গৃহিণী রাবেয়া বেগম। স্বামী ভ্যানচালক মো. মামুন। ১২ বছরের সংসারে তাঁদের তিন কন্যাসন্তান ছিল। পরে আবার অন্তঃসত্ত্বা হন রাবেয়া। সাত মাসের গর্ভাবস্থায় ওষুধ না আনার বিষয়ে স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া হয় তাঁর। ঝগড়ার একপর্যায়ে মামুন ক্ষিপ্ত হয়ে রাবেয়ার তলপেটে লাথি দেন। ঘটনাস্থলেই মারা যান রাবেয়া। একই সঙ্গে গর্ভস্থ দুই সন্তানও মারা যায়।
ঘটনাটি ঘটে ৯ বছর আগে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের হারামিয়া ইউনিয়নের পূর্ব কাচিয়াপারের গুচ্ছগ্রামে। স্ত্রীর মৃত্যুর পর মামুন নিজের ভ্যানে করে লাশ নিয়ে যান বাড়ির কাছাকাছি নির্জন বিলে। সেখানে স্ত্রীর লাশে আগুন ধরিয়ে দেন তিনি। এতে রাবেয়ার শরীরের প্রায় অর্ধেক অংশ পুড়ে যায়।
মামলার নথি ও নিহত রাবেয়ার পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সালে মো. মামুনের সঙ্গে রাবেয়া বেগমের বিয়ে হয়। তাঁদের প্রথমে একটি কন্যাসন্তান, পরে যমজ কন্যাসন্তান হয়। পরপর তিনটি কন্যাসন্তান হওয়ায় মামুন অসন্তুষ্ট ছিলেন। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর গর্ভে আবার যমজ সন্তান রয়েছে জেনে তিনি ধারণা করেছিলেন দুটিই কন্যাসন্তান হবে। এ নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া হতো।
২০১৭ সালের ২৩ মে অন্তঃসত্ত্বা রাবেয়ার জন্য ওষুধ আনার কথা ছিল মামুনের। তা না আনায় স্ত্রী কারণ জানতে চাইলে দুজনের ঝগড়া হয়। মামুন ক্ষিপ্ত হয়ে রাবেয়ার তলপেটে লাথি দেন। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় রাবেয়ার। লাশ গোপন করতে মামুন নিজের ভ্যানে করে লাশ নিয়ে যান বাড়ির কাছাকাছি নির্জন বিলে এবং আগুন ধরিয়ে দেন। পরে রাবেয়ার বাবার বাড়িতে খবর দেন তাঁকে পাওয়া যাচ্ছে না।
স্বজনেরা খোঁজাখুঁজি করে বিলে রাবেয়ার দগ্ধ লাশ পান। পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্তে জানা যায়, রাবেয়ার গর্ভে থাকা দুই সন্তানই ছেলে। হত্যার ঘটনায় রাবেয়ার ভগ্নিপতি কামাল পাশা বাদী হয়ে সন্দ্বীপ থানায় হত্যা মামলা করেন।
ঘটনার পরপরই গ্রামের লোকজন মামুনকে ধরে পুলিশে দেয়। রিমান্ডে মামুন স্ত্রীকে লাথি মেরে হত্যা এবং লাশ পুড়িয়ে ফেলার কথা স্বীকার করেন। তিনি আদালতেও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
তদন্ত শেষে সন্দ্বীপ থানার তৎকালীন এসআই জাহাঙ্গীর আলম মামুন ও তাঁর চাচা ইমাম হাফেজকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। ১০ জনের সাক্ষ্য শেষে বৃহস্পতিবার জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রামের বিচারক মো. শাহাবুদ্দিন রায় দেন। রায়ে রাবেয়ার স্বামী মামুনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড, লাশ পোড়ানোর দায়ে ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। ইমাম হাফেজকে খালাস দেওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি শাহাদাত হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মামুন জামিনে গিয়ে পলাতক। তাই আদালত তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করেছেন।’ ইমাম হাফেজের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী মিলাদুল আমীন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মামুন তাঁর স্ত্রীকে মেরে নিজেই ভ্যানগাড়িতে করে নিয়ে গিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন। মামলায় তাঁর চাচাকেও জড়ানো হয়। তবে সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালত চাচাকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন।’
গ্রেপ্তারের ছয় বছর পর জামিনে মুক্তি পান মামুন। প্রতিটি ধার্য দিনে হাজিরা দিতেন আদালতে। রায় ঘোষণার আগে পলাতক হয়ে যান। জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রামের বেঞ্চ সহকারী সেকান্দর আলী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আদালতে হাজিরা দিতে এলে মামুন প্রায়ই বিমর্ষ থাকতেন। নিজের আফসোসের কথাও বলতেন অন্য আসামিদের। তাঁর ধারণা ছিল, স্ত্রীর গর্ভে থাকা যমজ সন্তানও কন্যা হবে। তবে পরে জেনেছেন, দুটিই ছেলেসন্তান।’
মামলার বাদী ও নিহত রাবেয়ার ভগ্নিপতি কামাল পাশা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আসামি মামুনকে গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকর করা হোক। এভাবে আর কোনো স্বামী যাতে নৃশংসভাবে স্ত্রীকে খুন করতে না পারে। ছেলে বা মেয়ে—যেটিই হোক, সন্তান নিয়ে কেউ যেন বৈষম্য না করে।






