০১৭ সালে বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন তাঁরা এবং ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়। বিচ্ছেদের খবর ভক্তদের জন্য ছিল বড় ধাক্কা। কারণ, হলিউডে তাঁদের সম্পর্ককে অনেকেই আদর্শ দাম্পত্যের উদাহরণ হিসেবে দেখতেন।
বিচ্ছেদের পর প্র্যাটের জীবনে আসেন ক্যাথেরিন শোয়ার্জনেগার। তিনি হলিউড তারকা আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের মেয়ে। ২০১৯ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। এরপর একে একে তাঁদের সংসারে সন্তান আসে। বর্তমানে প্র্যাট চার সন্তানের বাবা। পরিবারকে তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ বলে মনে করেন।
সম্পদের পাহাড়
আজ ক্রিস প্র্যাট হলিউডের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেতাদের একজন। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য আর্থিক বিশ্লেষণ সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় এক হাজার কোটি টাকা)। বড় বাজেটের ফ্র্যাঞ্চাইজি চলচ্চিত্র, প্রযোজনা, বিজ্ঞাপন এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক উদ্যোগ থেকে এই সম্পদ গড়ে তুলেছেন তিনি।
আইএমডিবি, পিপলডটকম ও ভোগ অবলম্বনে






