১০ মে কান চলচ্চিত্র উৎসবে যাওয়ার ফ্লাইট ছিল প্রিয়তির। পাঁচ দিন আগে তাঁর ১৯ মাসের ছোট মেয়ে লাভিশার দেখাশোনাকারী এক সপ্তাহের ছুটিতে চলে যান। ফোনে খবর পেয়ে প্রিয়তির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।

মাকসুদা আখতার প্রিয়তি একাধারে মিজ আয়ারল্যান্ড খেতাবজয়ী মডেল, পাইলট এবং তিন সন্তানের মা। ছোট মেয়ের দেখাশোনাকারী ছুটিতে থাকায় শেষ মুহূর্তে পোশাকের ফাইনাল ফিটিং, ট্রায়াল, গয়না, ব্যাগ, জুতো, সানগ্লাস, মেকআপ, এক্সেসরিজ, ফটোশুট বা মিটিংয়ের জন্য কোনো সময় পাননি তিনি। সন্তানের দেখাশোনায় আর কেউ ছিল না। টিকিট, হোটেল বুকিংসহ প্রায় ১০ দিন ফ্রান্সে থাকা, খাওয়াদাওয়া, ইভেন্ট, মিটিং, ডিনার, ফটোশুট—সব প্রি-অ্যারেঞ্জমেন্ট আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।

কান যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলেও শেষমেশ বছরখানেক আগে লাভিশার দেখাশোনা করতেন যিনি, তাঁকে ফোন করেন প্রিয়তি। তিনি তখন অন্য জায়গায় চাকরি করছিলেন। প্রিয়তির অবস্থা শুনে এক দিনের নোটিশে চাকরি ছেড়ে তাঁর বাসায় হাজির হন।

কানের লালকার্পেটে চতুর্থ লুকে হাজির হওয়ার আগে মেকআপ নিতে নিতে প্রিয়তি বললেন, “৮ বছর বয়সে আমার বাবা মারা যান। ১৬ বছর বয়সে মা। আজ যত দূর এসেছি, এই দুজন মানুষের জন্য। দে হ্যাভ মাই ব্যাক। শেষ মুহূর্তে কোন পোশাকের সঙ্গে কী পরব, কীভাবে পরব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমার জন্য সেগুলো গুছিয়েছে আইরিশ গয়নার ডিজাইনার ফিওনা র‍্যাফটার। এই মানুষগুলোর জন্যই আমি জীবনে বহুবার পড়তে পড়তেও পড়িনি। যখনই আমি এমন সব পরিস্থিতিতে পড়েছি, কারও না কারও সাহায্যে ঠিকই উতরে গেছি।”

১৪ মে ছিল প্রিয়তির বড় ছেলের জন্মদিন। ছেলের জন্মদিনে উপস্থিত না থাকলেও উপহার হিসেবে যুক্তরাজ্যে প্রিয়তির কাজিনের কাছে পাঠিয়ে দেন তাকে। বললেন, “যত গ্ল্যামারাস আর রাজকীয়ভাবেই লালকার্পেটে হাঁটি না কেন, তিন সন্তানের মা হিসেবে সব সময় মাদার্স গিল্ট আমার সঙ্গী।”

২০১৪ সালে মিজ আয়ারল্যান্ড খেতাব জয় করেন প্রিয়তি। ২০১৫ সাল থেকে ১১ বার অংশ নেন কান চলচ্চিত্র উৎসবে। এবার লালকার্পেটে হাঁটেন দশমবার।

প্রিয়তি বললেন, “লালকার্পেটে অংশ নেওয়া কান চলচ্চিত্র উৎসবের খুবই ছোট্ট একটা অংশ। এই তো গতকালই ভিন ডিজেল তাঁর “ফার্স্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস” সিনেমার ২৫তম বছর পূর্তি উপলক্ষে এই সিনেমার বিশেষ প্রিমিয়ারে অংশ নিলেন। (ভিন ডিজেল) বললেন, ৩৫ বছর আগে তিনি যখন প্রথম কানে আসেন, তখন একটা ছোট লন্ড্রি ব্যাগে কিছু কাপড় নিয়ে এসেছিলেন। বললেন, তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা যেখানেই হোক না কেন; তারকা হিসেবে, পেশাদার ক্যারিয়ার গড়ার শুরু এই কান থেকেই। এ কথা বলে তিনি আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। আসলে কান চলচ্চিত্র উৎসবে যে কেউ যদি একটু রিসার্চ করেন, আগে থেকে মেইল পাঠিয়ে কিছু মিটিং ফিক্স করে আসেন, তিনি কখনো খালি হাতে ফিরবেন না। কান থেকে কেউ খালি হাতে ফেরে না। এখান থেকে মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত যেকোনো ধরনের কোলাবরেশন সম্ভব।”

প্রিয়তি আরও বলেন, “গত বছর আমি যখন এখানে আসি, তখন এআই দিয়ে তৈরি সিনেমাকে গ্রহণ করা না–করা নিয়ে আলোচনা চলছিল। এ বছর সেই আলোচনা আরও ডালপালা মেলছে। কীভাবে, কেন এআই সিনেমা তৈরি হবে, কত শতাংশ তৈরি হবে, তার নীতিমালা নিয়ে যুক্তি-তর্ক, আলাপ চলছে। এখানে আসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো বিভিন্ন দেশের, সংস্কৃতির, সৃষ্টিশীল সেরাদের আইডিয়া জানা, তাঁদের সঙ্গে আইডিয়া বিনিময়ের সুযোগ পাওয়া।”

এ বছর রিচার্ড হ্যারিস ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের পক্ষ থেকে ১০ দিনের আমন্ত্রণপত্র পেয়ে কানে যান প্রিয়তি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেন কেবল আইরিশ ডিজাইনারদের প্রমোট করছেন, বাংলাদেশি ডিজাইনারদের পোশাক কেন লাগেজে স্থান পায়নি? উত্তরে প্রিয়তি বলেন, “আমি গত বছর ফেসবুকে লিখেছিলাম, বাংলাদেশি কোনো ফ্যাশন ডিজাইনার যদি আমার কান লুকের জন্য পোশাক দেন, মোস্ট ওয়ালকাম। আমি সম্মানের সঙ্গে সেটি গ্রহণ করব; কিন্তু কেউ সেই ডাকে সাড়া দেননি। এ ছাড়া আয়ারল্যান্ডেই আমার পেশাজীবন। নিরাপত্তা, আশ্রয়, জীবনসঙ্গী, ভালো কাজ, ভালো জীবন—সবকিছুই সেখানে পেয়েছি। সেখানকার ফ্যাশন ডিজাইনারদের ওপর ভর করেই আমি ক্যারিয়ার গড়েছি। আমি তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি কেবল আয়ারল্যান্ডের বড় বড় ডিজাইনারের পোশাকই আনিনি; বরং ছোট ছোট টেকসই ফ্যাশন নিয়ে কাজ করা বুটিক ও কুটিরশিল্পের নানা কিছু সঙ্গে এনেছি। এটা তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার প্রকাশ।”