আজ বাবা দিবসে লিখেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাজমুস সাকিব

.

আমি রাজশাহীর সন্তান। মা-বাবা দুজনই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। ছোটবেলায় আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজগুলোর একটি ছিল বাবার মোটরসাইকেলে চড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়ানো । প্রায়ই আমাকে মতিহারের সবুজ চত্বরে নিয়ে আসতেন বাবা। কখনো তাঁর নিজের বিভাগ দেখাতেন, কখনো মায়ের বিভাগ। আর প্যারিস রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে ছাত্রজীবনের নানা গল্প শোনাতেন। তখন বুঝতাম না, সেই গল্পগুলো আমার ভেতরে একটি স্বপ্ন বুনে দিয়েছিল। মনে মনে ভাবতাম, একদিন আমিও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হব।

আমার বাবা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৯৬-৯৭ শিক্ষাবর্ষের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর মুখে ক্যাম্পাসের গল্প শুনে বড় হয়েছি। শহীদ মিনার, প্যারিস রোড, বিভাগীয় অনুষ্ঠান কিংবা হলজীবনের স্মৃতি—সবকিছুই যেন আমার নিজের গল্প হয়ে উঠেছিল। সময় গড়িয়েছে। আজ আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমি যেন বাবার ফেলে যাওয়া কোনো অসমাপ্ত পথ ধরে হাঁটছি।

.

তবে সবচেয়ে বেশি আবেগ কাজ করে যখন ভাবি, বাবা তাঁর ছাত্রজীবনে যে হলে থাকতেন, আমিও সেই একই হলের শিক্ষার্থী। শহীদ জিয়াউর রহমান হলের করিডর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখনো কখনো মনে হয়, কয়েক দশক আগে বাবা হয়তো এই পথেই বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে হেঁটেছেন। আমার ও বাবার একই ক্যাম্পাস, একই হল—এটা যখন ভাবি, খুব ভালো লাগে।

শুধু ক্যাম্পাস নয়, সময়ের সঙ্গে আমাদের ভূমিকারও পরিবর্তন হয়েছে। ছোটবেলায় পয়লা বৈশাখে বাবার হাত ধরে ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অনুষ্ঠানে যেতাম। বাবা আমাকে তাঁর বিভাগের আনন্দ-উৎসব দেখাতেন। আর এখন আমার বিভাগের অনুষ্ঠান দেখতে আসেন বাবা।

গত পয়লা বৈশাখে বিভাগের র‍্যালিতে আমি বর সেজেছিলাম। পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নাটকে ‘মন্টু ঘটক’ চরিত্রে অভিনয় করি। মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করার সময় একবার দর্শকসারির দিকে তাকিয়ে দেখি বাবা বসে আছেন। তাঁর মুখের হাসিটা আজও মনে পড়ে। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, ছোটবেলায় যিনি আমাকে এই ক্যাম্পাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, আজ তিনি আমার আনন্দের অংশ হতে এসেছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের পরিবারের কাছে শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটা স্মৃতি, স্বপ্ন, ভালোবাসা আর উত্তরাধিকারের নাম। বাবার হাত ধরে যে ক্যাম্পাসে প্রথম পথচলা শুরু হয়েছিল, আজ সেই ক্যাম্পাসেই নিজের পরিচয় গড়ে তুলছি। বাবা দিবসে এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।